kalerkantho

শুক্রবার । ২০ ফাল্গুন ১৪২৭। ৫ মার্চ ২০২১। ২০ রজব ১৪৪২

সংশয়ে ভরা নতুন দিনের স্বপ্ন

শামীম আল আমিন, নিউ ইয়র্ক   

২১ জানুয়ারি, ২০২১ ০৪:৩৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সংশয়ে ভরা নতুন দিনের স্বপ্ন

নাটকীয়তায় ভরপুর কোনো সিনেমা কিংবা পাতায় পাতায় রহস্যে ভরা কোনো উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ যেন। কিংবা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের মতো, শেষ হয়েও, শেষ হয় না। যে কারণে বলা যাচ্ছিল না, এরপর কি? যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির চেহারা এমনটা কে কবে দেখেছে, স্মরণে নেই কারো। ইতিহাসের বই উল্টে-পাল্টেও এমন জটিল ও ঘটনাবহুল সময় খুঁজে পাচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। তবে আপাতদৃষ্টিতে গণতন্ত্রের জয়টাকেই বড় করে দেখছেন সবাই। তবে এমন শক্তিশালী গণতন্ত্রও যে একজন মানুষের জন্যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যাবে, সেটা নিয়েও কেউ কখনো ভাবেননি। 

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে প্রায় চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ। জো বাইডেনের অভিষেকের মধ্য দিয়ে তিনি কি প্রত্যাশা করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বর্ষিয়ান এই সাংবাদিক বলেন, 'গণতন্ত্রের জন্যে ক্ষতিকারক একজন প্রেসিডেন্টের বিদায়ে আমি খুব স্বস্তি পাচ্ছি। সেই সঙ্গে একজন সভ্য, ভদ্র ও অভিজ্ঞ অভিভাবক পেয়েছে দেশ। আমি বিশ্বাস করি তিনিই পারবেন বিশ্বের বুকে আমেরিকার সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে'।

২০২০ সালের ৩ নভেম্বর হয়ে যাওয়া নির্বাচনের পর থেকে শেষ পর্যন্ত ফলাফল মানেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। বরং একের পর এক মামলা থেকে শুরু করে হামলা পর্যন্ত দেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ। তাও গত ৬ জানুয়ারি দেশটির অন্যতম স্পর্শকাতর ও মর্যাদার ক্যাপিটল ভবনে নজিরবিহীন হামলা চালায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থকরা। ফলে আরো একটি ইতিহাস গড়ে দ্বিতীয়বারের মতো অভিশংসিত হতে হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। সেই থেকে গোটা দেশজুড়ে বিরাজ করছে থমথমে অবস্থা। কখন কি হয়, সে নিয়ে উদ্বেগ! 

একদিকে করোনা মহামারির জটিল অবস্থা, মৃত্যু ছাড়িয়ে গেছে চার লাখেরও বেশি। অন্যদিকে নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অভিষেককে ঘিরে ছিল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির শংকা। ফলে উৎসবের আকাশ ঢেকে যায় অনেকটা কালো রঙে। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। আক্ষরিক অর্থেই গোটা শহরটাকে ঢেকে ফেলা হয় নিরাপত্তার চাদরে। ২৫ হাজার ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য মোতায়েন করা হয় সেখানে। দেশটির রাজধানীতে এত বেশি সেনা সমাবেশ কেউ কখনো দেখেনি। এমনকি সেটা যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত ইরাক, আফগানিস্তান কিংবা সিরিয়ায় মোতায়েন করা মার্কিন সেনাদের চেয়েও বেশি। ফলে অনেকটা আক্ষেপ করেই ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আলাবামার ডিজিটাল জার্নালিজমের সহযোগী অধ্যাপক ড. এম দেলোয়ার হোসেন বলছিলেন, 'এমনটা প্রত্যাশিত ছিল না'।

অনেককেই বলতে শোনা গেছে, 'মনে হচ্ছে বিদেশি কোনো শত্রুর মুখে দেশ'। অথচ এ যেন 'ঘরের শত্রু বিভীষণ'। নিজেদের ছায়ার সঙ্গেই ভিন্ন এক লড়াই। নিউজার্সির প্লেইনবোরে টাউনশিপের ডেমোক্রেটিক কাউন্সিলম্যান ড. নুরুন নবী তার ফেসবুকে লিখেছেন 'ট্রাম্পের দুঃসময়ের শেষ। বাইডেনের স্বপ্নের অধ্যায়ের শুরু'।

বারবারই ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন জো বাইডেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের অভিষেক ভাষণে আরো একবার বললেন 'একতা'র কথা। নির্বাচনের পর থেকে তিনি এবং তার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস অত্যন্ত শান্ত ও বিচক্ষণ পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করে আসছেন। পেন্সিলভেনিয়ার লক হ্যাভেন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান বলেন, 'বাইডেন অভিজ্ঞ। তার সদিচ্ছা রয়েছে। আন্তরিকতাও বোঝা যাচ্ছে। ফলে ইচ্ছা থাকলে উপায় কিছু না কিছু বের হয়ে আসবেই'।

কিন্তু প্রশ্ন, রিপাবলিকান দলকে ছাপিয়ে নিজের যে বিপুল সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করতে পেরেছেন ট্রাম্প; তাদের মধ্যে বড় একটি অংশের যে উগ্রতা দেখছে দেশ; তাতে ঐক্যের সম্ভাবনা কতটা?

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, 'সংশয় রয়েছে। তবে স্বপ্ন দেখতে এখন বাধা নেই। মনে হচ্ছে বুকের মধ্য থেকে জগদ্দল পাথরটা সরে গেল। এরপরও আমি বলব, ট্রাম্প যদি মাঠ ছেড়ে না যায়, অস্বস্তি থেকেই যাবে'।

তবে গত মঙ্গলবার সিনেটে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টিরই অন্যতম শীর্ষ নেতা মিচ ম্যাককনেল ক্যাপিটল হিলে হামলার জন্যে সরাসরি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ আনেন। এ কারণেই হাউজ বা প্রতিনিধি পরিষদে ইম্পিচমেন্ট বা অভিশংসনের শিকার হওয়ার পর এখন সিনেটে তার অভিযুক্ত হওয়ার রাস্তাও তৈরি হয়ে গেছে বলে মনে করেন  অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান। তিনি বলেন, 'এটা করা গেলে ভবিষ্যত রাজনীতি অর্থাৎ আবারো প্রার্থী হওয়া থেকে ট্রাম্পকে চিরস্থায়ী বিদায় দেওয়া সম্ভব হবে'।

গত বেশ কিছুদিন ধরে মানুষের মধ্যে ভয় ছিল, উদ্বেগ ছিল, ছিল নানান উৎকণ্ঠা। তার চেয়েও বেশি ছিল ট্রাম্পকে ঘিরে কৌতূহল। ট্রাম্প আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন জো বাইডেনের অভিষেকে যাবেন না। তাই প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেনের শপথের আগেই হোয়াইট হাউজ ছাড়েন তিনি। মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস এন্ড্রু সামরিক ঘাঁটিতে অনেকটা নিঃসঙ্গ বিদায় পর্ব সারেন। এমনকি তার ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স যোগ দেননি সেখানে। বিদায় পর্ব শেষে ট্রাম্প চলে যান ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে তার নিজস্ব রিসোর্ট মার এ লাগোতে। শেষবারের মতো এদিন তিনি ব্যবহার করেন প্রেসিডেন্টের জন্যে ব্যবহৃত এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানটি। শেষবেলায় আরো একটি ইতিহাস গড়লেন, প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জনসনের পর, তিনিই কোনো প্রেসিডেন্ট যিনি উত্তরসূরির শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন না। ১৫২ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে এমন ঘটনা ঘটল। এমনকি মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজ থেকে নিজের দেওয়া শেষ ভাষণে নতুন প্রশাসনের জন্যে শুভকামনা জানালেও, বাইডেনকে অভিনন্দন জানাননি ট্রাম্প। এমনকি তার নামটি পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি।

অনেক অঘটন থাকলেও দেশটির গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও বিজয় দেখছেন ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন ইন হোয়াইটওয়াটারের সহযোগী অধ্যাপক ড. রিমি যাকারিয়া। তিনি বলেন, 'কোনো কিছুতেই গণতন্ত্র কিন্তু হারেনি। এদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তাদের কাজ ঠিকমতো করে গেছে'। তিনি উল্লেখ করেন, 'অনেক ভালো কিছুও ঘটেছে এই সময়ে। দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট শপথ নিলেন। একই সঙ্গে তিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে এমন পদে গেলেন। এটাওতো বড় একটি বিষয়'।

করোনায় মারা যাওয়া ৪ লাখ মানুষের স্মরণে ২ লাখ পতাকা ও অসংখ্য আলোকবাতির সাজে সজ্জিত ক্যাপিটল হিলে বুধবার অন্য একটি আবহ ছিল। কংগ্রেস ভবন পেছনে রেখে নির্মিত সুউচ্চ মঞ্চ। সেখানেই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন জো বাইডেন। ৭৮ বছর বয়সি বাইডেনের সামনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ। করোনা মহামারি মোকাবেলা, অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার। তবে সবচেয়ে বড় দুটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, বিভক্ত দেশকে এক করা আর হাজারো প্রত্যাশার চাপ সামলানো। তার সমর্থকরা মনে করেন জো বাইডেন এটা পারবেন।

অন্যদিকে ব্যবসায় থেকে রাজনীতিতে সরাসরি এসে প্রেসিডেন্ট হয়ে যাওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত বিদায় নিলেন, একজন 'বহিরাগতে'র তকমা নিয়েই। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তার গতিবিধির ওপরই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। তবে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টি থেকে তিনি যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, সেই সঙ্গে ক্ষমতায় না থাকার পরও এই বিপুলসংখ্যক সমর্থক কি তার সঙ্গে লেগেই থাকবে? এমন প্রশ্নের উত্তর দেবে সময়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা