kalerkantho

রবিবার । ১০ মাঘ ১৪২৭। ২৪ জানুয়ারি ২০২১। ১০ জমাদিউস সানি ১৪৪২

যৌন হেনস্তার দায়ে পদ খোয়ালেন লর্ড নাজির আহমেদ?

অনলাইন ডেস্ক   

২ ডিসেম্বর, ২০২০ ১৬:১৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



যৌন হেনস্তার দায়ে পদ খোয়ালেন লর্ড নাজির আহমেদ?

ভারতের কট্টর সমালোচক লর্ড নাজির আহমেদ খোয়ালেন ব্রিটেনের হাউস অব লর্ডসের সদস্য পদ। কাশ্মীরি নারীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে লর্ডসের সম্মান তাঁকে খোয়াতে হয়। ভারতের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নাজির ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়। কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক দুনিয়াকে বিভ্রান্ত করাই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। অথচ দুর্বল কাশ্মীরি নারীরই ইজ্জত লুণ্ঠন করেন তিনি। যৌন নির্যাতনের আরো একাধিক অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। বহু নারীই আজ তাঁর বিরুদ্ধে সরব। ফলে হাউস অব লর্ডস থেকে বিতাড়িত হতে হয় তাঁকে। এখন নিজের সম্মান বাঁচাতে অবসরের নাটক করছেন জন্মসূত্রে এই পাকিস্তানি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে এমনটিই জানা গেছে।

কাশ্মীরি নারী তাহিরা জামান প্রথম মুখ খোলেন লর্ড নাজির আহমেদের বিরুদ্ধে। তাঁর অভিযোগ, নাজির আহমেদ যৌন নির্যাতন করেছেন। দুই সন্তানের মা তাহিরা লন্ডনের কমিশনার অব স্ট্যান্ডার্টস অব কমিশনারের কাছে নিজের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করেন। বিতর্কিত নাজিরের বিরুদ্ধে বিবিসি একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। সেখানে যৌন শোষণের অভিযোগ করেন অনেকেই। বিবিসির তথ্যচিত্রে উঠে আসে নাজির আহমেদের আসল চরিত্র। ধরা পড়ে যান তিনি। 

নাজিরের উত্থান বেশ চমকপ্রদ। ১৯৯৮ সালে তাঁর হাউস অব লর্ডসে প্রবেশ। তিনিই প্রথম কাশ্মীরি মুসলিম হিসেবে লর্ডসে প্রবেশের সুযোগ পান। এর আগে তিনি ছিলেন রথেরহ্যামের কাউন্সিলর। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক সর্বজনবিদিত। কিন্তু ইরাক যুদ্ধের সময় থেকে সেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে।  

তাহিরা ফাঁস করে দিয়েছেন নাজিরের কীর্তিকলাপ। তাঁর অভিযোগ, অন্তত জনা পাঁচেক নারী নাজির আহমেদের কড়া শাস্তি চাইছে। তাঁরা সবাই যৌন শোষণের শিকার। কিন্তু পরিবার ও সামাজিক সম্মানের কথা ভেবে কেউই মুখ খুলতে চাইছেন না। তিনি জানান, লন্ডনে নাজিরের বাড়িতে বিভিন্ন অছিলায় ডেকে নিয়ে গিয়ে তাঁকে যৌন হেনস্তা করা হয়। বারবার তাঁকে শিকার হতে হয়েছে হাউস অব লর্ডসের এই লম্পট সদস্যের যৌন কামনার। শুধু তিনি একা নন, অন্য নারীরাও তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা ফাঁস করতে শুরু করেছেন। যৌন লালসার শিকার আরেক নারী জানিয়েছেন, তাঁর স্বামীর ব্যবসায়িক শ্রীবৃদ্ধিতে সহায়তার কথা বলে তাঁকেও বিছানায় রাত কাটানোর কুপ্রস্তাব দিয়েছিলেন নাজির। 

অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয় নাজিরের কীর্তিকলাপ। হাউস অব লর্ডস খতিয়ে দেখেছে সব অভিযোগ। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটিও। সেই কমিটির সুপারিশেই নাজিরকে বের করে দেওয়া হয় ব্রিটিশ ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান থেকে। হাউস অব লর্ডস থেকে বিতাড়িত হয়ে অবশ্য নাজির এখন উল্টো সুর তুলেছেন। তাঁর সাফাই গেয়ে পাকিস্তানি টিভি চ্যানেল প্রচার করছে, নাজির নাকি নিজেই অবসর নিয়েছেন। কিন্তু নাজিরকে বহিষ্কার করেছে হাউস অব লর্ডস।

জন্মসূত্রে পাকিস্তানি নাজিরকে গত আগস্ট মাসে যৌন লাঞ্ছনার দায়ে অভিযুক্তও করা হয়। এবার প্রমাণ হাতে পেয়ে নাজিরকে একেবারে বের করে দেওয়া হয়। আর লর্ডস থেকে ঘাড় ধাক্কা খেয়ে নাজির এখন অবসরের গল্প ফাঁদছেন। 

হাউস অব লর্ডসের কমিটি অবশ্য সাফ জানিয়ে দিয়েছে, হাউসের সম্মানের বিষয়টি মাথায় রেখেই নাজিরের সদস্যপদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘সসংদীয় পরিচয় ব্যবহার করে নাজির আহমেদ তাহিরা জামানের দুর্বলতার সুযোগ নেন। তাঁর আচরণে হাউসের এবং হাউসের সব সদস্যের মর্যাদাহানি হয়েছে। হোঁচট খেয়েছে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস।’ 

আচরণ কমিটির এই প্রতিবেদনে পশ্চিমা দুনিয়ার কাছে ভারতের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের মূল কাণ্ডারির গ্রহণযোগ্যতা হোঁচট খেয়েছে অনেকটাই। নাজির আহমেদের আগে মাত্র দুজনকে হাউস ছাড়তে হয়েছিল যৌন হেনস্তার অভিযোগে। তাঁরা হলেন মার্কস অ্যান্ড স্পেনসারের প্রধান লর্ড অ্যান্ড্রু স্টোন এবং অ্যান্টনি লেস্টার। কমিশনার অব স্ট্যান্ডার্সের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি বলেছে, ‘লর্ড নাজির আহমেদ হাউস অব লর্ডসের আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। 

কমিশনার তাঁর রিপোর্টে বলেছেন, ২০১৭ সালের ২ মার্চ তাহিরা জামানকে যৌন লাঞ্ছনার পর তাঁর সম্মান নিয়েও ছিনিমিনি খেলেছেন লর্ড নাজির আহমেদ। তাহিরার ব্যক্তিগত সম্মানকেও ধূলিসাৎ করা হয়েছে। ক্ষুণ্ন হয়েছে তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতাও।’ একই সঙ্গে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘তদন্তে উঠে এসেছে- লর্ড নাজির আহমেদের উদ্দেশ্যই ছিল অসৎ। তিনি সততা বা আস্থার প্রতি মর্যাদা না দিয়ে পুরোপুরি ছলনার আশ্রয় নিয়েছিলেন তাহিরার সঙ্গে। তাঁর ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয়টিতেও খেয়াল রাখার কথা ভাবা হয়নি।’

ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডসের তদন্ত রিপোর্টে আরো বলা হয়, ‘তাহিরা জামান হতাশায় ভুগছিলেন। তাঁর জন্য মনোবিদের তত্ত্বাবধানে চলছিল চিকিৎসাও। কিন্তু এ সব কিছুর তোয়াক্কা না করে লর্ড নাজির তাহিরার আবেগের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। যৌন লাঞ্ছনারও শিকার হয়েছেন তাহিরা।’ তাই আচরণবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে লর্ড নাজির আহমেদকে বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়। 

এখানেই শেষ নয়, লর্ড আহমেদ যে তদন্তকারীদের সহযোগিতা করেনি সে কথাও উল্লেখ করা হয়েছে কমিশনারের রিপোর্টে। বলা হয়েছে, ‘কমিটির সামনে লর্ড আহমেদ কখনোই সঠিক তথ্য দেননি। বরং বারবার চেষ্টা করেছেন তদন্তকে ভুল পথে পরিচালিত করতে। তদন্তকারীদের বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করেননি তিনি। বারবার বিভ্রান্ত করার চেষ্টা তিনি চালিয়ে গিয়েছেন। নিজের পদের মর্যাদাটুকু রাখার বিষয়েও যত্নশীল ছিলেন না তিনি। তাঁর অসদাচরণ ও হাউসের মর্যাদা রক্ষার প্রতি আস্থাশীল মানসিকতার অভাব ধরা পড়েছে। তাহিরা জামানের পাশাপাশি হাউসের সম্মানও নষ্ট করেছেন লর্ড নাজির আহমেদ।’

ধরা পড়ে যাওয়ার পর লর্ড নাজির চেষ্টা করেছিলেন বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ তুলে পার পেয়ে যাওয়ার। নিজের ভারতবিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে সব অভিযোগকে চক্রান্ত বলে চালানোর চেষ্টায়ও ত্রুটি রাখেননি। কিন্তু কমিটি সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। বিবিসি, সানডে টাইমস, দি এশিয়ান লাইটের মতো পশ্চিমা মিডিয়ার খ্যাতিমান সাংবাদিকরাও হাউস কমিটির সামনে নিজেদের স্বাধীন মতামত তুলে ধরেন লর্ডসের বিরুদ্ধে। পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যায় নাজিরের কীর্তি। তাই ব্রিটিশরা তাঁকে ক্ষমা করেনি। কেড়ে নিয়েছে তাঁর হাউসের সদস্যপদ। পদ খুইয়ে তাই নিজের কীর্তি ঢাকতে ভারতবিরোধী অপপ্রচার ফের শুরু করেছেন আরো বেশি করে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে।

তবে স্ট্যান্ডার্স কমিশনারের সুপারিশ কার্যকর করতে বিন্দুমাত্র দেরি করেনি হাউসের আচরণ বিষয়ক কমিটি। বরং দ্রুততার সঙ্গে নাজিরের সব বক্তব্য খারিজ করে তাঁর সদস্যপদ কেড়ে নেওয়া হয়। সংসদীয় সব কাজকর্ম থেকে বাদ দেওয়া হয় তাঁকে। আচরণ কমিটির সাফ কথা, লর্ড নাজির আহমেদ নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে হাউসের মর্যাদাকেও কালিমালিপ্ত করেছেন। সেই সঙ্গে তদন্তকারীদের সঙ্গেও বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করার সৌজন্য দেখাননি। তা ছাড়া তাহিরা দুর্বল জেনেও তাঁকে যৌন শোষণের শিকার করা হয়েছে। বিন্দুমাত্র তাঁর সম্মানের কথাটিও চিন্তা করা হয়নি। লর্ড নাজির তাঁর সংসদীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে দুর্বল নারীর ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন। এটা মানুষের অস্থার পরিপন্থী। তাই তাঁকে বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছিল। হাউস কমিটিও তাই সেই সিদ্ধান্তকে মান্যতা দেওয়ার বিষয়ে দৃঢ় ছিল। 
লর্ড নাজির বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন। তাই স্পিকার তাঁকে বহিষ্কারের আগেই ইস্তফার গল্প বাজারে চাউর করে দেন। পাকিস্তানি জিও টিভি সেটি ফলাও করে সম্প্রচার করে। কোনো কারণ না দেখেই তাঁরা প্রচার করতে থাকে, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত লর্ড নাজির আহমেদ ২৩ বছরের সংসদীয় কাজকর্মে ইতি টানছেন। তিনি নাকি স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিচ্ছেন হাউস অব লর্ডস থেকে। ১৬ নভেম্বর থেকে হাউস অব লর্ডসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ইতি পড়ে। সমস্ত দোষ ঢাকতে এখন ব্যস্ত পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এই ব্রিটিশ লর্ড।

তবে নাজির আহমেদের জীবনে এটাই প্রথম বিতর্ক নয়। বরং বলা যায়, চিরকালই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। শাস্তিও ভোগ করতে হয়েছে বহুবার। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে ২০০৯ সালে তাঁকে জেলেও যেতে হয়েছিল। কারণ, এমওয়ান হাইওয়েতে তিনি মোবাইলে মেসেজ করতে করতেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তাঁর গাড়ি ধাক্কা দেয় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়িকে। আহত হন গাড়ির চালক। ২০১৩ সালে তাঁর জেলযাত্রার কারণ হিসেবে ‘ইহুদিদের ষড়যন্ত্র’ বলে বর্ণনা করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেন। এ জন্য তাঁকে লেবার পার্টি থেকে বরখাস্তও করা হয়। পরে অবশ্য তিনি ছেড়ে দেন লেবার পার্টিটাকেই। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলেই তাঁকে সাম্প্রদায়িক রং দিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতেন নাজির। এবারও করেছিলেন। কিন্তু তাহিরা জামান তাঁকে এবার লর্ডস ছাড়তে বাধ্য করলেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা