kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭। ২ মার্চ ২০২১। ১৭ রজব ১৪৪২

শেষ বেলায়ও বিশ্বে ঝাঁকুনি

উইঘুরে চীনের কর্মকাণ্ডকে ‘জেনোসাইড’ আখ্যা

মেহেদী হাসান   

২১ জানুয়ারি, ২০২১ ০২:৫৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শেষ বেলায়ও বিশ্বে ঝাঁকুনি

১৯ জানুয়ারিই ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ কর্মদিবস। দিনের মাঝামাঝি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর অধীন পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিজ্ঞপ্তিতে উইঘুরদের প্রতি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আচরণকে ‘জেনোসাইড’ বলে অভিহিত করেছে। এর প্রভাব ব্যাপক হতে পারে বলে কূটনীতিকরা ধারণা করছেন। কারণ জেনোসাইডবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী, কোনো স্থানে ‘জেনোসাইড’ হলে তা ঠেকানো ও অপরাধ সংঘটনকারীকে বিচারের আওতায় আনার দায়িত্ব ওই সনদে সই করা দেশগুলোর। উইঘুরদের ক্ষেত্রে চীনের ক্ষমতাসীন সরকারের ভূমিকাকে ‘জেনোসাইড’ আখ্যায়িত করে ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থা নেওয়াকে অপরিহার্য করে তুলেছে। আর এটি এখন করতে হবে ক্ষমতায় আসা বাইডেন প্রশাসনকে।

অতীতে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ কার্যত ‘জেনোসাইড’ শব্দটি ব্যবহার করা এড়িয়ে গেছে। দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ফাঁস হওয়া নথি থেকেও ইঙ্গিত মিলেছিল, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়নকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে অভিযুক্ত করার জোরালো প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন তা করেনি। এর নেপথ্যের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল চীনের সঙ্গে সংঘাত এড়ানো।

ট্রাম্প প্রশাসন তার মেয়াদের শেষ দিনে এসে চীনের বিরুদ্ধে জেনোসাইডের অভিযোগ এনে কার্যত দুই দেশের সম্পর্কে এরই মধ্যে সৃষ্ট গভীর ক্ষত ও বিরোধ আরো বাড়িয়ে তুলেছে। নিঃসন্দেহে এটি চীনকে আরো ক্ষুব্ধ করেছে। তবে চীনের জোরালো বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে এটি বিশ্বে তেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি।

ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বব্যবস্থাকে তছনছ করা শুরু করেছিল চার বছর আগে দায়িত্ব নেওয়ার দিন থেকেই। বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে ‘যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম’, ‘যুক্তরাষ্ট্রই সেরা’ বুলি আউড়ে ট্রাম্প ও তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈশ্বিক দায়িত্ব পালন থেকে নিজেদের কার্যত গুটিয়ে নিয়েছিলেন। প্যারিস জলবায়ুচুক্তি, ইরানের সঙ্গে পরমাণুচুক্তি, জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ থেকে একতরফাভাবে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। শেষ কয়েক দিনে মাইক পম্পেওর পররাষ্ট্র দপ্তর গুরুত্বপূর্ণ এমন অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বাইডেন প্রশাসনকে আগামী দিনগুলোতে ভোগাতে পারে বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিগুলো ঘেঁটে দেখা যায়, গত দুই সপ্তাহে প্রায় প্রতি কর্মদিবসেই পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিভিন্ন ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় মদদদাতা হিসেবে কিউবাকে আবারও তালিকাভুক্তকরণ, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে ঘোষণা করা, যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও তাঁদের সমকক্ষ তাইওয়ানিজ কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগে পুরনো বিধি-নিষেধ তুলে নেওয়া, পশ্চিম সাহারা অঞ্চলে মরক্কোর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেওয়া, বিতর্কিত অস্ত্র বিক্রি ও ইরানের ওপর নতুন করে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা। এগুলো বাইডেন ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ফক্স নিউজের ন্যাশনাল করেসপন্ডেন্ট জ্যাকলিন হেনরিক এক টুইট বার্তায় জানিয়েছেন, পররাষ্ট্র দপ্তর ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ দিনগুলোতে কিউবাকে স্টেট সন্ত্রাসের রাষ্ট্রীয় মদদদাতা হিসেবে ঘোষণার পর বাইডেন ট্রানজিশনের একজন কর্মকর্তা বলেছেন যে তাঁরা এগুলো পর্যালোচনা করছেন এবং ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে এসব নিয়ে নির্ভার ছিলেন মাইক পম্পেও। নতুন সরকার গঠনের সময়ে বিদায়ি সরকারের মন্ত্রীরা রুটিন কাজ করলেও পম্পেও নিজেকে ট্রাম্পের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা চালিয়েছেন। এমনকি ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্পভক্তদের হামলার পরও তিনি প্রতিনিধি সভার কয়েক সদস্যকে বলেছেন, ‘ইতিহাস আমাদের মনে রাখবে।’

তবে এগুলোর পেছনে পম্পেওর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিও দেখছেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত লরা কেনেডি বলেছেন, পম্পেও ২০২৪ সালের নির্বাচনের জন্য ক্ষেত্র তৈরি করে রেখেছেন। পম্পেও তাঁর ভক্ত-অনুসারীদের বলতে পারবেন, অন্য কেউ তাঁদের আদর্শের পক্ষে না দাঁড়ালেও তিনি দাঁড়িয়েছিলেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকাণ্ড বাইডেন প্রশাসনের বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডে সমস্যা সৃষ্টি করবে কি না, জানতে চাইলে বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, খানিকটা সমস্যা হবেই। ট্রাম্প প্রশাসন ইচ্ছা করেই করেছে। তারা চেয়েছে বাইডেন প্রশাসনের কাজের জায়গাটা সংকুচিত করতে এবং বাইডেন প্রশাসন যাতে লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করতে না পারে।’

তবে চীনের বিরুদ্ধে ‘জেনোসাইডের’ অভিযোগ আনাকে সমর্থন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই। প্রতিনিধি সভার পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিতে রিপাবলিকান নেতা মাইকেল ম্যাককাউল বিবৃতি দিয়ে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। চীন প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, যেসব অভিযোগ তার সব সত্য নয়, আবার সব মিথ্যাও নয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা