kalerkantho

শুক্রবার । ৪ আষাঢ় ১৪২৮। ১৮ জুন ২০২১। ৬ জিলকদ ১৪৪২

কুম্ভমেলার তীর্থযাত্রীরা ভারতজুড়ে করোনা ছড়াচ্ছে

অনলাইন ডেস্ক   

১১ মে, ২০২১ ১১:৫৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কুম্ভমেলার তীর্থযাত্রীরা ভারতজুড়ে করোনা ছড়াচ্ছে

গতমাসে ভারত যখন করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিপর্যস্ত তার মধ্যেই হিমালয় অঞ্চলের শহর হরিদ্বারে কুম্ভমেলায় লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ হিন্দু সমবেত হয়েছিল। তখন অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, এই কুম্ভমেলা এক 'সুপার স্প্রেডার ইভেন্ট', অর্থাৎ করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়ানোর এক বড় অনুষ্ঠানে পরিণত হবে। সেই আশঙ্কা এখন সত্যি হচ্ছে। কুম্ভমেলা থেকে ফিরে আসা লোকজনকে পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে করোনা ধরা পড়ছে এবং তারা আরো লোকজনের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিয়েছে।

মাহান্ত শংকর দাস হরিদ্বারে এই উৎসবে যোগ দিতে এসেছিলেন ১৫ মার্চ। তখন ভারতের অনেক অংশেই কভিড-১৯ সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। উৎসব আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার চার দিন পর, এপ্রিলের ৪ তারিখে ৮০ বছর বয়সী এই হিন্দু পুরোহিত কভিড পজিটিভ বলে পরীক্ষায় ধরা পড়লেন এবং তাকে একটি তাঁবুতে ফিরে গিয়ে কোয়ারেন্টিনে থাকতে বলা হলো।

কিন্তু একাকী আলাদা থাকার পরিবর্তে মাহান্ত শংকর দাস তার ব্যাগ গুছিয়ে একটি ট্রেন ধরলেন এবং প্রায় এক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বারানসি পৌঁছালেন। সেখানে স্টেশনে তার ছেলে নগেন্দ্র পাঠক তাকে নিতে আসলেন এবং তারা আরো কিছু লোকের সঙ্গে একটি ট্যাক্সি শেয়ারে ভাড়া করে ২০ কিলোমিটার দূরের জেলা মির্জাপুরে তাদের গ্রামে পৌঁছালেন।

মাহান্ত দাস দাবি করছেন, তার কাছ থেকে কেউ ভাইরাসে সংক্রমিত হয়নি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তার ছেলে এবং গ্রামের আরো কিছু মানুষের মধ্যে কভিডের উপসর্গ দেখা গেল। তার ছেলে নগেন্দ্র পাঠক জানালেন, তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন, কিন্তু গত দুই সপ্তাহে গ্রামে জ্বর এবং কাশির উপসর্গ নিয়ে ১৩ জন মারা গেছে। এ গ্রামে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মাহান্ত দাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকতে পারে, আবার এটা না-ও হতে পারে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিনি দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ করেছেন। যাত্রীর ভিড়ে ঠাসা একটি ট্রেনে ভ্রমণ করে, শেয়ারের ট্যাক্সিতে চড়ে তিনি হয়তো পথে পথে অনেক জায়গায় ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছেন।

রোগতত্ত্ববিদ ডা. ললিত কান্ত বলছেন, মাস্ক না পরে তীর্থযাত্রীদের বড় দল যখন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে গঙ্গার বন্দনা করছে, তখন আসলে এটি দ্রুত ভাইরাস ছড়ানোর এক আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। আমরা জানি যে গির্জায় কিংবা মন্দিরে যখন সমবেত মানুষ একসঙ্গে কোরাসে গান গায়, সেটি তখন একটি 'সুপার স্প্রেডার ইভেন্টে' পরিণত হয়।

হরিদ্বারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেখানে ২৬৪২ জন তীর্থযাত্রী কভিড-পজিটিভ বলে ধরা পড়েছিল, যাদের মধ্যে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় নেতাও ছিলেন। উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব, নেপালের সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ এবং সাবেক রাণী কমল শাহ এই কুম্ভমেলা থেকে ফিরে আসার পর পরীক্ষা করে তারাও কভিডে আক্রান্ত বলে জানা গেছে।

বলিউডের সংগীত পরিচালক শ্রাবণ রাঠোরও এই কুম্ভমেলা থেকে ফেরার কদিন পর মুম্বাইয়ের এক হাসপাতালে মারা যান। মেলায় যোগ দিতে যাওয়া আরেকটি দলের ৯ জন হিন্দু ঋষি মারা যান।

কুম্ভমেলা থেকে ফেরা তীর্থযাত্রীরা অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে এমন আশঙ্কার মধ্যে কয়েকটি রাজ্য তাদের জন্য ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনের বিধান চালু করে। যারা কুম্ভ মেলায় যাওয়ার খবর চেপে যাওয়ার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেয়। কোন কোন রাজ্যে এদের জন্য আরটি-পিসিআর টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু খুব কম রাজ্যেই আসলে কুম্ভ মেলায় যাওয়া লোকজনের কোন তালিকা আছে এবং কোন রাজ্যেই এমন নিশ্ছিদ্র কোনো ব্যবস্থা নেই যেটি দিয়ে তাদের সীমান্ত দিয়ে কে ঢুকছে আর কে বেরুচ্ছে সেটার ওপর নজর রাখা যাবে।

গত দুসপ্তাহ ধরে ভারতের সব জায়গা থেকেই এমন খবর আসতে শুরু করেছে যে কুম্ভমেলা থেকে ফিরে আসা লোকজনকে পরীক্ষা করে কভিডের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। রাজস্থানের কর্তৃপক্ষ তাদের রাজ্যে, বিশেষ করে পল্লী এলাকায় দ্রুত কভিড ছড়িয়ে পড়ার জন্য তীর্থযাত্রীদের দায়ী করছে।

পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ওড়িশায় কুম্ভমেলা থেকে ফেরা ২৪ জনের কভিড ধরা পড়েছে। গুজরাটে কুম্ভমেলা থেকে ফিরছে এমন ৩১৩ জন ট্রেনযাত্রীর মধ্যে ৩৪ জনের কভিড ধরা পড়েছে। মধ্যপ্রদেশের একটি শহরে কুম্ভমেলা থেকে ফেরা ৬১ জনের মধ্যে ৬০ জনের, অর্থাৎ ৯৯ শতাংশই কভিড-পজিটিভ পাওয়া গেছে পরীক্ষায়। কর্মকর্তারা এখন কুম্ভমেলা থেকে ফেরা আরও ২২ জনকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন।

'এটা একটা ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ডেকে এনেছে' বলছেন ডা. কান্ত। 'আর এই সংখ্যাগুলো আসলে ভাসমান বরফখণ্ডের চূড়া মাত্র। এই তীর্থযাত্রীরা যখন দলবেঁধে ভিড়ের মধ্যে ট্রেনে-বাসে ভ্রমণ করছে, তখন কিন্তু তারা সংক্রমণের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকগুণ। আমি কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলতে পারি, ভারতে যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এত বাড়ছে, তার একটা প্রধান কারণ এই কুম্ভমেলা'।

সমালোচকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে এই কুম্ভমেলা বাতিল করতে চাননি, তার কারণ এটি করলে তিনি সম্ভবত মাহান্ত দাসের মতো ধর্মীয় নেতাদের দিক থেকে তোপের মুখে পড়তেন। এই হিন্দু পুরোহিত, ঋষি এবং গুরুরা বিজেপির বড় সমর্থক। তারা নির্বাচনের সময় হিন্দু ভোট জোগাড় করে দিতে বড় ভূমিকা রাখে।

কুম্ভমেলার জন্য ১২ এপ্রিল ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক দিন। সেদিন গঙ্গা নদীতে স্নান করেছেন ৩০ লাখের বেশি মানুষ। হিন্দুদের বিশ্বাস, এই গঙ্গাস্নানের মাধ্যমে তারা মোক্ষলাভ করবেন। আর সেদিন ভারতে ১ লাখ ৬৮ হাজার মানুষের করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে।
সূত্র : বিবিসি



সাতদিনের সেরা