kalerkantho

রবিবার । ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৫ রজব ১৪৪২

ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্ব মৈত্রী

শপথ অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অঙ্গীকার

আসাদুর রহমান   

২১ জানুয়ারি, ২০২১ ০২:৪৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্ব মৈত্রী

৩৩ বছরের প্রতীক্ষা শেষে রাজনীতির মঞ্চে স্বপ্নের চরিত্রে আবির্ভূত হলেন জো বাইডেন। নজিরবিহীন নানা নাটকীয়তার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন তিনি। কিন্তু সহজেই নেতৃত্ব দিতে পারবেন—এমন দেশ বাইডেনের জন্য রেখে যাননি পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্প। জাতিগত বিভেদ, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া করোনা পরিস্থিতি, বিপর্যস্ত অর্থনীতি, নজিরবিহীন বেকারত্ব আর বিশ্বরাজনীতি থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এক যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে আগামী চার বছর পথ চলতে হবে বাইডেনকে। তবে অভিষেক ভাষণে বাইডেন বলেছেন, সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে তিনি এসব সংকট উত্তরণের চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত আছেন। সেই সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, তিনি সব আমেরিকানের প্রেসিডেন্ট হতেই হোয়াইট হাউসে বসতে যাচ্ছেন।

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে ১১টায় (স্থানীয় সময় দুপুর পৌনে ১২টা) যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ৭৮ বছর বয়সী বাইডেন। তাঁর সঙ্গে শপথ নেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও।

অভিষেক ভাষণে বাইডেন বলেন, ‘এই দিনটি আমেরিকার, এই দিনটি গণতন্ত্রের, এই দিনটি ইতিহাসের, এই দিনটি আশা-আকাঙ্ক্ষার।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আরেকবার গণতন্ত্রের মূল্য উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র গণতন্ত্র বিরাজমান।’

করোনা মহামারি এবং বিভাজনের রাজনীতি প্রসঙ্গে বাইডেন বলেন, ‘শুধু মুখের কথায় এসব সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এ জন্য গণতন্ত্রে সুপ্ত থাকা সব শক্তি আমাদের জাগিয়ে তুলতে হবে।’ ২১ মিনিটের বত্তৃদ্ধতায় বাইডেন বলেন, ‘আজ আমার হৃদয়জুড়ে শুধু এ কথাই উচ্চারিত হচ্ছে, আমি সব আমেরিকানকে এক সুতায় গাঁথব। এ জন্য সবাইকে আমি বলব, আপনারা আমার পাশে এসে দাঁড়ান। আমরা যেসব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তা থেকে উত্তরণে ঐক্যই সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়।’

পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে বাইডেন বলেন, ‘বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে  আবার নেতৃত্বের জায়গা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। তবে সেই নেতৃত্ব অস্ত্রের জোরে নয়, যুদ্ধের জোরে নয়; আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে নেতৃত্ব দিতে চাই, মিত্রদের পাশে থাকতে চাই।’

করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে এবারের শীতকালকে সবচেয়ে কঠিন সময় হিসেবে অভিহিত করে বাইডেন বলেন, ‘এই অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের একটা জাতি হিসেবে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’

৬ জানুয়ারির প্রসঙ্গ টেনে বাইডেন বলেন, ‘আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেই জায়গাটিতে কয়েক দিন আগেই প্রাণঘাতী সহিংসতা ঘটেছে, যা অতীতে কখনো ঘটেনি। তবে আমি বলছি, এমনটি আর ঘটবে না; সেটা আজও নয়, কালও নয়, কোনো দিনও নয়, কোনো দিনও নয়।’

বাইডেন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে চরমপন্থা, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ ও অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসের উত্থান ঘটেছে। আমরা অবশ্যই এগুলোকে পরাজিত করব।’

