kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

দল ও মত বদলে যেভাবে উত্থান লিজ ট্রাসের

অনলাইন ডেস্ক   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ১৩:১৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দল ও মত বদলে যেভাবে উত্থান লিজ ট্রাসের

দলীয় নেতৃত্বের লড়াইয়ে জয়ের পর (বাঁয়ে) ও তরুণী বয়সে রাজতন্ত্রের সমালোচনা করে বক্তব্য দেওয়ার সময় লিজ ট্রাস (ডানে)- ছবি: এএফপি ও বিবিসি

যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রী পদে দৌড়ে বিজয়ী স্বল্প পরিচিত রাজনীতিক এলিজাবেথ ট্রাসের বেশি পরিচিত লিজ ট্রাস হিসেবে)  রাজনৈতিক উত্থান চমকপ্রদ। রাজনৈতিক মতাদর্শ তথা দলীয় আনুগত্য বিভিন্ন সময়ে বদলেছে। কম বয়সেই আলোচিত হয়েছেন ঐতিহ্যবাহী রাজতন্ত্র নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে।
 
ইউরোপ থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ (ব্রেক্সিট) নিয়ে গণভোটে ইউরোপে থাকার পক্ষে সমর্থন দিয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন লিজ ট্রাস।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সময়ে তিনিই কনজারভেটিভ দলের (টোরি দল) কট্টর ডানপন্থী ব্রেক্সিট সমর্থকদের পছন্দের ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।  

একসময় উদারপন্থী লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন লিজ ট্রাস। ১৯৮০'র দশকে টোরি প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিলে সোচ্চার ছিলেন। আর এখন ট্রাসের দাবি, থ্যাচারের মশাল সমুন্নত রাখাই হবে তার ব্রত।

ছাত্র রাজনীতির দিনগুলোতে ব্রিটেনে রাজতন্ত্র অবসানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে লিবারেল ডেমোক্রাট দলের সম্মেলনে আবেগপূর্ণ আহ্বান জানিয়েছিলেন লিজ ট্রাস। কিন্তু এখন তিনি মনে করেন তার ওই মন্তব্য ছিল ‘ভুল’। ট্রাস বলেছেন, এখন তিনি মনে করেন ব্রিটেনের ভবিষ্যত সাফল্যের জন্য রানি ও রাজপরিবারের ভূমিকা ‘অপরিহার্য’।

শৈশব ও বেড়ে ওঠা লিজ ট্রাসের বয়স যখন সাত, তখন তার স্কুলে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে নকল করে সাজানো এক অনুষ্ঠানে তিনি মার্গারেট থ্যাচারের অভিনয় করেছিলেন। তবে ১৯৮৩ সালের ওই নির্বাচনে মার্গারেট থ্যাচার বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হলেও লিজ ট্রাস স্কুলের 'মক' নির্বাচনে কোনো সাফল্য পাননি।

বহু বছর পর সেই দিনের কথা স্মরণ করে ট্রাস বলেছিলেন, ‘আমি স্কুলে মক নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদে অভিনয়ের সুযোগটা লুফে নিয়েছিলাম। সাজানো ভোটারদের উদ্দেশ্যে খুবই আবেগময় আবেদন জানিয়েছিলাম আমাকে ভোট দিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা ভোটও পাইনি। এমনকি আমি নিজেও নিজেকে ভোট দিইনি। ’

এর ৩৯ বছর পর লিজ ট্রাস 'লৌহমানবী' নামে পরিচিত হওয়া মার্গারেট থ্যাচারের পথ অনুসরণ করে সত্যিকারের প্রধানমন্ত্রী পদের দৌড়ে নেমে ছিনিয়ে নিয়েছেন সাফল্য।

বরিস জনসনের প্রধানমন্ত্রিত্বের সবচেয়ে কালো অধ্যায়ে লিজ ট্রাস সবসময় তার পাশে ছিলেন। নিজের নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন স্তরে অনেক দিন ধরেই তিনি একটা ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন এ বিষয়টি দলীয় নেতৃত্ব তথা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে তার জয়ের পথ সুগম করেছে।

'রাজতন্ত্র' অবসানের আহ্বান
অনেক দিক থেকেই লিজ ট্রাসকে জন্মগত টোরি (কনজারভেটিভ দল) বলা যাবে না। রাজনীতিতে তার উত্থান এবং যাত্রা এমন এক পরিবার থেকে যে পরিবার লিজ ট্রাসের নিজের বর্ণনায় ছিল বামপন্থী। আপোষহীনভাবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দাবিতে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রচারাভিযানে অংশ নিতেন কিশোরী লিজ ট্রাস।

অক্সফোর্ডে ১৯৭৫ সালে জন্ম লিজ ট্রাসের। তার বাবা ছিলেন গণিতের অধ্যাপক আর মা নার্স। লিজ ট্রাসের চার বছর বয়সে তাদের পরিবার স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোর পশ্চিমের পেসলি এলাকায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন।

