kalerkantho

রবিবার । ২ অক্টোবর ২০২২ । ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

বিয়ের আগে নারীদের কুমারিত্ব প্রমাণ করতে হয় সে দেশে

অনলাইন ডেস্ক   

১২ আগস্ট, ২০২২ ১১:৪৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিয়ের আগে নারীদের কুমারিত্ব প্রমাণ করতে হয় সে দেশে

বিয়ের আগে নারী এবং তার পরিবারের জন্য সতীত্ব বা কুমারিত্ব অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ইরানে। এখনো অনেক পুরুষ বিয়ের আগে কনের সতীত্বের সার্টিফিকেট বা সনদ চায়।

যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে দিয়েছে, এমন পরীক্ষার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এবং এটি নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘন। ইরানে গত কয়েক বছর ধরে বিয়ের আগে নারীদের সতীত্ব প্রমাণের এই পুরনো প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন, প্রচার বাড়ছে।

বিজ্ঞাপন

বিয়ের পর প্রথম শারীরিক সম্পর্কের পর মরিয়ামের স্বামী তাকে বলেছিল, তুমি কুমারিত্ব হারিয়েছিলে বলেই আমাকে ফুসলিয়ে বিয়ে করেছ। তোমার আসলটা জানলে কেউ-ই তোমাকে বিয়ে করত না।

মরিয়াম তার স্বামীকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করে যে বিশেষ সম্পর্কে রক্ত না বের হলেও বিয়ের আগে কখনোই কারো সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি তার। কিন্তু স্বামী তাকে বিশ্বাস করেনি এবং প্রমাণ দেখাতে তাকে সতীত্বের সার্টিফিকেট আনতে বলে।

ইরানে এ ধরনের ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বাগদানের পর অনেক নারী ডাক্তারের কাছে গিয়ে কুমারিত্বের পরীক্ষা করায়; যেন স্বামীর কাছে প্রমাণ করতে পারে যে বিয়ের আগে তার কোনো পুরুষের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক হয়নি।

ডাব্লিউএইচও বলে, এ ধরনের কুমারিত্ব পরীক্ষার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এ পরীক্ষা দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছুই প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

মরিয়ামের সতীত্বের সনদে লেখা ছিল, তার হাইমেন বা যোনিপথের পর্দা অনেকটা ইলাস্টিকের মতো। ফলে বিশেষ সম্পর্কের পরও তা ফেটে রক্তপাত হয়নি।

তিনি বলেন, পুরো বিষয়টি আমার সম্মানে খুব আঘাত লাগে। আমি কোনো অন্যায় করিনি। কিন্তু আমার স্বামী আমাকে দিনের পর দিন অপমান করেছে। একপর্যায়ে আমার আর সহ্য হচ্ছিল না। একদিন ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করি।

সময়মতো হাসাপাতালে নেওয়ায় তার প্রাণ রক্ষা পায়। মরিয়ম বলেন, ওই অন্ধকার দিনগুলোর কথা আমি ভুলব না। কয়েক দিনে আমার ওজন ২০ কেজি কমে গিয়েছিল।

মরিয়ামের এই কাহিনি ইরানের আরো বহু নারীর মতোই। অনেক নারী এবং তাদের পরিবারের জন্য বিয়ের আগে কুমারিত্ব প্রমাণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই রীতির শেকড় সে দেশের রক্ষণশীল সংস্কৃতির অনেক গভীরে প্রোথিত।

তবে সম্প্রতি হাওয়া ধীরে হলেও বদলাতে শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেক নারী ও পুরুষ এ ধরনের সতীত্বের পরীক্ষা এবং সার্টিফিকেট নিষিদ্ধ করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন।

গত বছরের নভেম্বরে অনলাইনে সতীত্ব পরীক্ষা নিষিদ্ধের একটি পিটিশনে এক মাসের মধ্যে ২৫ হাজার লোক সমর্থন জানায়। এই প্রথম ইরানে এত মানুষ এ ধরনের রীতি খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ করল।

নেদা বলেন, এই রীতি একজন নারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং তার মর্যাদার লঙ্ঘন।

তেহরানে তিনি যখন ১৭ বছরের ছাত্রী, তখন এক ছেলে বন্ধুর সঙ্গে তার প্রথম বিশেষ সম্পর্ক হয়। তিনি বলেন, তার পরই আমার ওপর আতঙ্ক ভর করে। পরিবার জানতে পারলে কী হবে এই ভেবে ভয়ে সিঁটকে গিয়েছিলাম।

সে কারণে নেদা অপারেশন করে নিজের বিশেষাঙ্গের পর্দা জোড়া লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন।

যদিও এ ধরনের অপারেশন ইরানে নিষিদ্ধ নয়। তবে জানাজানি হলে তার ঝামেলার কথা ভেবে কোনো হাসপাতাল তা করতে রাজি হয়নি।

শেষে একটি বেসরকারি ক্লিনিক প্রচুর টাকার বিনিময়ে গোপনে তা করতে রাজি হয়।

তিনি বলেন, আমি আমার সব জমানো পয়সা খরচ করলাম। ল্যাপটপ বিক্রি করলাম। মোবাইল ফোন, গয়না সব বিক্রি করলাম।

অপারেশনে কোনো ঝামেলা হলে তার সব দায় নেওয়ার একটি মুচলেকায় সইও করেন নেদা। একজন ধাত্রী ৪০ মিনিট ধরে অপারেশন করেন। সুস্থ হতে কয়েক সপ্তাহ লেগেছিল তার।

পুরো ঘটনা পরিবারের কাছে গোপন রাখেন তিনি। নেদা বলেন, খুব নিঃসঙ্গ বোধ করতাম। কিন্তু বাবা-মা স্বজনরা জানলে কী হবে এই ভয়ে ব্যথা সহ্য করতাম।

কিন্তু এত কষ্ট-দুর্ভোগের ফল তিনি পাননি। এক বছর পর এক ছেলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়; যে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়। কিন্তু প্রথমবার শারীরিক সম্পর্কের পর তার কোনো রক্তক্ষরণ হয়নি। কারণ, জোড়া দেওয়ার ওই অপারেশনে কাজ হয়নি।

তিনি বলেন, আমার ওই পুরুষ বন্ধু আমাকে দোষারোপ করল যে আমি তাকে ঠকাতে চেয়েছি। সে আমাকে মিথ্যাবাদী বলে অপবাদ দিয়ে ছেড়ে চলে গেল।

চার বছর ধরে স্বামীর গঞ্জনা-নির্যাতন সহ্য করার পর এবং আত্মহত্যা করতে গিয়ে প্রাণে বাঁচার পর মরিয়াম অবশেষে আইনি প্রক্রিয়ায় তালাক পেয়েছেন। কয়েক সপ্তাহ আগে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো পুরুষকে বিশ্বাস করা আমার জন্য কঠিন হবে। অদূর ভবিষ্যতে আবারও বিয়ে করার কথা আমি ভাবতেই পারি না।

অনলাইনে এ ধরনের সতীত্ব পরীক্ষা এবং সনদের প্রচলিত রীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে যেসব পিটিশন এখন হচ্ছে, তাতে হাজার হাজার ইরানি নারীর মতো তিনিও সই করেছেন।

যদিও মরিয়াম বিশ্বাস করেন না তার জীবদ্দশায় এই রীতি বন্ধ হবে, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, একদিন ইরানের নারীরা আরো অধিকার পাবে।

তিনি বলেন, আমি নিশ্চিত একদিন এটা হবে। আমি আশা করি, আমি যে দুঃসহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েদের যেন তা ভোগ করতে না হয়।
সূত্র : বিবিসি।



সাতদিনের সেরা