kalerkantho

সোমবার । ১১ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৬ জুলাই ২০২১। ১৫ জিলহজ ১৪৪২

ইসরায়েল কি ২০ বছরের বেশি টিকবে?

অনলাইন ডেস্ক   

২৭ মে, ২০২১ ১৬:৫৭ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



ইসরায়েল কি ২০ বছরের বেশি টিকবে?

অনেক দিন থেকেই social media-তে নেই গবেষণার ব্যস্ততা। এ কারণে ঈদ উপলক্ষে স্বেচ্ছা ছুটির সময়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  ঢুকে শুধু ফিলিস্তিনের ওপর হামলার খবর আর প্রতিক্রিয়া দেখছি। এমনিতেই প্রবাসে ঈদ ঈদের মতো লাগে না। তার ওপর ফিলিস্তিনের পরিস্থিতির কারণে এমন দুঃখভারাক্রান্ত ঈদ সম্ভবত আর কখনো হয়নি।

অনেককেই বলতে শুনি, এমনকি বিশেষজ্ঞ মতামত দিতেও দেখি যে হামাস যা করছে তা একেবারেই ভুল। হামাসের অনমনীয় ও আপসহীন মনোভাব ফিলিস্তিনীদের জন্য ক্ষতিকারক। তাদের পাণ্ডিত্য নিয়ে আমার সন্দেহ না থাকলেও তাদের  মাকসাদ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

একটি বিষয় লক্ষ করবেন, তারা কিন্তু শুধু এটুকু বলেই খালাস যে হামাসের কার্যকলাপ ফিলিস্তিনিদের জন্য ঠিক নয়। বরং একটু নমনীয় হলে আল-ফাতাহর মতো শান্তিচুক্তি করার পেছনে দৌড়ানোই শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য মঙ্গলজনক। তারা সম্ভবত ইতিহাস জানেন না বা এড়িয়ে যেতে চান।

অথচ তারা ভুলে যান, এ পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনিদের। ইসরায়েল ইহুদিদের নয়। আমার ভূমি থেকে আমাকে উৎখাত করা হচ্ছে, আর আমি কিনা শান্তিচুক্তি করে নিজের পিঠ বাঁচাব। আমার ভূমি না থাকলে আমার বেঁচে থাকারই বা কি সার্থকতা। আত্মসম্মান ছাড়া বাঁচতে পারে তো শুধু চাটুকার ও ফন্দিবাজরা।

আরো একটি বিষয়, এই পৃথিবীতে একটিও কি উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেখানে শান্তিচুক্তি করে কোনো মুসলিম দেশ স্বাধীনতা পেয়েছে। শুধু রক্তাক্ত সংগ্রামই ফায়সালা আনতে পারে, কোনো শান্তিচুক্তি নয়। পৃথিবীর শান্তিচুক্তির ইতিহাসে শুধুই বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। হয়তো দু-চার-দশ বছরের জন্য হামলা-আক্রমণ বন্ধ হয়েছে; কিন্তু শান্তি কি এসেছে? অত্যাচার- নির্যাতন-নিপীড়ন কি কমেছে? নাকি শান্তিচুক্তির আড়ালে তা-ও চলেছে হরদম।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথাই ধরুন। বঙ্গবন্ধু যদি শান্তিচুক্তি করে সর্বাত্মক যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে আসতেন, তাহলে কি বাংলাদেশ হতো? অথচ বঙ্গবন্ধুর সে সুযোগ ছিল না, তা বলা যায় না। অথচ সমঝোতার বদলে সংগ্রামে গিয়েই তিনি কিন্তু গালিব হয়েছিলেন। কী আশ্চর্য, এত সহজেই আমরা রোহিঙ্গাদের কথা ভুলে গেলাম ! যুগের পর যুগ বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে উৎখাত করা হয়েছে, নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। যখনই আন্তর্জাতিক মহল কিছুটা কথাবার্তা বলেছে, তারা নিশ্চুপ থেকেছে। তারপর কিছু সময় যেতেই আবার সেই একই অত্যাচার, হত্যা। আবার আলোচনা, আবার নিশ্চুপ। তারপর আবারও সেই ঘটনার পুনারাবৃত্তি।

ফিলিস্তিনেও কি একই কাজ হচ্ছে না? ধরা যাক, হামাস অস্ত্রবিরতিতে রাজি হলো, শান্তিচুক্তিতে এলো। তাহলে কাদের লাভ আর কার ক্ষতি? যে কজন ফিলিস্তিনি শাহাদাতবরণ করল, তাদের ক্ষতিপূরণ কী? প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ? পারবে কি ইসরায়েল গুণে গুণে সমসংখ্যক ইসরায়েলিকে হামাসের হাতে তুলে দিতে। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। তাহলে কিসের চুক্তি? অন্তত আমার জ্ঞানে ধরে না। এতজন ফিলিস্তিনি শহীদের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো অস্ত্রবিরতি/শান্তিচুক্তি হতে পারে না। যদি হয়ও তখনই শুধু ফিলিস্তিনিদের পরাজয় ঘটবে। নতুবা নয়।

অনেকে হয়তো বলবেন, আমি বাস্তবতা অস্বীকার করছি। আপাতদৃষ্টিতে, ফিলিস্তিনিদের বিজয় অসম্ভব। সারা দুনিয়ার বিরুদ্ধে একা লড়াই করে ইসরায়েলকে হটানো যাবে না। হ্যাঁ, আমিও মানি। তবে এটাও মানি, বিজয় শুধু জাগতিক হিসেবে চলে না। তেমনই বিজয় শুধু সামষ্টিক নয়, ব্যক্তিগত বিজয়ের হিসাবও মাথায় রাখা উচিত। ইসলামে বিজয়ের ধারণা শুধু অপরকে হত্যা করে পর্যুদস্ত করে দেশ দখল করা নয়। এর বিজয়ের ধারণা মোটাদাগে তিন প্রকার।

ক. লোকদের ইসলাম গ্রহণ হচ্ছে ইসলামের সবচেয়ে বড় বিজয়। বর্তমান সময়েও আমরা এমন বিজয় দেখি। ৯/১১-এ হামলার পর যখন মুসলিম বিশ্বে আগ্রাসন চালানো হলো, তখন অনেকেই বলেছিলেন, এতে মুসলিমদের কী লাভ হলো। শুধুই তো অত্যাচার আর পরাজয়। অথচ সে ঘটনার পর ইসলাম গ্রহণের হার দেখুন। কোরআনের বিজয়ের সঙ্গে নিশ্চিতই মিল খুঁজে পাবেন। (৯/১১ কে ঘটিয়েছিল ও কেন, তা নিয়ে তর্কে যেতে চাচ্ছি না। সেটা সম্ভবত কোনো দিনই আলোয় আসবে না।)

খ. দ্বিতীয় প্রকার বিজয় হচ্ছে- প্রচলিত অর্থে যে বিজয় তা। অর্থাৎ দুই পক্ষের মধ্যকার যুদ্ধে এক পক্ষের আত্মসমর্পণ বা পরাজয় মেনে নেওয়া।

গ. তৃতীয় প্রকার হচ্ছে ব্যক্তিগত বিজয়, যা শাহাদাত। আশ্চর্য হলেও সত্যি, ইসলামে শহীদের মর্যাদা গাজির চেয়ে বেশি।
বস্তুবাদী জগৎ এ শিক্ষাই দেয়, আমরাও এতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কোনো কিছুর হিসাব মেলানোর আগে এগুলোর ইকুয়েশন দিয়েই বিচার-বিশ্লেষণ করি। যে পক্ষে সামরিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক লিয়াজোঁ বেশি, সে পক্ষের জয় দেখতে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না। আমাদের এ ধারণার মূল কারণ দুটি –

