kalerkantho

শুক্রবার । ২২ শ্রাবণ ১৪২৮। ৬ আগস্ট ২০২১। ২৬ জিলহজ ১৪৪২

সুইডেনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনাস্থা, রাজনৈতিক সংকট

সাব্বির খান, স্ক্যান্ডিনেভিয়া প্রতিনিধি   

২২ জুন, ২০২১ ০১:৩৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সুইডেনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনাস্থা, রাজনৈতিক সংকট

সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্টেফান লফভেনের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট। গত সোমবার এক ভোটাভুটিতে এই অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়। পার্লামেন্টের ৩৪৯ সদস্যের মধ্যে লফভেনের বিরুদ্ধে ভোট দেন ১৮১ জন। পক্ষে ভোট পড়ে ১০৯টি। ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন ৫১ জন। অনুপস্থিত ছিলেন আটজন। 

গণতান্ত্রিক সুইডেনের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো সরকার তথা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে ভোটাভুটির মাধ্যমে অনাস্থা জানানো হলো। এ পরিস্থিতিকে সুইডেনের বিশেষজ্ঞ এবং পর্যবেক্ষকরা ’গভীর সংকট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সরকারের তিনদলীয় জোটের বাম দল (ভেন্সের পার্টি) প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের আয়োজন করে এবং হিটলারের নাৎসি আদর্শের অনুসারী উগ্র ডানপন্থী দল ‘সুইডেন ডেমোক্র্যাট’ বাম দলের পক্ষে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট দেয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী লফভেনের হাতে মাত্র এক সপ্তাহ সময় আছে এবং এই সময়ের মধ্যে তিনি যদি আবারও সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন আদায় করতে পারেন, তাহলে আগামী ২৮ জুন আবাও ভোটাভুটির মাধ্যমে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হতে হবে। আর যদি তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে ব্যর্থ হন, তাহলে পার্লামেন্টের স্পিকার বিরোধী দলকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানাবেন।

তারাও যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে ব্যর্থ হয়, তাহলে পুনরায় নির্বাচনের জন্য তিন মাস সময় বেঁধে দেবেন।

উল্লেখ্য, নতুন নির্বাচন হলেও সেই সরকার মাত্র এক বছরেরও কিছু কম সময় ক্ষমতায় থাকতে পারবে এবং মোট চার বছর পর পর নির্বাচনের নিয়ম অনুযায়ী আবারও নির্বাচন করতে হবে। অর্থাৎ মাত্র অল্প সময়ের জন্য নতুন কেউ সরকার গঠন করতে রাজি হবে কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। 

সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট এবং বাম দলের সঙ্গে দ্বন্দ্বের মূল কারণ ছিল মূলত আবাসননীতি নিয়ে। 'সুইডেনে নব নির্মিত আবাসনের ভাড়া নির্ধারণের ওপর সরকারের কোনো খবরদারি থাকবে না।' লফভেন সরকারের এই নীতির বিরোধিতা করেছিল ক্ষমতাসীন জোটের বাম দলটি। তাঁরা মনে করে, আবাসনের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভাড়াটেদের প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকতে হবে। যদি না থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ ভোক্তা অধিকার-আইনটি বলে সুইডেনে যা রয়েছে, তা মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন হবে এবং সুইডেনের বাড়িভাড়া ভাড়াটিয়াদের নাগালের বাইরে চলে যাবে, যা সরকার সমর্থিত জোটের অংশীদার বাম দল চায় না। ক্ষমতাসীন জোটের হয়েও আবাসন-রাজনীতিতে সরকারের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় বাম দল সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানায় এবং সুইডেনের রাজনীতিতে দেখা দেয় গভীর সংকট। 

২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সুইডেনের প্রধান দুই জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে জাতীয় নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন বাম জোট মোট ৪০.৬ শতাংশ ভোট পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। এর বিপরীতে ডান জোট পেয়েছিল ৪০.৩ শতাংশ ভোট। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ১৭.৬% ভোট পেয়ে সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম এবং ভারসাম্য দল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল হিটলারের নাৎসি আদর্শের অনুসারী উগ্র বর্ণবাদী দল ‘সুইডেন ডেমোক্র্যাট’। অনাস্থা ভোটে হেরে গিয়ে তাৎক্ষণিক এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী স্টেফান লফভেন বলেন, 'সুইডেনের যে রাজনৈতিক ঐতিহ্য এত দিন লালন করেছি, তা আজ শেষ হয়ে গেল।'

তিনি বলেন, মানবিক রাজনীতির প্রতীক সুইডেনের ঐতিহ্যবাহী এবং অত্যন্ত পুরনো দল ভেন্সতের পার্টি (বাম দল) আজ শুধু সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য উগ্র-ডানপন্থী দল 'সুইডেন ডেমোক্র্যাট’-এর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মেলাল। এতে শুধু সুইডেন নয়, শত বছরের সুইডেনের যে মানবিক রাজনীতির অনুশীলন বহমান ছিল, তা শেষ হয়ে গেল। তবে তিনি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি বিবেচনায় পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান।

বামদলীয় নেতা নুশি দাদগোস্টার অপর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিনি চান যে 'নব নির্মিত আবাসনের ভাড়া নির্ধারণের পর সরকারের খবরদারি জারি করে লফভেন আবারও প্রধানমন্ত্রী হোন। আমরা ধরে নিচ্ছি যে লফভেন এ ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন, যাতে তাঁর প্রতি আমাদের আস্থা ফিরে পেতে পারেন। তবে তাঁর দল কখনোই কোনো ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী সরকারকে সমর্থন দেবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।

সুইডেনে ভোট দেওয়া হয় দলকে। সে কারণে যে দল যত বেশি ভোট পায়, সে দলের আসনসংখ্যাও তত বেশি হয়। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে নির্বাচন শেষে প্রধানমন্ত্রী লফভেন তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ভাষায় সব দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, নাৎসি অনুসারী বর্ণবাদী দল সুইডেন ডেমোক্র্যাটকে প্রতিহত করার জন্য তাঁর সরকারের কোনো বিকল্প নেই। তিনি ‘ব­ক-পলিটিকস’ থেকে বেরিয়ে এসে সুইডেন বাঁচাতে সবার সমর্থন কামনা করেছিলেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এবারও তিনি সুইডেনকে রক্ষা করতে এবং বিশ্বে সুইডেনের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে যেকোনো মূল্যেই হোক, সবাইকে একজোট হয়ে উগ্রবাদকে প্রতিহত করার আহ্বান জানাবেন।



সাতদিনের সেরা