চীনের সেনাবাহিনীকে সহায়তা করার অভিযোগে দেশটির বেশ কয়েকটি বড় প্রযুক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নতুন করে কালো তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) সোমবার এই হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় রয়েছে চীনের ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবা, সার্চ ইঞ্জিন প্রতিষ্ঠান বাইদু, বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডি এবং আরো কয়েকটি বড় কম্পানি।
এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সাম্প্রতিককালে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে। কয়েক সপ্তাহ আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দুই দেশই সম্পর্কের টানাপোড়েন কমিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখায়।
এরপর ট্রাম্প শি চিনপিংকে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ওয়াশিংটন সফরের আমন্ত্রণও জানান। তবে নতুন এই কালো তালিকা বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের মধ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পেন্টাগনের প্রকাশিত তালিকায় যেসব কম্পানির নাম রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে।
এর কয়েক মাস আগে পেন্টাগন একই ধরনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু পরে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সেই তালিকা সরিয়ে নেওয়া হয়। নতুন তালিকাটি মূলত ফেব্রুয়ারিতে অল্প সময়ের জন্য প্রকাশিত তালিকার কাছাকাছি। তবে এবার আগের তালিকা থেকে বাদ পড়া দুটি বড় মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে আবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই দুটি প্রতিষ্ঠান হলো চ্যাংসিন মেমোরি টেকনোলজিস এবং ইয়াংজি মেমোরি টেকনোলজিস। যুক্তরাষ্ট্রের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান চীনের কৌশলগত প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
চীনবিষয়ক মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বিশেষ কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান জন মুলেনার এই তালিকাকে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই তালিকা শুধু মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, বরং সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্যও সতর্ক সংকেত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
মুলেনার বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করা উচিত। অন্যথায় এটি চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে পরোক্ষভাবে অবদান রাখার সমতুল্য।
তালিকাভুক্ত কম্পানিগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে কাজ করা চীনের কয়েকটি শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এর মধ্যে আলিবাবা, বাইদু এবং টেনসেন্ট অন্যতম। টেনসেন্ট অবশ্য আগের তালিকাতেও ছিল।
তবে বাইদু যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে। চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছে।
বাইদুর একজন মুখপাত্র বলেন, তারা এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছেন। বাইদুকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য কারণ নেই।
তিনি আরো বলেন, বাইদুকে সামরিক কম্পানি হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তালিকা থেকে কম্পানির নাম সরাতে তাদের হাতে থাকা সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আলিবাবাও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তাদের নাম এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা একটি ভুল সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে তারা প্রয়োজন হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে।
এক বিবৃতিতে আলিবাবা জানায়, আলিবাবা গ্রুপ কোনো সামরিক কম্পানি নয় এবং চীনের সামরিক-বেসামরিক সমন্বয় কৌশলেরও অংশ নয়। তাই এই তালিকায় কম্পানির নাম যুক্ত করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তালিকাভুক্তির ফলে সংশ্লিষ্ট কম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর নাও হতে পারে। তবে এটি ভবিষ্যতে আরো কঠোর অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞার পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন তালিকায় আরো যুক্ত হয়েছে চীনের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান উশি অ্যাপটেক এবং রোবট নির্মাতা স্টার্টআপ ইউনিট্রি। ইউনিট্রি মানুষের মতো দেখতে উন্নত রোবট তৈরি করে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি খাতে ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, চীনের বড় প্রযুক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত চিপ শিল্পকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।