ক. আমরা আমাদের ইতিহাস জানি না,

খ. আমরা বস্তুবাদের দ্বারাই প্রভাবিত, ইসলামের চেতনা দ্বারা নয়।

প্রসংগত বলে নিই, এই মানসিকতার ফলেই ইসরায়েলি ট্যাংক, কামান আর অত্যাধুনিক অস্ত্রের বিপরীতে ফিলিস্তিনিদের ইট-পাথর ছোঁড়া দেখে আমরা হাসিঠাট্টা করি; বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রেসলারের সঙ্গে কোনো এক অবুঝ শিশুর লড়াই হিসেবে তুলনা করি। অথচ মুসলিম হিসেবে আমাদের আরো সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।
   
তা ছাড়া আপনাদের কথামতো শান্তিচুক্তি বা অস্ত্রবিরতি চুক্তি করা হলো, তারপর কী? আবারও যে দশ বছর পর ইসরায়েল হামলা করবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে? অভ্যন্তরীণভাবে যে উৎখাত করা হবে না, একটু একটু করে যে ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল করা হবে না তার নিশ্চয়তা কী? অস্ত্রবিরতি হলে এসব খুব স্বাভাবিক। এত দিন এমনই হয়ে আসছে। ইয়াসির আরাফাত শান্তিচুক্তি করে নিজের আখের গুছিয়েছেন ঠিকই, ফিলিস্তিনিদের কী লাভ হয়েছে? আগেও নির্যাতিত হতো, নিজেদের ভূমি থেকে উৎখাত হতো, এখনো হচ্ছে।

অন্যদিকে অস্ত্রবিরতি না হলে কী হবে? এক এক করে ফিলিস্তিনিরা মারা যাবে, হয়তো সবাই নিহত হওয়ার পর ফিলিস্তিনের মাটি একদিন বহিরাগত ইহুদিদেরই হবে। অস্ত্রবিরতি হলেও তা-ই হবে, শুধু কিছুদিনের বেশ-কম। তার চেয়ে সিংহের মতো এক দিন বেঁচে থাকাই কি উত্তম? কাপুরুষের মতো হাজারবার মরার চেয়ে একবার মরাই কি কাম্য নয়?

পাশাপাশি যুদ্ধের মাধ্যমে হাতছাড়া হওয়ার মধ্যে দুটি স্পষ্ট উপকার আছে –

ক. সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষরা জানবে কারা ঠিক ছিল, আর কারা জালিম

খ. লড়াই করে চেষ্টা করার সান্ত্বনা। নয়তো চেষ্টা না করেই নিজ দেশ থেকে উৎখাত হওয়ার মানসিক কষ্ট আজীবন তাড়া করেই ফিরবে।

একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনেও মানুষ চিকিৎসা ব্যতীত মারা গেলে কতই না আফসোস করে। মানসিক এই বেদনা অনেক সময়ই মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। কেউ কেউ বলেন, হামাসের এই আপসহীন মনোভাবের কারণে তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ভালো নয়। অন্তত মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে। এখানেও আমার দ্বিমত। হ্যাঁ, হয়তো সম্পর্ক ঠিকই ভালো নয়। কিন্তু তাঁর দায়ভার কি শুধুই হামাসের? মুসলিম বিশ্বের নয়।  মানবতার বাণী শুধু দুর্বলদের বিপক্ষে; শক্তিমানদের বিপক্ষে গেলে মানবতা নেই। আর মুসলিমদের বিরুদ্ধে অপরাধ হলে তো মানবতার প্রশ্নই আসে না। কারণ মুসলিমরা তো মানুষই না।

পশ্চিমা বিশ্বের ভূমিকা দেখলেও বুঝতে পারবেন যে হামাসের অবস্থান ফিলিস্তিনিদের স্বার্থের অনুকূলেই হবে। ফাতাহ পশ্চিমা বিশ্বের স্বীকৃতি নিয়ে কী করতে পেরেছে? পশ্চিমা বিশ্ব এমনকি ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাদের গোনায় ধরে বলেও মনে হয় না। তারা জানে, আল ফাতাহ হচ্ছে বিষদাঁতহীন সাপ। এতে কিছুই হবে না। কোনো না কোনো দিন এ সাপকেও তারা ঘায়েল করবে। শুধু হামাসের নির্মূলের অপেক্ষা। তারপর আল ফাতাহকে নিশ্চিহ্ন করতে ইসরায়েলের এক সপ্তাহও লাগবে না। শান্তিচুক্তি আর অস্ত্রবিরতি চুক্তি করার আগেই সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সে কথা তোলার মতো কেউই আর তখন বেঁচে থাকবে না।

যাই হোক। এবারের যুদ্ধে হামাসের বেশ কিছু অ্যাচিভমেন্ট রয়েছে। খোলা চোখে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু আমাদেরকে আন্দোলিত করলেও আমাদের পজিটিভ দিকগুলো নিয়েও অ্যানালিসিস করা উচিত। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার "৫৭" হাজারের মতো সেনা নিহত হয়। যেখানে ভিয়েতনামিজ মারা যায় এক মিলিয়নেরও ওপরে। কিন্তু যুদ্ধে কিন্তু ভিয়েতনামই জয়ী। আফগান-রাশান যুদ্ধে রাশানদের চেয়ে তালেবানের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হলেও যুদ্ধে তালেবানরাই জেতে। একই কথা খাটে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারেও। আমাদের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হলেও আমরা জিতেছি। যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও যুদ্ধে কে জিতেছে সেটা বুঝতে দেখতে হবে কার উদ্দেশ্য হাসিল হয়েছে। আফগানে এখন তালেবানদের ৫০%-এর মতো নিয়ন্ত্রণ আছে। আমেরিকা চলে যাওয়া মাত্রই বাকিটাও দখল করে নেবে। ফলে আমেরিকা যতই বলুক যে তারা জিতেছে, আসলে তালেবানই জিতেছে। কারণ তাদের ক্ষমতা থেকে সরাতে পারে নাই।

হামাসের এবারের যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে বলে অবলীলায় বলা যায়, যা শ্লাঘা করার মতো বলে প্রতীয়মান হয়েছে। যেমন -

আয়রন ডোমকে একটু বাজিয়ে দেখা হলো। যদি একসঙ্গে অনেক বেশি রকেট বা মিসাইল ছোড়া হয়, তবে সেই ডোম প্রোপারলি ডিটেক্ট করতে পারে না। হামাসের তিন হাজারের ওপরের রকেট থেকে ডিটেক্ট করতে পেরেছে ৬০%-এর মতো। আয়রন ডোমের এ দুর্বলতা জানা গেল, আর হামাসের প্রযুক্তির তারাক্কির ব্যাপারটা সবাই জানতে পারল।
এত দিন একচেটিয়া পশ্চিমা ন্যারেটিভ মানুষ গোগ্রাসে গিলত। সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, রয়টার্স ইত্যাদি। আলজাজিরা, টিআরটি, আনাদেলু এজেন্সি সবাইকে একেবারে ন্যাংটা করে দিয়েছে। ফলে প্রথমদিকে ইসরায়েলের নাম না নিলেও এখন মোটামুটি সব পশ্চিমা মিডিয়াই ইসরায়েলের নাম নিচ্ছে। মিডিয়া যুদ্ধে হেরে যাওয়ার ফলেই মূলত আলজাজিরার বিল্ডিং ধসিয়ে দেয় ইসরায়েল। এপি না থাকলে হয়তো আলজাজিরার টিমকে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করত না।
ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, কিন্তু এ যুদ্ধে মাহমুদ আব্বাসের খুব একটা গুরুত্ব নেই। জো বাইডেন মাহমুদ আব্বাসকে কল দিলেও উনিও জানেন যে এ যুদ্ধ তিনি  থামাতে পারবেন না। হামাসের গুরুত্ব প্যালেস্টাইন তো বটে, মুসলিম-অমুসলিম সব রাষ্ট্রের কাছেই বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আয়েন্দা দিনগুলোতেও পাবে।

এবারের যুদ্ধে অভূতপূর্ব সাপোর্ট পেয়েছে প্যালেস্টাইন, আইরিশ এমপি, অস্ট্রিয়ান এমপি, মার্ক রাফালো, ইমরান খান, খোমেইনি, এরদোয়ান, শেখ হাসিনাসহ বেশির ভাগ বিশ্বনেতাই এর পক্ষে ছিলেন। লন্ডন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, প্যারিস, তুরস্ক, কাতারসহ মোটামুটি সব দেশেই ক্ষুদ্র বা বৃহৎ র‍্যালি হয়েছে। প্যালেস্টাইন ও হামাসের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি যোদ্ধাদের মোটিভেট করতেও ভূমিকা রাখবে। পশ্চিমারা হামাসকে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী হিসেবে দাঁড় করানোর যে প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে, সেটা মুখ থুবড়ে পড়েছে। সারা বিশ্ব দেখেছে আসলেই সন্ত্রাসী কারা।

সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে, হামাসসহ প্রতিটা মুসলিম বিশ্ব দেখেছে কারা মুসলমানদের বন্ধু আর কারা শত্রু। মানবতার বুলি আওড়িয়ে কারা নিরপরাধ শিশুদের হত্যায় উৎসাহ দেয়। প্রতিটা রাষ্ট্রকে দেখতে হবে প্যালেস্টাইনিদের চোখ দিয়ে। তারা যাদেরকে ভালো বলবে তারা ভালো আর যাদেরকে খারাপ বলবে তারা খারাপ। সেভাবেই সম্পর্ক পুনর্গঠন হবে।
আর এখন থেকে হয়তো মুসলিম শিশুরা ফিলিস্তিনি শিশুদের মতো সাহসী হতে চাইবে। হয়তো এই প্যালেস্টাইন ইস্যু সারা বিশ্বের মুসলিমদের এক করে তুলতে পারে।

ইসরায়েল গাজা বা লেবাননে স্থল অভিযান পরিচালনা করেনি, যা তাদের জন্য ভুল খেলা হতে পারত। গাজায় ইসরায়েলের শেষ স্থল আক্রমণে আল কাস্সাম ব্রিগেডের সাহসিকতায় তারা পিছু হটেছিল। ফলে ইসরায়েল এখন আর গ্রীষ্মকালে হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াইয়েরও ঝুঁকি নিতে চায়নি। তদুপরি, সিরিয়া থেকে চালিত সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের গভীরে প্রবেশ করেছে, যা ইসরায়েলের নিউক্লিয়ার প্লান্টের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’ যা বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়। তা ছাড়া  ইরান ও তুরস্ক উভয়ের কাছে আরো আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা ইসরায়েল কখনো থামাতে পারবে বলে অনুমান করছি  না। "৬" দিনের যুদ্ধের দিনগুলো অনেক আগেই গত হয়ে গেছে। ইরান স্থল থেকে স্থল ও আকাশে এবং পানির গভীরে ব্যবহারক্ষম দীর্ঘ পরিসরের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। সৌদি আরব ও মিসরের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের মধ্যেই অনেক বার্তা রয়েছে। ইসরায়েলি বিনিয়োগে ইথিওপিয়ায় নীল নদের উৎসে বাঁধ দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ মিসরের অর্থনীতির জন্য বাঁচা-মরার প্রশ্ন। ইসরায়েলের ইহুদিদের অনেকে বিশ্বাস করে, নবী মুসার হারিয়ে যাওয়া সিন্দুকটি ইথিওপিয়ায় পাওয়া যেতে পারে। ইথিওপিয়ায় নীল নদের ওপর দেওয়া ‘রেনেসাঁ বাঁধ’ চালুর উদ্যোগ ইসরায়েলের বাইরে, তুরস্কের মতো বড় আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতায় আসতে উৎসাহিত করেছে মিসরকে। এটি মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক খেলাকে বদল করে দিয়েছে। এর মধ্যে এরদোয়ানের সৌদি বাদশাহকে করা ফোন কলটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই সময়টাতে সৌদি আরবে কাতারি আমির, তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সফরও তাৎপর্যপূর্ণ। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন নিয়ে এর মধ্যে এরদোয়ান "২১" জন রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি খেলছেন কূটনীতির ময়দানে, আর ইরানের কাজ সম্ভবত প্রতিরোধযুদ্ধকে শক্তিমান করার ক্ষেত্রে। ইসরায়েলের খুব গভীরে ইসলামী জিহাদের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত নেতানিয়াহুর চোখের নিচে কালো দাগ ফেলেছে। তিনি যুদ্ধ বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে ওয়াশিংটনকে বার্তা দিয়েছেন।

তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, সৌদি আরব, মিসর, কাতার- এসব দেশের মধ্যে যেকোনো মাত্রার সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের হিসাব-নিকাশকে পাল্টে দিতে পারে। ইসরায়েলকে যত বড় বাঘ মনে করা হয়, বাস্তবতা সে রকম নয়। দেশটির প্রযুক্তিগত উন্নতির সীমাবদ্ধতা হামাস বা হিজবুল্লাহর মতো শক্তির সঙ্গে সংঘাতেই প্রকট হয়ে উঠছে। আমেরিকার সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তার বাইরে চিন্তা করা হলে ইসরায়েলের ক্ষমতা তার ভূখণ্ডগত অবয়বের মতোই সংকীর্ণ। তা ছাড়া ইসরায়েলকে যতটা অপরাজেয় বা অপ্রতিরোধ্য হিসেবে দেখানো হয়, আসলে তারা ততটা না। তারা প্রচণ্ড ভীতু একটা দেশ। ভালো রেঞ্জের কিছু মিসাইল হলেই ইসরায়েলকে থামানো সম্ভব।

এবার আসি কেন ইসরায়েল "২০" বছরের বেশি বহালতবিয়তে দায়েম ও কায়েম থাকবেনা- এর বেশ কিছু কারণ আছে, একটু খেয়াল করুন, 
পয়লা কারণ হলো :
হালের ইসরায়েলে "৯৩" লাখ জনসংখ্যার ইসরায়েলের "৫৪" লাখ ইহুদির শতকরা "৯৫" ভাগই এখন একই সঙ্গে অন্য কোনো দেশের নাগরিকও। তাদের অনেকেই দেশটির নিরাপত্তাহীনতার কথা ভেবে বিকল্প আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। 

দোসরা  কারণ হলো :
দেশটির অভ্যন্তরীণ নাগরিক সংহতিও এতটাই ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে যে চারবার নির্বাচন করেও সরকার গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না। পাঁচমিশালি সংস্কৃতির ইহুদি জনগোষ্ঠী যে যার মূল দেশের নেতাদের প্রতি বেশি আনুগত্য পোষণ করছে। রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থনে তার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। একসময় ইহুদিদের ধর্মনিষ্ঠতাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হতো। এখন যৌন ব্যবসার বৈশ্বিক কেন্দ্রগুলোতে বেশি ভিড় জমায় ইসরায়েলিরা।  এ কারণে হেনরি কিসিঞ্জার, ইরানের খামেইনি অথবা সাবেক শিন বেত প্রধানও বলেন-  অদূরভবিষ্যতে ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকবে বলে মনে করেন না। কেউ এর পেছনে জনসংখ্যামিতি ও আদর্শবোধ, কেউ আন্তর্জাতিক রাজনীতি আবার কেউ ডিভাইন কিছু দেখতে পাচ্ছেন।