ওয়াশিংটনে ক্যাপিটল হিলের পশ্চিম পাশের যে আঙিনায় দাঁড়িয়ে গতকাল বাইডেন শপথবাক্য পাঠ করেন, ঠিক সেই অংশেই গত ৬ জানুয়ারি নজিরবিহীন তাণ্ডব চালায় উগ্র ট্রাম্পপন্থীরা। শপথ অনুষ্ঠানের দিনও যাতে সেই সহিংসতার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য ওয়াশিংটনে মোতায়েন ছিল ন্যাশনাল গার্ডের প্রায় ২৫ হাজার সদস্য। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গতকাল ওয়াশিংটন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কোথাও বিশৃঙ্খলার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

করোনা মহামারির কারণে শপথ অনুষ্ঠানে সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু দর্শকদের আসন যাতে ফাঁকা মনে না হয়, সে জন্য লাগানো ছিল প্রায় দুই লাখ পতাকা।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম কর্মদিবসেই ডজনখানেক নির্বাহী আদেশে সই করার কথা বাইডেনের। এর মধ্যে থাকবে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় যোগ দেওয়ার আদেশও। এ ছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েকটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন। প্রথম কর্মদিবসে তা-ও বাতিল করার কথা বাইডেনের। সুখবর থাকতে পারে অভিবাসীদের জন্যও।

এদিকে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে জনসমক্ষে যাননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেমন কথাবার্তাও বলেননি তিনি। গত মঙ্গলবার এক ভিডিওবার্তার মাধ্যমে সেই নীরবতা ভাঙেন নানাভাবে আলোচনায় থাকা ট্রাম্প। ওই ভিডিওবার্তায় প্রথমবারের মতো নতুন প্রশাসনের সাফল্য কামনা করতে মার্কিনদের আহ্বান জানান তিনি।

বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানে না থাকার ঘোষণা আগেই দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ১৮৬৯ সালের পর এই প্রথম নতুন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট অনুপস্থিত থাকলেন। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে বাইডেনকে অভিনন্দনও জানাননি ট্রাম্প। এমনকি ওভাল অফিসে ট্রাম্পের চা খাওয়ার আমন্ত্রণও পাননি ১৯৮৭ সালে নিজেকে প্রথম প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ঘোষণা করা বাইডেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ বক্তৃতা

স্থানীয় সময় গতকাল সকাল ৭টায় স্ত্রী মেলানিয়াকে নিয়ে হোয়াইট হাউস ছাড়েন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউস থেকে হেলিকপ্টারে করে তিনি যান মেরিল্যান্ড সামরিক ঘাঁটিতে। সেখানে ট্রাম্পের পরিবারের অন্য সদস্যরাও ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন ট্রাম্পের বেশ কিছু সমর্থকও। মেরিল্যান্ডের ওই ঘাঁটিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেওয়া শেষ বক্তৃতায় নিজের দল, পরিবারের সদস্য ও সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান ট্রাম্প। কথা বলেন করোনা মহামারি ও নতুন প্রশাসন নিয়েও। সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা সত্যিই অসাধারণ।’ মার্কিনদের কর কমানোর সিদ্ধান্তকে নিজের সাফল্য উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আশা করছি তারা (নতুন প্রশাসন) এটি আর বাড়াতে পারবে না। আর গত চার বছরে আমাদের যে সাফল্য, তা কোনো মানদণ্ডেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।’ শেষ বক্তৃতায় নতুন প্রশাসনকে শুভকামনা জানান ট্রাম্প। তবে বাইডেন কিংবা কমলা হ্যারিস—কারো নামই উচ্চারণ করেননি তিনি। বক্তৃতার শেষে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘খুব শিগগিরই আমরা আবারও ফিরে আসব। হয়তো অন্য কোনো মাধ্যমে আমাদের মধ্যে দেখা হবে।’ বক্তৃতা শেষ করে ফ্লোরিডায় নিজের রিসোর্টের উদ্দেশে রওনা হন ট্রাম্প, যেখানে আগেই তাঁর আসবাব পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সূত্র : এএফপি, বিবিসি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা