kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ফলে ইরান যেভাবে লাভবান হবে

অনলাইন ডেস্ক   

২৭ জুলাই, ২০২১ ২২:০১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ফলে ইরান যেভাবে লাভবান হবে

ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গতকাল সোমবার হোয়াইট হাউজে বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা করেন এ বছর শেষ হওয়ার আগেই নাগাদ ইরাক থেকে সৈন্যদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। এরপর মার্কিন সৈন্যরা সেদেশে কোনো সামরিক তৎপরতায় অংশ নেবেনা। এই সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিক-ভাবে দুটো প্রধান প্রশ্ন উঠছে : আমেরিকান সৈন্য চলে গেলে ইরাকে কী পরিবর্তন হবে, এবং ইসলামিক স্টেট (আইএস) কি নতুন করে ইরাকে তৎপর হয়ে উঠবে?

এখন থেকে ১৮ বছর আগে সামরিক অভিযানে ইরাক দখলের পর সেদেশে আমেরিকার সৈন্য সংখ্যা ছিল ১৬০,০০০। সরাসরি সামরিক তৎপরতায় অংশ নিচ্ছে বা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত তেমন মার্কিন সৈন্যের সংখ্যা এখন মাত্র ২৫০০। এছাড়া, আইএস-এর মোকাবেলায় বেশ কিছু মার্কিন স্পেশাল ফোর্স ইরাকে তৎপর রয়েছে যদিও সংখ্যা অজানা। ইরাকে তিনটি ঘাঁটিতে অবশিষ্ট এই আমেরিকান সৈন্যরা থাকে। কিন্তু মাঝে মধ্যেই ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা মার্কিন সৈন্যদের টার্গেট করে রকেট এবং ড্রোন হামলা চালায়।

ইরাকে আমেরিকান সৈন্যদের এখন প্রধান কাজ ইরাকি সৈন্যদের প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্যভাবে সাহায্য করা। কিন্তু ইরাকে আমেরিকান সেনা উপস্থিতি নিয়ে বিরোধিতা ক্রমেই বাড়ছে। ইরান-সমর্থিত রাজনীতিক এবং মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এ ব্যাপারে বিশেষ তৎপর। তারা চায় এখনই মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে। বিশেষ করে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রভাবশালী এক কম্যান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলায়মানির মৃত্যুর পর মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি জোরদার হয়েছে।

শুধু ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোই নয়, বিদেশী সৈন্যের উপস্থিতির বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ ইরাকিও এককাট্টা হচ্ছে। বিষয়টি ইরাকি সরকারের জন্য এখন বেশ স্পর্শকাতর হয়ে উঠছে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রে যারা ইরাক থেকে সৈন্য ফিরিয়ে আনার পক্ষে তারাও এই চাপ নিয় তেমন অখুশি নন। যদিও ইরাককে ইরানের হাতে তুলে দিতে তারা কেউই চাননা, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকরা বেশ কিছুদিন ধরেই চাইছেন মধ্যপ্রাচ্যের – প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ভাষায় – ‘অবিরাম যুদ্ধ“ থেকে আমেরিকাকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিতে। সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এবং মিত্ররা প্রায় তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তান থেকে সরে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন নজর দিতে চায় এশিয়া এবং প্রশান্তমহাসাগর অঞ্চলে এবং দক্ষিণ চীন সাগরে।

ইসলামিক স্টেট ২.০?

তবে ভয় বাড়ছে আমেরিকানদের এই সিদ্ধান্তে ইসলামিক স্টেটের পুনরুত্থান হবে কিনা এবং তার ফলে আবারো একসময় আমেরিকানদের মধ্যপ্রাচ্যে ফিরতে হবে কিনা। প্রেসিডেন্ট ওবামা ২০১১ সালে ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। যদিও কিছু আমেরিকান সৈন্য ইরাকে রয়ে যায়, কিন্তু ইরাকের জটিল রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং সীমান্তের ওপারে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ আইএসকে দারুণ সুবিধা করে দেয়। তারা ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং তারপর সেখান থেকে ইরাক এবং সিরিয়ায় বিশাল একটি এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে সমর্থ হয়।

আবারো কি সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে? ইরাকি সেনাবাহিনীর ওপর থেকে আমেরিকান সামরিক সমর্থন চলে গেলে কি আইএস - এর পুনরুজ্জীবন হতে পারে? ২০১১ সালের তুলনায় সেই সম্ভাবনা এখন অনেক কম। তার কতগুলো কারণ রয়েছে:

সে সময় ইরাকে শিয়াদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী নুরী আল মালিকী সরকারের একতরফা পক্ষপাতিত্ব নিয়ে সুন্নিদের মধ্যে দারুণ ক্ষোভ তৈরি হয়। আইএস সেই ক্ষোভকে কাজে লাগায়। মি. মালিকি ২০০৬ সাল থেকে ২০১৪ সার পর্যন্ত তার শাসনামলে ইরাকি সুন্নিদের এতটাই কোণঠাসা করে ফেলেন তারা অনেকেই আইএস-এর শিবিরে গিয়ে আশ্রয় নেয় বা নিতে বাধ্য হয়। বর্তমান ইরাকের রাজনীতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে অপেক্ষাকৃত অনেক গ্রহণযোগ্য। বঞ্চনার বোধ অনেকটাই কমেছে।

