kalerkantho

শনিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৪ রজব ১৪৪২

মঙ্গলে নাসার নভোযান যেসব অনুসন্ধান চালাবে আগামী দুই বছর

অনলাইন ডেস্ক   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১৯:৪০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মঙ্গলে নাসার নভোযান যেসব অনুসন্ধান চালাবে আগামী দুই বছর

ছবি: বিবিসি।

রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পর নাসার মহাকাশযান পারসিভেয়ারেন্স’র রোবট সফলভাবে মঙ্গল গ্রহের বুকে নামার পর সেখান থেকে ছবি পাঠাতে শুরু করেছে। গ্রহের বিষুব অঞ্চল, যার নাম জেযেরো, তার কাছে গভীর এক গহ্বরে এই রোবটকে নামানো হয়েছে।

নভোযানটি মঙ্গলের মাটি স্পর্শ করার মুহূর্তে উল্লাসে ফেটে পড়েন ক্যালিফোর্নিয়ায় নাসার মিশন কন্ট্রোলের প্রকৌশলীরা। ছয় চাকার এই রোবটযান আগামী দু'বছর মঙ্গল গ্রহ থেকে নমুনা সংগ্রহের কাজ করবে। প্রাচীন হ্রদ এলাকার মাটিপাথরের মধ্যে খনন চালিয়ে এটি অতীত অণুজীবের অস্তিত্ব সন্ধানের কাজ করবে।

ধারণা করা হয়, জেযেরোয় কয়েকশো' কোটি বছর আগে বিশাল একটি হ্রদ ছিল। সেই হ্রদে ছিল প্রচুর পানি এবং খুব সম্ভবত সেখানে প্রাণের অস্তিত্বও ছিল। পারসিভেয়ারেন্সের রোবটযানটি প্রথম যে দুটি ছবি পৃথিবীতে পাঠিয়েছে, সে দুটি তোলা হয়েছে দুর্বল শক্তির প্রকৌশলী ক্যামেরা দিয়ে। ক্যামেরার লেন্সে ধুলার আস্তরণের মধ্যে দিয়ে পারসিভেয়ারেন্সর রোভার অর্থাৎ ওই রোবটযানের সামনে ও পেছনে সমতল ক্ষেত্র দেখা যাচ্ছে।

নাসার বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, রোবটযানটি জেযেরোর ব-দ্বীপের মতো চেহারার একটি অংশের দুই কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবতরণ করেছে। এই এলাকাতেই পারসিভেয়ারেন্স তার সন্ধান কাজ চালাবে। 

জেযেরো গহ্বর নিয়ে বিজ্ঞানীরা কেন এত উৎসাহিত?

পয়তাল্লিশ কিলোমিটার চওড়া জেযোরো-র নামকরণ করা হয় বসনিয়া-হের্যেগোভিনা শহরের নামে। স্লাভিক অঞ্চলের কোন কোন দেশের ভাষায় ‘জেযেরো’ শব্দের অর্থ হলো ‘হ্রদ’। হয়ত সে কারণেই এই নামকরণ।

জেযেরোতে বিভিন্ন ধরনের পাথর রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে মাটিপাথর এবং কার্বোনেটস। বিজ্ঞানীদের উৎসাহের কারণ হলো, এ ধরনের পাথরের যেকোন রকম অণুজীবের অস্তিত্ব সংরক্ষণের ক্ষমতা রয়েছে। ফলে সূদুর অতীতে এই গ্রহে যদি প্রাণের অস্তিত্ব থেকে থাকে, তাহলে এই পাথরের মধ্যে তার ইঙ্গিত মেলার আশা করছেন তারা।

প্রাচীন হ্রদের যেটা তীর ছিল, সেখানে পলির মতো যে সেডিমেন্ট রয়েছে - যাকে বলা হচ্ছে ‘বাথটাব রিং’। বিজ্ঞানীরা সেটা বিশ্লেষণ করতে বিশেষভাবে আগ্রহী। পৃথিবীতে যেটাকে স্ট্রোমাটোলাইট বলা হয়, এখানে তার সন্ধান চালাবে পারসিভেয়ারেন্স।

স্ট্রোমাটোলাইট হলো ব্যাকটেরিয়ার নিঃসরণ থেকে তৈরি জমাট বাধা পদার্থ। পৃথিবীতে প্রাণের প্রথম অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল স্ট্রোমাটোলাইটের জীবাশ্ম থেকেই। ইন্ডিয়ানার পারডিউ ইউনিভার্সিটির ড. ব্রিওনি হর্গান বলেছেন, কোন কোন হ্রদে দেখা যায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণুর আস্তরণ এবং কার্বোনেটের মধ্যে রাসায়নিক যোগাযোগের ফলে এ ধরনের বিশাল শিলাখণ্ডের স্তর তৈরি হয়। জেযেরোতে যদি একই ধরনের কাঠামোর সন্ধান পাওয়া যায়, সেটা এই গবেষণায় আমাদের জন্য নতুন পথ খুলে দেবে। সেটা হবে মঙ্গলের জৈব-জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী আবিষ্কার। 

মঙ্গলে প্রাণের সন্ধান চালানো হবে কিভাবে? 

