kalerkantho

শুক্রবার । ২০ ফাল্গুন ১৪২৭। ৫ মার্চ ২০২১। ২০ রজব ১৪৪২

ট্রাম্প গেলেও তাঁর মিথ্যাচার থেকে রেহাই মিলছে না

জনাথন ফ্রিডল্যান্ড   

২২ জানুয়ারি, ২০২১ ০২:৩৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ট্রাম্প গেলেও তাঁর মিথ্যাচার থেকে রেহাই মিলছে না

সত্য কষ্ট দেয় বটে; কিন্তু মিথ্যাকে বিনাশ করে। গত ১২টি মাস দেখতে হলো এক ভয়ানক স্বচ্ছতার সঙ্গে। কভিড সম্পর্কে মিথ্যা বলা হলো। জোর দিয়ে বলা হলো এটি একটি বিশেষ মহলের ধাপ্পাবাজি। ফলে লাখ লাখ মানুষ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এড়িয়ে গেল এবং আক্রান্ত হলো। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় মিথ্যাটি ছিল মার্কিন নির্বাচন ইস্যুতে। দাবি করা হলো, পরাজিত হওয়ার পরও ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন। এটাই ক্যাপিটল ভবনে তাণ্ডব চালানোর পথ দেখিয়ে দিল এবং সহিংসতার উদগিরণে পাঁচ-পাঁচটা জীবন ঝরে পড়ল।

এই ঘটনার প্রভাব এত দ্রুত পড়ল এবং ঘটনাগুলো চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে ছুটে চলেছে যে এর তাৎপর্য বোঝাই মুশকিল। গত সম্পাহে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইতিহাসের তৃতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিশংসন করা হয়েছে, যাঁকে আগেও একবার অভিশংসন করা হয়েছিল। অতীতে অভিশংসন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে হলেও এবার এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটেছে। দুটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে এটা হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে অভিযুক্ত ব্যক্তির দায়িত্বভার তখন মাত্র কয়েক দিন বাকি ছিল। দ্বিতীয়ত, হাউসের সদস্যরাই তাণ্ডবের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন।

এটাও অস্বাভাবিক যে এই সিদ্ধান্ত একেবারেই দলীয় অবস্থান থেকে নেওয়া হয়নি। ১০ জন রিপাবলিকান সদস্য অবস্থান বদল করেছেন। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হলো ১৯৭ জন রিপাবলিকান সদস্যের বিরোধিতা। দৃশ্যত তাঁরা একটি জাতির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত আইন পরিষদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টের সহিংস বিদ্রোহের উসকানিকে গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন।

এরপর সিনেটে বিচার প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন হবে। প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হবে। কারণ দলে ট্রাম্পবন্দনার যে ঘাঁটি তৈরি হয়েছে তা নিয়ে বেশির ভাগ রিপাবলিকান সিনেটরই শঙ্কিত। ফলে তাঁরাও হাউসের ১০ জনের বদলে ১৯৭ জনের পথই অনুসরণ করবেন। তবে ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার পরও সিনেটের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন। সেটা হলে তাঁর সরকারি পদে ফিরে আসা (আবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়া) চিরতরে নিষিদ্ধ হতে পারে।

রিপাবলিকান নেতারা যদি ট্রাম্পের সম্ভাবনা এবং একটি রাজবংশের উত্তরাধিকারকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হন, তাহলেও তাঁরা ট্রাম্প থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছেন না। স্বতঃসিদ্ধ কথা হলো, ট্রাম্পবাদ টিকে থাকবে।

নািসবাদের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ টিমোথি স্নাইডারের বিখ্যাত উক্তি, ‘মিথ্যা মিথ্যাবাদীকেও ছাড়িয়ে যায়।’ যদি ট্রাম্প সমর্থকরা বিশ্বাস করতে থাকে যে তাদের লোক নভেম্বরে বিশাল জয় পেয়েছে—এমনকি যেখানে এখনো মাত্র ২২ শতাংশ রিপাবলিকান নির্বাচনকে অবাধ এবং নিরপেক্ষ মনে করে, সে ক্ষেত্রে আগামী চার বছরে এই চুরির ব্যাপারে তাদের ক্রোধ কমে যাওয়ার কোনো কারণ নেই, বরং বাড়বে। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালে ‘বকেয়া’ শোধ করার দাবি উঠবে। প্রয়োজন হলে জোর করেই তা করা হবে।

সুতরাং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে কী করা দরকার তার চেয়েও অনেক বড় প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। সেটা হচ্ছে এত বড় মিথ্যাকে কিভাবে মোকাবেলা করা যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম কাজটা হবে জায়গামতো ওষুধ দেওয়া।  প্রথম করণীয়টা হবে সত্যতার প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা পুনরুদ্ধার নয়, বরং নাগরিকদের সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য উপযুক্ত করে তোলা।

মিডিয়া পরিষ্কারভাবে এসব কিছুর কেন্দ্রে অবস্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্রে এখন দুটি পৃথক বুদ্ধিবৃত্তিক বলয় পাশাপাশি অবস্থান করছে। একটি এমএসএনবিসি বলয়, যাঁদের কাছে বাইডেন ন্যায্য উপায়েই জয়লাভ করেছেন। আরেকটি হচ্ছে ফক্স নিউজ বলয়, যারা মনে করে ট্রাম্পকে ডাকাতি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অতীতের ফেয়ারনেস ডকট্রিন (স্বচ্ছতার নীতি) নিয়ে সহজেই স্মৃতিকাতর হওয়া যায়। এই নীতির কারণে ব্রডকাস্ট নেটওয়ার্কগুলোকে ভারসাম্যতা অনুসরণ করতে হতো। শেষ পর্যন্ত রোনাল্ড রিগানের আমলে ১৯৮৭ সালে এই নীতি ওঠে যায়। কিন্তু এই নীতি কার্যকর থাকলে আজকের এই বিভাজনের দেয়াল ভেঙে ফেলা যেত।

একমাত্র কেবল টিভি বা গণমাধ্যমকেই কাঠগড়ায় তুললে হবে না। জ্ঞানের যে আলাদা আলাদা অস্তিত্ব আছে, তার সদর্প অবস্থান দেখা যাচ্ছে ফেসবুক ও টুইটারে। ডিজিটাল সাংবাদিকতা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এমিলি বেল বলেছেন, এই প্ল্যাটফর্মগুলোর বাহ্যিক নিরীক্ষার দাবি আরো বাস্তবসম্মত হতে পারে, বিশেষ করে প্রকাশ্য পর্যালোচনার জন্য তাদের অ্যালগরিদম খুলে দেওয়া উচিত। বেলের পরামর্শ হচ্ছে, ‘জ্ঞানের সামাজিক কাঠামো’র উন্নয়নের জন্য গ্রন্থাগার থেকে শুরু করে স্থানীয় রিপোর্টিংয়ের ধরন পর্যন্ত সর্বত্র বিপুল বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে ক্ষমতাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা যায়।

মিথ্যার ওপর গড়ে ওঠা কভিড ও ট্রাম্প বিষয়ক জোড়া সংকট মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সত্যের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সত্য নিজেকেই রক্ষা করতে হবে এবং পাল্টা লড়াই শুরু করতে হবে।

 

লেখক : গার্ডিয়ান কলামিস্ট

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা