kalerkantho

মঙ্গলবার । ১ আষাঢ় ১৪২৮। ১৫ জুন ২০২১। ৩ জিলকদ ১৪৪২

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট

যে যুদ্ধের শেষ নেই!

অনলাইন ডেস্ক   

১৫ মে, ২০২১ ১১:৫১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



যে যুদ্ধের শেষ নেই!

ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে চলমান লড়াই যেরকম তীব্র হয়ে উঠেছে তাতে খুব শিগগিরই এই সংঘাত একটি 'পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে' রূপ নিতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গাজার ফিলিস্তিনিদের কাছে ঈদের পরদিন ভোরটি দুঃস্বপ্ন ভরা ছিল। এদিন ১৬০টি যদ্ধবিমান নিয়ে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। সঙ্গে ট্যাঙ্কের বহরও হামলায় অংশ নিয়েছিল। সাঁড়াশি এই অভিযানে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৩ জন। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ১২৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৩১ শিশু রয়েছে। এছাড়া আহত হয়েছেন ১ হাজারের কাছাকাছি।

সবশেষ এই সংঘাতের শুরুটা হয়েছে ইসরায়েল অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসা কয়েকটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে। এরপর ইসরায়েলের 'জেরুজালেম দিবস' পালনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। কিন্তু ইসরায়েলি আর ফিলিস্তিনিদের এই দীর্ঘ সংঘাতের পেছনের ইতিহাস আসলে কী?

এক শ বছরের পুরনো সংকট

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বেথলেহেমের একটি দৃশ্য। ছবি: গেটি ইমেজ

মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিন নামের যে এলাকা, সেটি ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমানদের পরাজয়ের পর ব্রিটেন ফিলিস্তিনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তখন ফিলিস্তিনে যারা থাকত তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল আরব, সেই সঙ্গে কিছু ইহুদি, যারা ছিল সংখ্যালঘু। কিন্তু এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করল যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্রিটেনকে দায়িত্ব দিল ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য ফিলিস্তিনে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার।

ইহুদিরা এই অঞ্চলকে তাদের পূর্বপুরুষদের দেশ বলে দাবি করে। কিন্তু আরবরাও দাবি করে এই ভূমি তাদের এবং ইহুদিদের জন্য সেখানে রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টার তারা বিরোধিতা করে।

১৯২০ থেকে ১৯৪০ দশকের মধ্যে ইউরোপ থেকে দলে দলে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে যেতে শুরু করে এবং তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ইউরোপে ইহুদি নিপীড়ন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভয়ঙ্কর ইহুদি নিধনযজ্ঞের পর সেখান থেকে পালিয়ে এরা নতুন এক মাতৃভূমি তৈরির স্বপ্ন দেখছিল। ফিলিস্তিনে তখন ইহুদি আর আরবদের মধ্যে সহিংসতা শুরু হলো, একই সঙ্গে সহিংসতা বাড়ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধেও।

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে এক ভোটাভুটিতে ফিলিস্তিনকে দুই টুকরো করে দুটি পৃথক ইহুদি এবং আরব রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। যেখানে পবিত্র নগরী জেরুজালেম আন্তর্জাতিক নগরী হিসেবে থাকবে বলে বলা হয়। ইহুদি নেতারা এই প্রস্তাব মেনে নেন, কিন্তু আরব নেতারা প্রত্যাখ্যান করেন। জাতিসংঘের এই পরিকল্পনা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি।

ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা এবং 'মহাবিপর্যয়'
ব্রিটিশরা এই সমস্যার কোনো সমাধান করতে ব্যর্থ হয়ে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ছাড়ে। ইহুদি নেতারা এরপর ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। সেসময় বহু ফিলিস্তিনি এর প্রতিবাদ জানান এবং এরপর যুদ্ধ শুরু হয়। প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সৈন্যরাও সেই যুদ্ধে অংশ নেয়।

হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে তখন হয় তাদের ঘরবাড়ি ফেলে পালাতে হয় অথবা চলে যেতে বাধ্য করা হয়। ফিলিস্তিনিরা এই ঘটনাকে 'আল নাকবা' বা 'মহা-বিপর্যয়' বলে থাকে।

পরের বছর এক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে যখন যুদ্ধ শেষ হলো, ততদিনে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ অঞ্চল দখল করে নিয়েছে। জর্ডান দখল করেছিল একটি অঞ্চল, যেটি এখন পশ্চিম তীর বলে পরিচিত। আর মিসর দখল করেছিল গাজা উপত্যকা।

পবিত্র জেরুজালেম নগরী ভাগ হয়ে যায়, ইসরায়েলি বাহিনী দখল করে নগরীর পশ্চিম অংশ, আর জর্ডানের বাহিনী পূর্ব অংশ। দুপক্ষের মধ্যে যেহেতু কখনোই কোনো শান্তি চুক্তি হয়নি, তাই উভয় পক্ষই অপর পক্ষকে দোষারোপ করতে থাকে। দুই পক্ষের মধ্যে পরের দশকগুলোতে এরপর আরো বেশ কয়েটি সর্বাত্মক যুদ্ধ হয়েছে।

১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় আরব মিত্র বাহিনীর সৈন্যরা ইহুদি মিলিশয়া বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে। ছবি : গেটি ইমেজ।

১৯৬৭ সালে আরেকটি যুদ্ধে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের পূর্ব জেরুজালেম এবং পশ্চিম তীর, সিরিয়ার গোলান মালভূমি, গাজা, এবং মিসরের সিনাই অঞ্চল দখল করে নেয়।

বেশির ভাগ ফিলিস্তিনি শরণার্থী থাকে গাজা এবং পশ্চিম তীরে। প্রতিবেশী জর্ডান, সিরিয়া এবং লেবাননেও আছে অনেক ফিলিস্তিনি।

ইসরায়েল এই ফিলিস্তিনি এবং তাদের বংশধরদের কাউকেই আর তাদের বাড়িঘরে ফিরতে দেয়নি। ইসরায়েল বলে থাকে, এদের ফিরতে দিলে সেই চাপ ইসরায়েল নিতে পারবে না এবং ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। ইসরায়েল এখনো পশ্চিম তীর দখল করে আছে। গাজা থেকে তারা যদিও সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে, কিন্তু জাতিসংঘের দৃষ্টিতে এটি এখনো ইসরায়েলের দখলে থাকা একটি এলাকা।

ইসরায়েল এখন পুরো জেরুজালেম নগরীকেই তাদের রাজধানী বলে দাবি করছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুজালেমকে তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে চায়। পুরো জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে কেবল যুক্তরাষ্ট্রসহ হাতেগোনা কয়েকটি দেশ।

গত ৫০ বছর ধরে ইসরায়েল এসব দখলীকৃত জায়গায় ইহুদি বসতি স্থাপন করে যাচ্ছে। ছয় লাখের বেশি ইহুদি এখন এসব এলাকায় থাকে।

ফিলিস্তিনিরা বলছে, আন্তর্জাতিক আইনে এগুলো অবৈধ বসতি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায়। তবে ইসরায়েল তা মনে করে না।

এখন কী ঘটছে?

ইসরায়েলি হামলায় জ্বলছে গাজা সিটি। ছবি : বিবিসি

পূর্ব জেরুজালেম, গাজা এবং পশ্চিম তীরে যে ফিলিস্তিনিরা থাকেন, তাদের সঙ্গে ইসরায়েলিদের উত্তেজনা প্রায়শই চরমে উঠে। গাজা শাসন করে কট্টরপন্থী ফিলিস্তিনি দল হামাস। ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের অনেকবার যুদ্ধ হয়েছে। গাজার সীমান্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ইসরায়েল এবং মিসর, যাতে হামাসের কাছে কোনো অস্ত্র পৌঁছাতে না পারে।

গাজা এবং পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা বলছে, ইসরায়েলের নানা পদক্ষেপ এবং কঠোর বিধি-নিষেধের কারণে তারা খুবই দুর্দশার মধ্যে আছে। অন্যদিকে ইসরায়েল দাবি করে যে, ফিলিস্তিনিদের সহিংসতা থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য তাদের এই কাজ করতে হয়।

হামাসের ছোড়া রকেট আকাশেই নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী প্রযুক্তি আইরন ডোম। ছবি : বিজনেস ইনসাইডার

এবছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি রমজানের শুরু থেকে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। তখন প্রায় প্রতিরাতেই ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল। পূর্ব জেরুজালেম হতে কিছু ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদের হুমকি ফিলিস্তিনিদের আরো ক্ষুব্ধ করে তোলে। এরপর ইসরায়েলের 'জেরুজালেম দিবস' পালনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।

মূল সমস্যাগুলো কী?
ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিরা বেশ কিছু ইস্যুতে মোটেই একমত হতে পারছে না। এর মধ্যে আছে- ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ব্যাপারে কী হবে? পশ্চিম তীরে যেসব ইহুদি বসতি স্থাপন করা হয়েছে সেগুলো থাকবে, নাকি সরিয়ে নেওয়া হবে? জেরুজালেম নগরী কি উভয়ের মধ্যে ভাগাভাগি হবে? আর সবচেয়ে জটিল ইস্যু হচ্ছে- ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্ন। গত ২৫ বছর ধরেই এই প্রশ্নে আলোচনা চলছে থেমে থেমে। কিন্তু কোনো সমাধান এখনো মেলেনি।

ভবিষ্যৎ তাহলে কী?
এককথায় বলতে গেলে, খুব সহসা এই পরিস্থিতির কোনো সমাধান মিলবে না। সংকট সমাধানের সবশেষ উদ্যোগটি নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এটিকে 'ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি' বলে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা ট্রাম্পের সেই উদ্যোগকে নাকচ করে দিয়েছিল। তাদের অভিযোগ ছিল এটি একেবারেই একতরফা একটি উদ্যোগ।

ভবিষ্যতের যেকোনো শান্তিচুক্তির আগে দুপক্ষকে জটিল সব সমস্যার সমাধানে একমত হতে হবে। সেটি যতদিন না হচ্ছে, দুপক্ষের এই সংঘাত চলতেই থাকবে।



সাতদিনের সেরা