kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

শান্তির নোবেল দুই সাংবাদিকের

স্বাধীন মতপ্রকাশের পক্ষে লড়াইয়ে বড় জয়

সাব্বির খান, সুইডেন থেকে   

৯ অক্টোবর, ২০২১ ০৩:০৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বাধীন মতপ্রকাশের পক্ষে লড়াইয়ে বড় জয়

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে লড়াইয়ে সাহসী ভূমিকা রাখায় এ বছর ফিলিপাইন ও রাশিয়ার দুই সাংবাদিককে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন ফিলিপাইনের মারিয়া রেসা এবং রাশিয়ার দিমিত্রি মুরাতভ। নরওয়ের নোবেল ইনস্টিটিউট গতকাল শুক্রবার অসলোতে এক সংবাদ সম্মেলনে ১০২তম নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে তাঁদের নাম ঘোষণা করে।

নোবেল কমিটির প্রধান বেরিট রেইস-অ্যান্ডারসেন বলেন, “গণতন্ত্র আর টেকসই শান্তির অন্যতম পূর্বশর্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে লড়াইয়ে ‘সাহসী’ ভূমিকার জন্য তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বে গণতন্ত্র আর সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যখন ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যাঁরা এই আদর্শের জন্য লড়াই করে চলেছেন, সেই সব সাংবাদিকের প্রতিনিধিত্ব করছেন মারিয়া রেসা ও দিমিত্রি মুরাতভ।”

১৯৩৫ সালে জার্মান সাংবাদিক কার্ল ফন ওজিয়েতস্কির পর এই প্রথম সাংবাদিকদের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য বেছে নিল নরওয়ের নোবেল কমিটি।

বেরিট রেইস-অ্যান্ডারসেন বলেন, ‘মুক্ত, স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা হলো ক্ষমতার অপব্যবহার, মিথ্যা আর অপপ্রচারের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ। বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সফলভাবে সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা, নিরস্ত্রীকরণ এবং আমাদের জীবদ্দশায় একটা উন্নত বিশ্ব গড়ে তোলা কঠিন।’

তিনি বলেন, ‘এই পুরস্কার সম্মুখ সারির সাংবাদিকদের দৈনন্দিন সমস্যা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পূর্ণ সমাধানের নিশ্চয়তা হয়তো দেবে না; কিন্তু আমরা আশা করি, শুধু বিশ্বের যুদ্ধ ও সংঘর্ষই নয়, এই পুরস্কার সারা বিশ্বের সাংবাদিকদের কাজের গুরুত্ব ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জায়গাটি কতটা বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ তা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করবে, সবার মনেও রেখাপাত করবে।’

৫৮ বছর বয়সী মারিয়া রেসার বিষয়ে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি বলেছে, তিনি তাঁর জন্মস্থান ফিলিপাইনে ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতার ব্যবহার এবং দেশটিতে ক্রমেই বেড়ে চলা কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ব্যবহার করছেন। আর ৫৯ বছর বয়সী দিমিত্রি মুরাতভের বিষয়ে নোবেল কমিটি বলেছে, তিনি তাঁর দেশ রাশিয়ায় ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্যে কয়েক দশক ধরে বাকস্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করছেন।

দিমিত্রি মুরাতভ ১৯৯৫ সাল থেকে রাশিয়ার সবচেয়ে স্বাধীন সংবাদপত্র ‘নোভায়া গাজেটা’র প্রধান সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন, যে সংবাদপত্রের ছয়জন সাংবাদিক তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। এই পত্রিকা দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও নির্বাচনী জালিয়াতির তীক্ষ সমালোচক হিসেবে পাঠকমহলে ব্যাপক সুপরিচিত।

মারিয়া রেসা ফিলিপাইনের ‘রাপলার’ নামের একটি নিউজ পোর্টালের প্রতিষ্ঠাতা; রাপলারের যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের একজন কঠোর সমালোচক হিসেবে বিশ্বে পরিচিত এবং দুর্নীতি তথা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তিনি অত্যন্ত কঠোর প্রবক্তা হিসেবে নিজেকে সুপরিচিত করেছেন।

নোবেল জয়ের খবরে মারিয়া রেসা নরওয়েজিয়ান টিভি-২-এ তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এই নোবেল জয়ের খবর বিশ্বাসই করতে পারছি না। আশা করছি, পুরস্কারটি গ্রহণের জন্য অসলোতে আসতে পারব।’ তিনি বলেন, ‘আমি একটু হতবাক। খবরটি আমাকে গভীর আবেগপ্রবণ করে তুলেছে। কিন্তু আমি আমার সংবাদ টিমের একজন হিসেবে অত্যন্ত আনন্দিত এবং আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই নোবেল কমিটিকে, আমরা যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তা তারা স্বীকার করেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা (সাংবাদিকরা) যা করতে চাই, তা চালিয়ে যেতে হবে নতুন শক্তি সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে। আমরা সব সময় দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পথকে আরো সুপ্রসারিত করতে চেয়েছি।’ সোশ্যাল মিডিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রচলিত সাংবাদিকতার পেশাকে সোশ্যাল মিডিয়া অনেক বেশি কঠিন করে দিয়েছে এবং চ্যালেঞ্জিং অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। নেতারা একটা দেশের গণতন্ত্রকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলতে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমকে তাঁদের খেয়াল-খুশিমতো ব্যবহার করার প্রয়াস পাচ্ছেন।’

অন্যদিকে জনপ্রিয় চ্যানেল পডিওমে এক তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দিমিত্রি মুরাতভ বলেন, ‘আমি হাসছি। আমি এটা আশাই করিনি।’ তিনি এই পুরস্কারকে বর্ণনা করেছেন রুশ সাংবাদিকতা, যা এখন দমনের মুখে তার প্রতি একটা উচিত জবাব হিসেবে।

মারিয়া রেসা ও দিমিত্রি মুরাতভ শান্তি পুরস্কারের প্রাইজ মানি ১০ মিলিয়ন নরওয়েজিয়ান ক্রাউন সমান ভাগে ভাগ করে নেওয়া ছাড়াও প্রত্যেকেই একটি করে মানপত্র এবং একটি করে স্বর্ণপদক পাবেন। আগামী ১০ ডিসেম্বর এই পুরস্কারের জনক বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে স্টকহোমে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই বিজয়ীদের অসলোতে পুরস্কৃত করার কথা থাকলেও কভিড-১৯ মহামারির কারণে গত বছরের মতো এবারও নোবেল কমিটি সব অনুষ্ঠান বাতিল ঘোষণা করেছে। তবে ১০ ডিসেম্বর টেলিভিশন ও অনলাইনে পুরস্কার বিতরণীর আদলে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে, যেখানে বিজয়ীরা অনলাইনে যুক্ত হয়ে তাঁদের শুভেচ্ছা বক্তব্য দেবেন এবং নিজ নিজ দেশেই নোবেল কমিটির পাঠানো দূতের মাধ্যমে তাঁদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।

আগামী সোমবার বাংলাদেশ সময় বিকেল পৌনে ৪টায় স্টকহোম থেকে অর্থনীতিতে বিকল্প নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।



সাতদিনের সেরা