তাছাড়া, আইএস-এর পরাজয়ের পর, আমেরিকা এবং ব্রিটেন সন্ত্রাস বিরোধী তৎপরতা সামলাতে ইরাকি সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে অনেক চেষ্টা করে চলেছে। এখনও বলা হচ্ছে, এই সাহায্য অব্যাহত থাকবে। তৃতীয়ত, আইএস-এর নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে যারা এখনও অবশিষ্ট রয়েছেন তারা টিকে থাকার কৌশল হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে ছেড়ে আফ্রিকা এবং আফগানিস্তানের অরক্ষিত অঞ্চলে ঘাঁটি তৈরির পথ নিয়েছেন।

“আইএসকে মোকাবেলা করার ক্ষমতা এখন ইরাকি সরকারি বাহিনীর রয়েছে,“ বলছেন ব্রিটেনের সাবেক সেনা অফিসার ব্রিগেডিয়ার বেন ব্যারি যিনি বর্তমানে গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর ষ্ট্রাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক হিসাবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, “তবে ইরাকের সুন্নিদের ব্যাপারে একটি রাজনৈতিক সমাধান না হলে বিদ্রোহী তৎপরতার মৌলিক কারণগুলো অক্ষুণ্ণ রয়ে যাবে।“

আইএস যে ২০১৪ সালের গ্রীষ্মে ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল এলাকায় ঝড়ের গতিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে সমর্থ হয়েছিল তার অন্যতম কারণ ছিল আমেরিকা এবং পশ্চিমা দেশগুলো ইরাকের ওপর থেকে নজর সরিয়ে নিয়েছিল । এরপর, আইএসকে পরাজিত করতে পশ্চিমা শক্তিগুলো এবং তাদের মিত্রদের পাঁচটি বছর এবং শত শত কোটি ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। সুতরাং, সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমেরিকানরা ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করলেও, আইএস বা অন্য কোনো উগ্র ইসলামি গোষ্ঠী ইরাকে যেন নতুন করে ঘাঁটি গাড়তে না পারে সেদিকে নজর হয়ত রাখবে।

“যুক্তরাষ্ট্র যদি দেখে যে ইরাকে বসে আইএস ইরাকের বাইরে মার্কিন স্বার্থে আঘাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাহলে আমেরিকা হয়ত একাই আবারো সামরিক হামলা চালাবে।,“ বলেন মি ব্যারি। পারস্য উপসাগরে এবং আশপাশের দেশে এখনও যে সামরিক জনবল এবং রসদ আমেরিকার মজুদ রয়েছে, তাতে খুব সহজেই ইরাকে নতুন করে কোনো সামরিক তৎপরতা শুরু আমেরিকার জন্য তেমন কোনো কঠিন কাজ হবেনা।

ইরানের ধৈর্যের খেলা

আমেরিকান সৈন্যরা চলে গেলে ইরাকে দীর্ঘমেয়াদে যে বাস্তবতা তৈরি হবে, তাতে যে ইরানের লাভ হবে তা নিয়ে তেমন কোনো সন্দেহ নেই। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য আশপাশের দেশ ও অঞ্চল থেকে আমেরিকান সৈন্যদের বিদায় করা যাতে তারাই এই অঞ্চলে প্রধান শক্তি হতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে সেই সাফল্য ইরান পায়নি। কারণ তেহরানের উদ্দেশ্য নিয়ে ঐ দেশগুলোর মধ্যে এখনও প্রবল সন্দেহ রয়েছে। ফলে উপসাগরের ছটি দেশেই এখনও আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। বাহরাইনে রয়েছে মার্কিন নৌ-বাহিনীর পঞ্চম বহরের ঘাঁটি। ইরানের প্রভাব বলয় প্রসারের পেছনে একসময় বড় বাধা ছিলেন সাদ্দাম হোসেন । ২০০৩ সালে আমেরিকান আগ্রাসনে তার পতনের পর ইরান রাতারাতি যে সুবিধা পেয়ে যায় তা কাজে লাগানোর চেষ্টা তারা তখন থেকেই অব্যাহত রেখেছে।

ইরাকে একাধিক শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী তৈরি এবং তাদের শক্তি বৃদ্ধিতে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে ইরান। ইরাকি পার্লামেন্টের ভেতর ইরানের পক্ষে কথা বলার মত অনেকগুলো প্রভাবশালী কণ্ঠ রয়েছে। এরপর সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ ইরানকে সেদেশে সামরিক উপস্থিতির সুযোগ তৈরি করে দেয়। তাছাড়া পাশের দেশ লেবাননে ইরান সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী হেযবোল্লাহ দেশটির সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি।

ইরান ধৈর্য ধরে দীর্ঘ একটি খেলা খেলছে। ইরানি নেতারা মনে করেন, তারা যদি সমান্তরালভাবে উপরে এবং তলে তলে চাপ অব্যাহত রাখেন, তাহলে একসময় আমেরিকা হয়তো মনে করবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অবস্থান এবং তৎপরতা আর তাদের স্বার্থের পক্ষে নয়। ফলে, আমেরিকার ঘাঁটিতে থেকে থেকে রকেট হামলা এবং সেই সাথে ইরাকের রাস্তার আমেরিকান সৈন্য উপস্থিতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে সমর্থন জোগাচ্ছে ইরান।

এখন, ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে তেহরানে অনেকেই মনে করবেন তারা সঠিক পথেই রয়েছেন এবং হাওয়া তাদের পক্ষেই বইছে।

সূত্র: বিবিসি।



সাতদিনের সেরা