লিজের ভাই বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাদের পরিবারে সবাই দাবা খেলতে ভালবাসত। কিন্তু কিশোরী বয়সে লিজ হার মেনে নিতে পারতেন না বলে পরিবারের অন্যরা দাবা খেলতে বসলে তিনি পালিয়ে বেড়াতেন। একসময় তাদের পরিবার চলে যায় উত্তর ইংল্যান্ডের লিডসে। সেখানে রাউন্ডহে নামে এক সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে তিনি পড়ালেখা করেন।

লিজ ট্রাস উচ্চ শিক্ষার জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং সেখানে তিনি দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন।

ছাত্র রাজনীতিতে খুবই সক্রিয় ছিলেন লিজ ট্রাস। প্রথমে যোগ দিয়েছিলেন মধ্যপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী লিবারেল ডেমোক্রাটিক পার্টিতে। তিনি ১৯৯৪ সালে উনিশ বছর বয়সে লিবারেল পার্টির সম্মেলনে বলেন, ‘রাজতন্ত্র শেষ হোক’ এই মতের তিনি পক্ষে। তিনি সম্মেলনে রাজতন্ত্র অবসানের জন্য আহ্বান জানান। তিনি বলেন: ‘গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ইস্যুতে গণভোট নেওয়ায় আমরা বিশ্বাসী। আমরা মনে করি না, জন্মসূত্রে শাসনের অধিকার কেউ জন্মায়। ’ 

তার কম বয়সের ওই ভাষণের ভিডিও এখন ছড়িয়ে পড়ার পর ট্রাস বলেছেন, রাজতন্ত্র নিয়ে তার ওই মন্তব্য ছিল ‘ভুল’। তিনি এনিয়ে দুঃখপ্রকাশও করেন।

রক্ষণশীল রাজনীতিতে উত্থান স্নাতক হওয়ার পর অক্সফোর্ডে থাকতেই লিজ ট্রাস ১৯৯৬ সালে দল বদল করে কনজারভেটিভ পার্টিতে যোগ দেন।

স্নাতক হওয়ার পর তিনি শেল ও কেবল অ্যান্ড ওয়ারলেস কম্পানিতে হিসাবরক্ষক হিসাবে কাজ করেন। ২০০০ সালের প্রথম দিকে তিনি তার এক সহকর্মী হিসাবরক্ষক হিউ ও'লিয়ারিকে বিয়ে করেন। তাদের দুটি মেয়ে সন্তান রয়েছে।

ট্রাস ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইংল্যান্ডের পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের একটি নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রথম ভোটে দাঁড়ান। সেবার তিনি হেরে যান। ২০০৫ সালে একই অঞ্চলের আরেকটি নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হয়ে আবারও পরাজিত হন। তবে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি ছিলেন না লিজ।  

দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের গ্রিনিচ থেকে তিনি পৌরসভার কাউন্সিলার নির্বাচিত হন ২০০৬ সালে। এরপর ২০০৮ সাল থেকে তিনি সংস্কার বিষয়ে ডানপন্থী একটি গবেষণা সংস্থার হয়ে কাজ শুরু করেন।

কনজারভেটিভ নেতা ডেভিড ক্যামেরন তাকে ২০১০ সালের নির্বাচনে প্রার্থিতার তালিকায় ওপরের সারিতে রাখেন এবং দক্ষিণ-পশ্চিম নরফোকের একটি নিরাপদ আসনে মনোনয়ন দেন।

একজন এমপির সঙ্গে কয়েক বছর আগে প্রেম করার মুখরোচক খবর ফাঁস হয়ে গেলে তার ভোটে দাঁড়ানো হঠাৎ করেই হুমকির মুখে পড়ে। কিন্তু রাজনীতি থেকে তাকে হঠানোর সবরকম চেষ্টার বিরুদ্ধে লড়ে যান লিজ। ২০১০ সালের ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১৩ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জিতে তিনি প্রথম এমপি হন।

এমপি হওয়ার দুই বছরের কিছু পরেই ২০১২ সালে লিজ সরকারের শিক্ষা দপ্তরের জুনিয়র মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০১৪ সালে ক্যাবিনেটে পূর্ণ মন্ত্রী পদে তার পদোন্নতি হয় এবং তাকে পরিবেশ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বরিস জনসনের পূর্বসূরী টেরেসা মে প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় লিজ ট্রাস বিচারমন্ত্রী এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখ্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।

বরিস জনসন ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হলে ট্রাস আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০২১ সালে তিনি সরকারের অন্যতম শীর্ষ পদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে আসীন হন।

কনজারভেটিভ পার্টির পেছনের সারি থেকে যেভাবে সরকারের শীর্ষ পদে লিজ ট্রাসের দ্রুত উত্থান ঘটেছে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিস্মিত করেছে।

তিনজন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে ছয়টি মন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালন এবং দীর্ঘদিন কনজারভেটিভ রাজনীতির মূল ধারায় যুক্ত থাকার পরেও দেশের বহু মানুষ বলেছেন লিজ ট্রাস তাদের কাছে সেভাবে বরিস জনসনের মতো পরিচিত রাজনীতিক নন।  

সূত্র: বিবিসি



সাতদিনের সেরা