বর্তমানে মঙ্গল গ্রহের আবহাওয়া বেঁচে থাকার অনুকূল নয়। সেখানে আবহাওয়া এতই ঠাণ্ডা যে পানি সেখানে তরল অবস্থায় থাকতে পারে না। বায়ুমণ্ডলও এতই পাতলা যে চড়া আলোকরশ্মির বিকিরণ মাটির উপরিভাগের সবকিছু ধ্বংস করে ফেলে। কিন্তু সবসময় মঙ্গলের পরিবেশ এমনটা ছিল না। সাড়ে তিনশ কোটি বছর কিংবা তারও আগে সেখানে পানি প্রবাহ ছিল। বিভিন্ন যেসব খাঁড়ি দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো, তার ছাপ এখনও গহ্বরের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। ক্ষতিকর বিকিরণ ঠেকানোর জন্য আবহাওয়া মণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘন আস্তরণও ছিল।

প্রাণের অস্তিত্বের জন্য যেহেতু পানি গুরুত্বপূর্ণ, তাই মনে করা হয় মঙ্গল গ্রহে একসময় জীবন ছিল। মঙ্গলের মাটিতে এখনো কোনো প্রাণের লক্ষণ আছে কি না, তা দেখতে ১৯৭০- এর দশকে ওই গ্রহে ভাইকিং নামে একটি মহাকাশ মিশন পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তাদের ফলাফল কিছু প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়।

অতীত মিশন

নাসা 'মার্স এক্সপ্লোরেশন রোভারস' নামে একটি মহাকাশযান ২০০০-এর প্রথম দিকে মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়েছিল ‘পানির সূত্র’ ধরে অনুসন্ধানের কাজে। অপারচুনিটি এবং স্পিরিট নামে দুটি মিশন তরল পানির উপস্থিতি সম্পর্কে ব্যাপক ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ সংগ্রহ করেছিল।

কিউরিওসিটি রোভার ২০১২ সালে মঙ্গলে অবতরণ করেছিল এবং গহ্বরের যে অংশে সেটি নেমেছিল, সেটি একসময় পানিতে ভরা ছিল এবং দেখেছিল যে সেখানে জীবনের অস্তিত্ব থাকার উপকরণ রয়েছে। ওই রোভার এমন জৈব অণুর সন্ধান পেয়েছিল যাতে জীবনধারণের উপযোগী কার্বন রয়েছে। এখন পারসিভেয়ান্স তার অতি উন্নত প্রযুক্তি ও যন্ত্রসরঞ্জাম দিয়ে একই ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজ চালাবে আগামী দুই বছর।

ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনায় নাসার গবেষণাগারে এই পারসিভেয়ারেন্স মিশনের ডেপুটি প্রজেক্ট বিজ্ঞানী কেন উইলিফোর্ড বলেছেন, ‘ভাইকিং মিশনের পর এটাই এই গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের কাজ চালাচ্ছে। ভাইকিং-এর কাজ ছিল মঙ্গল গ্রহে এই মুহূর্তে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব আছে কি না তা দেখা। আর নাসার এই বর্তমান মিশনে লক্ষ্য হচ্ছে মঙ্গলের অতীত পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। কারণ যেসব তথ্য উপাত্ত আমাদের হাতে রয়েছে, তা থেকে এটা পরিষ্কার যে প্রথম কয়েকশো' কোটি বছরে মঙ্গল গ্রহ জীবন ধারণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী গ্রহ ছিল ‘

আগামীর পরিকল্পনা

পারসিভেয়ারেন্স সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পাথরের নমুনা এখন সংগ্রহ করবে এবং ছোট ছোট টিউব বা সিলিন্ডারে ভরে সেগুলো মঙ্গলের পৃষ্ঠে রেখে আসবে। এই দশকের শেষে সেই সিলিন্ডারগুলো পৃথিবীতে নিয়ে আসার জন্য কয়েকশো' কোটি ডলারের একটি যৌথ প্রকল্প হাতে নিয়েছে নাসা এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এসা (ইএসএ)।

সেটি হবে জটিল একটি মিশন। এর জন্য পাঠানো হবে দ্বিতীয় একটি রোভার - মঙ্গলে পাঠানো হবে একটি রকেট এবং একটি বিশাল উপগ্রহ, যেগুলোর মাধ্যমে জেযেরো থেকে সংগৃহীত সব নমুনা পৃথিবীতে আনা হবে বিশ্লেষণ ও গবেষণার জন্য। 

পারসিভেয়ারেন্স অণুজীবের অস্তিত্বের কোনো নমুনা যদি সংগ্রহও করতে পারে, যা মঙ্গল গ্রহে জীবনের অস্তিত্বের ইঙ্গিতবাহী হতে পারে, তা নিয়ে নিঃসন্দেহে অনেক কাটাছেঁড়া হবে। এসব তথ্যপ্রমাণের বিশ্বাসযাগ্যতা নিয়ে তৈরি হবে নানা বিতর্ক, ঠিক যেভাবে পৃথিবীতে প্রাণের প্রথম অস্তিত্ব নিয়ে অনেক বিতর্ক এখনও আছে।

তাই এই গ্রহে অতীত জীবনের অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীদের নানা গবেষণা ও তথ্যপ্রমাণের চুলচেরা বিশ্লেষণ মানুষের জন্য আগামী বহু বছর ধরে আগ্রহের বিষয় হয়ে থাকবে। তবে নাসার গবেষণাগার জেট প্রোপালসান ল্যাবের পরিচালক মাইক ওয়াটকিন্স বলেছেন, এই মিশনের প্রথম কয়েকদিন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হবে। কারণ এই প্রথম মঙ্গল গ্রহের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশে পৃথিবীর প্রথম প্রতিনিধি গিয়ে পৌঁছেছে, যেখানে আগে কেউ যায়নি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা