kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ বৈশাখ ১৪২৮। ১০ মে ২০২১। ২৭ রমজান ১৪৪২

গণতন্ত্র মানবাধিকারে আশা জাগাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন

দেশে দেশে জোরালো হচ্ছে আন্দোলন, প্রতিবাদ

মেহেদী হাসান    

৩ মার্চ, ২০২১ ০২:১৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গণতন্ত্র মানবাধিকারে আশা জাগাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন

ছবি: ইন্টারনেট

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সমুন্নত রাখায় বাইডেন প্রশাসনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার আশা করছে, বাইডেন প্রশাসন রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এবং জলবায়ু ইস্যুতে ভূমিকা রাখবে। গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর বাইডেনকে অভিনন্দন জানিয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিও। দলটির বিবৃতিতে আশা ছিল, বিশ্বশান্তি ও গণতন্ত্রায়ণপ্রক্রিয়ায় বাইডেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।

বাইডেন প্রশাসন গত ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত প্রায় দেড় মাসে বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার, গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে সরব দেখা যাচ্ছে। বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বহির্বিশ্বে দৃশ্যত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান। ‘বার্মার (মিয়ানমার) জনগণ তাদের কণ্ঠস্বর শোনাচ্ছে, আর সারা বিশ্ব তাদের দেখছে’—গত ১০ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউস থেকে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারীদের এভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ‘বার্মা’ বদলে সামরিক জান্তার দেওয়া নাম ‘মিয়ানমার’ উচ্চারণ করছে না বাইডেনের যুক্তরাষ্ট্র। তাঁর প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তাঁদের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিং, বিবৃতি ও বিজ্ঞপ্তিতে। শুধু হোয়াইট হাউসের মুখপাত্রই নয়, প্রেসিডেন্ট নিজেও প্রায় নিয়মিতই সাংবাদিকদের কাছে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া জানান।

জো বাইডেন তাঁর নির্বাচনী প্রচারের সময়ই কথা দিয়েছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউসসহ সর্বত্র নিয়মিত সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা আবারও চালু করবেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় ব্রিফিং খুবই অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল। বাইডেনের এই নীতির প্রভাব বৈশ্বিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে পড়েছে। মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন বা চীন, রাশিয়ায় বিরোধী ও ভিন্নমতাবলম্বী, সংখ্যালঘু দমন-পীড়নের অভিযোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়াই শুধু নয়, বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কারাবন্দি লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু নিয়ে রাষ্ট্রদূতদের বিবৃতিও এখন প্রচার করেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র।

ট্রাম্পের আমলে কার্যত অনেক ইস্যুতেই চুপ ছিল তখনকার হোয়াইট হাউস। এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিশ্বব্যবস্থায় কিছুটা হলেও জবাবদিহি ফেরা শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক দায়বদ্ধতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। বাইডেন তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও বৈশ্বিক অঙ্গনে দায়বদ্ধতা ও দায়িত্ববোধ পালনে নেতৃত্ব দেওয়ার অবস্থানে ফিরিয়ে আনছেন। সম্প্রতি বাইডেন নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও বৈশ্বিক নেতৃত্বে ফিরে এসেছে।

এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকারে বিবিসিকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আবারও ফিরে এসেছে এবং মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন, ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষাসহ বৈশ্বিক ইস্যুগুলো সমাধানে পুরোপুরি সম্পৃক্ত আছে।’

মানবাধিকার ইস্যুতে অ্যান্টনি ব্লিনকেনের বক্তব্য, ‘যুক্তরাষ্ট্র তার বিরোধী, প্রতিযোগী, অংশীদার, মিত্র, সমমনা সবার ক্ষেত্রেই মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। আমরা মানবাধিকারকে গুরুত্বের সঙ্গে নিই। এ বিষয়টিকে প্রেসিডেন্ট (বাইডেন) তাঁর পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে রেখেছেন। আর এটি আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করব বলে দেশগুলো আশা করতে পারে।’

গত ১ ফেব্রুয়ারি ভোরে মিয়ানমারে যখন নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছিল তখন তার নিন্দা জানাতে হোয়াইট হাউস এক ঘণ্টা সময়ও নেয়নি। জো বাইডেন নিজেও আলাদাভাবে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছিলেন, নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও নিষেধাজ্ঞা জারি করবে। বাইডেনের সেই হুঁশিয়ারির কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিনকেন বাইডেন প্রশাসনের নীতি অনুসরণ করে মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফেরাতে এবং চাপ সৃষ্টির জন্য অন্য দেশগুলোকে উৎসাহিত করছেন। এর ফলে আরো অনেক দেশ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং আরো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে। মিয়ানমার ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসনের জোরালো প্রচেষ্টায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি যৌথ বিবৃতি দিতে সক্ষম হয়েছে।

ভারতের কৃষক আন্দোলন আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের প্রত্যাশা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডে প্রভাবশালী সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সম্পৃক্ততার তথ্য বাইডেন প্রশাসন প্রকাশ করেছে। এর পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মীসহ ভিন্ন মতাবলম্বীদের নিপীড়নকারীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দরজা বন্ধ করতে বাইডেন প্রশাসন চালু করেছে ‘খাশোগি ব্যান’ নামে একটি বিশেষ নিষেধাজ্ঞা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রকাশনা ফরেন পলিসির এডিটর অ্যাট লার্জ জনাথন টেপারম্যানের মতে, বাইডেন ঠিকই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও বিশ্ব নেতৃত্বে ফিরেছে। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রথম পাঁচ সপ্তাহ আর ট্রাম্পের প্রথম পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ফিরেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের কাজ শুরু করেন। মিয়ানমারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তিনি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। বিশ্বে কভিড মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র কোভ্যাক্সকে ৪০০ কোটি ডলার তহবিল দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, বলা হচ্ছে ‘আমেরিকা ইজ ব্যাক’। সত্যিকার অর্থে কতটা ফিরেছে তা বুঝতে আরো সময় প্রয়োজন। তবে এটি ঠিক যে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে। পেশাদার কূটনীতিকরা আবারও যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন সার্ভিসে ফিরছেন। তাঁরা কতটা সক্রিয় হন সেটির ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করবে।’ তিনি বলেন, শীতল যুদ্ধের সময়ও কিছু দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র, কিছু দায়িত্ব রাশিয়া পালন করত। পরবর্তী সময়ে কেউ তা পালন করছিল না। এ কারণে মিয়ানমারের মতো দেশ বুঝতে পেরেছে যে রোহিঙ্গাদের ওপর জেনোসাইড চালালেও তাদের জবাবদিহি করানোর মতো কেউ নেই।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হোয়াইট হাউস বা পররাষ্ট্র দপ্তরের মতো পোডিয়াম থেকে যখন কোনো মন্তব্য করা হয় তখন তা নিঃসন্দেহে অনেককে অনুপ্রাণিত করে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে এখন পরিবর্তন এসেছে। বাইডেন প্রশাসন অনেক ইস্যুতে কথা বলে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি তাদের কাজও দেখাতে হবে।’ তিনি বলছেন, বাইডেন প্রশাসনের জন্যও অভ্যন্তরীণ অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। যুক্তরাষ্ট্র আবারও বিশ্বে ফেরার চেষ্টা করছে। তবে কতটা পারবে তা সময়ই বলে দেবে।

ড. ইমতিয়াজ মিয়ানমার ও সৌদি আরবের উদাহরণ দিয়ে বলেন, বাইডেন প্রশাসন এক মাস ধরে কথা বলেও মিয়ানমারে পরিবর্তন আনতে পারেনি। জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাইডেন প্রশাসন বলছে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশেই ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আবার সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে সৌদি যুবরাজের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো অবশ্য পুরোপুরি হতাশ নয়। তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন বিশ্বে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ইস্যুতে কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাচ্ছেন। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নের অভিযোগে বাইডেন প্রশাসন রাশিয়ার বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। মানবাধিকার ইস্যুতে চীন, সৌদি আরবকে সতর্ক করেছে। সৌদি আরবের উদ্বেগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তার ঘোষিত সন্ত্রাসী তালিকা থেকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বাদ দিয়েছে। বাইডেন দুই রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ফিলিস্তিনিদের জন্য ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। বাইডেন প্রশাসন নীতিগত কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) বিচারিক এখতিয়ার অস্বীকার করলেও জবাবদিহিমূলক অন্যান্য উদ্যোগকে সমর্থন জানাচ্ছে।

তুরস্কের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক বুরহানেটিন ডুরান তাঁর ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য জো বাইডেন অ্যাফেক্ট’ নিবন্ধে লিখেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশে পটপরিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রভাব বিশ্বে পড়তে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকাই প্রথম’ নীতি বিশ্বে বিশৃঙ্খলা এবং ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। কোনো সন্দেহ নেই যে বাইডেনের ‘আমেরিকা ফিরে এসেছে’ নীতি এবং বিশ্বের গণতন্ত্রগুলোর সঙ্গে তাঁর জোট করার পরিকল্পনার প্রভাব কী হতে পারে তা বিশ্বের সরকারগুলো সঠিকভাবে ধারণা করতে চাইবে। তাঁর মন্ত্রিসভায় যাঁরা স্থান পেয়েছেন তাঁরা দেশে ও বিদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বাধীনতা ইস্যুতে অনেক সরব থাকবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট ও উপপরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বে গণতন্ত্র ও যথার্থতার বিষয়ে যথেষ্ট দৃষ্টি দেননি। অনেক ক্ষেত্রে তিনি নির্দ্বিধায় একনায়কদের সঙ্গে সখ্য গড়েছিলেন। বাইডেন আগেই বলেছেন, এ ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান ট্রাম্পের চেয়ে অনেক আলাদা হবে। গণতন্ত্রকে উৎসাহিত করাই হবে তাঁর পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি।’



সাতদিনের সেরা