তেসরা কারণ হলো :
ভেতর থেকেই যে ইসরায়েল রাষ্ট্রের ক্ষয় হচ্ছে সেটি প্রকাশ পেতে খুব বেশি সময় লাগবে বলে মনে হচ্ছে না। ইসরায়েলের পক্ষে উচ্চতর প্রশিক্ষিত সশস্ত্র বাহিনী, মার্কিন সরকার এবং রথচাইল্ড পরিবারের অন্ধ সমর্থন থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে একপর্যায়ে তার আধিপত্য বিস্তারে টান পড়তে শুরু করবে। রাশিয়ানদের এবার মুসলমানদের সমর্থন করার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। চীনের বার্তায়ও তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।  কেউ কেউ এমন ইঙ্গিতও দেন যে মুসলমানরা মধ্যপ্রাচ্যে গোঁড়া অর্থডক্স খ্রিস্টানদের কাছ থেকে সমর্থন পাবে এবার। তাদের বিশ্বাস অনুসারে, যিশুকে ইহুদিরাই কতল করেছিল। এখনই এসপার-ওসপার কিছু হয়তো হবে না, তবে ক্ষয় শুরু হয়ে গেছে ইসরায়েলের ভেতরে-বাইরে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো :
হামাস সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিবৃতির পর বিবৃতিতে যা অর্জন করতে পারেনি তা করেছে বিদ্বেষের ব্যাপারে ঐক্য দিয়ে। এটি লেবানন, জর্দান, পশ্চিম তীর এবং এমনকি ইসরায়েলের আরব সম্প্রদায়কে এমন ভীত করেছে যে, ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সবার ক্ষোভ একত্রিত হয়েছে। ইতিমধ্যে ইসরায়েল হয়ে পড়েছে বিভক্ত, রাজনৈতিক কলহ, অস্থিতিশীলতা এবং মারামারিতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন।’ যা ইসরায়েলের ডানপন্থী পত্রিকা জেরুসালেম পোস্টে একটি কলাম লিখেছেন, TZVI JOFFRE। ‘ইসরােল যুদ্ধ জিতেছে, লড়াইয়ে জিতেছে হামাস’ শীর্ষক এই লেখায় তিনি বলেছেন, ‘ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ‘অপারেশন গার্ডিয়ান অব দ্য ওয়ালস’-এ দুর্দান্ত সাফল্য লাভ করেছে, তবে এর মধ্যেই ঘরটি ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে বলে মনে হচ্ছে।’ তার মূল্যায়ন হলো, ‘আদতে, ফিলিস্তিনের বাস্তবতা হামাসের মতো ভালো আর কেউ জানে না। বোমার শব্দে ঘুম ভেঙে যখন দেখে তাঁর বসতভিটা নেই, কিংবা নেই প্রাণপ্রিয় স্ত্রী, সন্তান তখন এসিরুমে বসে দেওয়া ফতোয়া কোনো সান্ত্বনাই দিতে পারে না। যাদের জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত কাটে উদ্বেগে, বেদনায়, স্বজন হারানোর চিন্তায় তাদেরকে অস্ত্রবিরতি চুক্তির মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া তো শুধু প্রতারণা। প্রতিটি মুহূর্তে যারা অত্যাচারিত হচ্ছে, নামাজ পড়তে যাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে, জীবন-জীবিকার যাদের কোনো নিশ্চয়তা নেই, তাদের কাছে জীবনের মূল্যের চেয়েও স্বাধীনতার মূল্য বেশি।

আখেরে বলতে চাই, আমরা যারা ফিলিস্তিনিদের স্বার্থচিন্তা করে হামাসের বদলে ফাতাহর কার্যক্রমকে বা ফাতাহর মতো কার্যক্রমকে সমর্থন করি। তারা কিন্তু এ কথা ভুলে যাই যে খোদ ফিলিস্তিনিরা কিন্তু হামাসকেই চায়। “নিজেদের ভালো পাগলেও বোঝে” – এ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের চাওয়া নিশ্চয়ই অমূলক হওয়ার কথা না।

সব মিলিয়ে আমার মনে হয়, ফিলিস্তিনের ইস্যুতে বর্তমানে হামাসের অবস্থান ঠিকই আছে। বিনয়-নম্রতা-ক্ষমা ভালো গুণ নিঃসন্দেহে। কিন্তু জিহাদের ময়দানে নয়। সেখানে এসব দুর্বলতা ছাড়া আর কিছু নয়। তালেবানদের দেখে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাঁরা কিন্তু আজ ক্ষমতায়। ত্যাগ, কুরবানি তাঁরা কম দেয়নি। তার পরও আদর্শ থেকে সরে আসেনি। হামাস তাদের থেকে কিছুটা শিক্ষা নিলে মন্দ হয় না।

লেখক : শাহীদ কামরুল, সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক, কলামিস্ট ও আবৃত্তিকার, গবেষণারত ফ্রাই ইউনিভার্সিটি, বার্লিন, জার্মানি।

Email : [email protected] 



সাতদিনের সেরা