kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

বিশ্বে জলবায়ু নেতা নেই

গ্রেটা থুনবার্গ   

২৫ অক্টোবর, ২০২১ ০৩:০৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিশ্বে জলবায়ু নেতা নেই

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জলবায়ুসংকট নিয়ে সাম্প্রতিক আইপিসিসি প্রতিবেদনকে মানবতার জন্য ‘কোড রেড’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা খাদের কিনারায় আছি।’ জলবায়ু ও পরিবেশগত সংকট অস্বীকারের বিষয়টি এতটাই গভীরে প্রবেশ করছে যে সেদিকে প্রকৃত নজর কেউ খুব কমই দেয়। যেহেতু কেউই এই সংকটকে সংকটের মতো বিবেচনা করে না, তাই বিদ্যমান সতর্কবাণীও লোক-দেখানো সবুজ কর্মসূচি এবং সংবাদ প্রচারের অব্যাহত জোয়ারে ডুবে যাচ্ছে।

ঘটনাগুলো এতটাই সুস্পষ্ট, যা আমরা শুধু অস্বীকারই করতে পারি। কয়েক দশকের নিষ্ক্রিয়তায় আমাদের নেতারা প্রকৃতপক্ষে এই পথটাই বেছে নিয়েছেন। বাগাড়ম্বর করে দশকের পর দশক পার করে দিয়েছেন।

আমাদেরকে যদি ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে নিচে থাকতে হয়, তাহলে ‘অপরিবর্তনীয় পর্যায়ক্রমিক বিক্রিয়া’ বন্ধ করার ঝুঁকি হ্রাস করতে হবে। যেহেতু আমাদের কাছে প্রযুক্তিগত সমাধান নেই এবং অদূর ভবিষ্যতে শুধু এর কাছাকাছি যাাওয়া যাবে, তাই ঝুঁকি হ্রাসের অর্থ হচ্ছে সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আনতেই হবে।

আমরা বর্তমানে শতাব্দীর শেষে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি ন্যূনতম ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখার পথে আছি; কিন্তু সব দেশে তাদের সব অঙ্গীকার পূরণ করলেই সেটা সম্ভব। অথচ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বলছে, বিশ্বের সরকারগুলোর ‘বিল্ড ব্যাক বেটার’ কর্মসূচির ব্যয়ের মাত্র ২ শতাংশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যেখানে কয়লা, তেল ও গ্যাস উৎপাদন ও পোড়ানোর পেছনে শুধু ২০২০ সালেই ৫.৯ ট্রিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। এ পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রিতে রাখার লক্ষ্যমাত্রার একেবারেই বিপরীত।

নিশ্চিতভাবেই সংকট মোকাবেলায় প্রথম পদক্ষেপটি হলো গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রকৃত নির্গমনকে পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু বিশ্বনেতারা এই পদ্ধতি গ্রহণ করেননি। এর পরিবর্তে তারা কূটকৌশল ও জনসংযোগের দিকে ঝুঁকেছেন, যাতে পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে মানুষ মনে করে।

একটি সহজ উদাহরণ যুক্তরাজ্য। এটি এমন এক দেশ, যে বর্তমানে প্রতিবছর ৫৭০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও গ্যাস উৎপাদন করছে। দেশটি তার মহীসোপানে মজুদ আরো ৪.৪ বিলিয়ন ব্যারেল তেল ও গ্যাস উত্তোলন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটি হলো ইতিহাসের ১০টি বৃহত্তম নির্গমনকারী দেশের একটি। অথচ সে নিজেকে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু নেতা বলে দাবি করে।

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনকারী দেশ হিসেবে চীন এরই মধ্যে ৪৩টি নতুন কয়লা বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। অথচ এ দেশও নিজেকে পরিবেশগত অগ্রদূত হিসেবে দাবি করে। নতুন মার্কিন প্রশাসনের কথাই ধরুন। তারা ‘বিজ্ঞানের কথা শুনুন’ বললেও তারাই অন্যান্য অনেক বেপরোয়া সিদ্ধান্তের মধ্যে সম্প্রতি লাখ লাখ একর জমিতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যেখানে ১.১ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং ৪.৪ টন ঘনফুট জীবাশ্ম গ্যাস উৎপাদন হতে পারে। এই যুক্তরাষ্ট্রও নিজেকে জলবায়ু নেতা বলে দাবি করে।

সত্যটি হলো বিশ্বে কোনো জলবায়ু নেতা নেই। অন্তত উচ্চ আয়ের দেশগুলোর মধ্যে কেউ নয়। জনসচেতনতার মাত্রা এবং মিডিয়ার অভূতপূর্ব চাপে পড়ে প্রকৃত নেতৃত্ব বের হয়ে আসার যে প্রয়োজন তা এখনো অস্তিত্বহীন।

বিজ্ঞান মিথ্যা বলে না, এমনকি আমাদের কী করতে হবে, সেটাও বলে না। তবে এটি আমাদের কী করা দরকার তার সেই চিত্র দেয়। আমরা অবশ্যই সেই ছবিটি উপেক্ষা করতে এবং অস্বীকার করার ব্যাপারে স্বাধীন। আইপিসিসির একজন নেতৃস্থানীয় বিজ্ঞানী জিম স্কেয়া বলেছেন, ‘রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মের মধ্যে উষ্ণায়নকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব কিন্তু তা করার জন্য অভূতপূর্ব পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে।’ গ্লাসগোতে আসন্ন কপ-২৬ সফল হওয়ার জন্য অনেক কিছুরই প্রয়োজন হবে। তবে সর্বোপরি সততা, সংহতি ও সাহসের প্রয়োজন হবে সবচেয়ে বেশি।

বৈষম্যের সংকট উপনিবেশবাদ সময়ের। এই সংকট এমন এক ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যে কিছু লোক অন্যদের চেয়ে বেশি মূল্যবান এবং তাই অন্যের জমি ও সম্পদ শোষণ এবং চুরি করার অধিকার তাদের রয়েছে। এরা সব পরস্পর সংযুক্ত।

পরিস্থিতি খুব অন্ধকার এবং আশাহীন মনে হতে পারে এবং সংবাদের স্রোত ও ক্রমবর্ধমান ঘটনার কারণে হতাশার অনুভূতি আরো গভীর হতে পারে। তবে আমাদের নিজেদের মনে করিয়ে দিতে হবে যে আমরা এখনো এটিকে উল্টে দিতে পারি। আশা আমাদের চারপাশেই রয়েছে। কারণ একেকজন বিশ্বনেতা বা একটি উচ্চ আয়ের দেশ বা একটি প্রধান টিভি স্টেশন বা নেতৃস্থানীয় সংবাদপত্র যে সৎ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, জলবায়ুসংকটকে সত্যিকার অর্থে একটি সংকট হিসেবে বিবেচনা করে, তাকে সেটি প্রকৃত অর্থেই গ্রহণ করতে হবে। ঘড়ি বেজে যাচ্ছে। সম্মেলন হচ্ছে। নির্গমনও বাড়ছে কিন্তু সেই নেতা কে হবেন?

 

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (ইউকে)

লেখক : সুইডিশ জলবায়ু আন্দোলনকর্মী

ভাষান্তর ও সংক্ষেপণ : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা