kalerkantho

শনিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৮ নভেম্বর ২০২০। ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

বন্দি 'হত্যা'র ভিডিও প্রকাশ, যুদ্ধাপরাধের তদন্ত দাবি আর্মেনিয়ার

অনলাইন ডেস্ক   

২৪ অক্টোবর, ২০২০ ১৭:০৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বন্দি 'হত্যা'র ভিডিও প্রকাশ, যুদ্ধাপরাধের তদন্ত দাবি আর্মেনিয়ার

বিতর্কিত নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চলে আজারবাইজানের সেনাবাহিনী ও জাতিগত আর্মেনিয়ানদের মধ্যে চলতে থাকা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ সংঘটন হওয়ার কিছু ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। একটি মেসেজিং অ্যাপে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দেখা যায় যে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা দুই আর্মেনিয়ান আজারবাইজানের সেনাবাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন।

আরেকটি ভিডিওতে ওই দুই আর্মেনিয়ান নাগরিককে হাত বাঁধা অবস্থায় গুলি করতে দেখা যায় আজারবাইজানের সেনাবাহিনীকে। নিহত হওয়া দুই ব্যক্তিকে শনাক্ত করার পাশাপাশি তাদের পরিচয়ও প্রকাশ করেছে আর্মেনিয়ার কর্তৃপক্ষ।

ইউরোপের মানবাধিকার পরিস্থিতি নজরদারির কাজে নিয়োজিত শীর্ষ সংস্থা কাউন্সিল অব ইউরোপ নিশ্চিত করেছে যে তারা ভিডিওটি হাতে পেয়েছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করবে। 

ককেশাস পর্বতমালার অঞ্চলটিতে ২৭ সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তারপর থেকে দুই পক্ষের যুদ্ধে বেসামরিক নাগরিক সহ কয়েক হাজার মানুষ মারা গেছে। ওই অঞ্চলটি আন্তর্জাতিকভাবে আজারবাইজানের অংশ হিসেবে স্বীকৃত হলেও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ করে জাতিগত আর্মেনিয়ানরা।

১০ অক্টোবর প্রথম দফায় এবং ১৮ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হলেও সংঘাত অব্যাহত থাকে। এরই মধ্যে ওই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষকে ঘরছাড়া হতে হয়েছে।

ছড়িয়ে পড়ছে ভুয়া ভিডিও 

দুই পক্ষের সেনাবাহিনীই যুদ্ধবন্দি এবং প্রতিপক্ষের সৈন্যদের মরদেহের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছে বলে দেখা গেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় যুদ্ধবন্দিদের আঘাত করার বা হত্যা করার যেই ভিডিওগুলো প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো থেকে মাত্র দুটি ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে পেরেছে বিবিসি।

টেলেগ্রাম চ্যানেলগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে আজারবাইজানের একজন যুদ্ধবন্দিকে এক আর্মেনিয়ান সেনার দ্বারা গুলিবিদ্ধ হতে দেখা যায়। কিন্তু ওই ভিডিওটি আসলে রাশিয়ার একটি ভিডিও, যেটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ২০১৩ সালে প্রথমবার শেয়ার করা হয়েছিল। বিবিসি যে ভিডিও দু'টো যাচাই করতে পেরেছে, সেগুলো টেলিগ্রামে আজারবাইজানের সমর্থক একটি নামহীন রুশ চ্যানেলে গত সপ্তাহে প্রকাশ করা হয়েছিল।

ভিডিওতে কী রয়েছে?

প্রথম ভিডিওতে দুইজন আর্মেনিয়ান নাগরিককে বন্দি করার চিত্র দেখা যায়। ওই ভিডিওতে আজারবাইজানের বাচনভঙ্গিতে রুশ ভাষায় আদেশ দিতে শোনা যায় এক ব্যক্তিকে। তিনি বন্দিদের অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দিচ্ছিলেন।

প্রথম ভিডিওর পরপরই দ্বিতীয় ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়, যেখানে ওই দুই বন্দিকে হত্যার দৃশ্য দেখা যায়। দুইজন বন্দির হাত পিছমোড়া করে বাঁধা ছিল এবং তাদের শরীর আর্মেনিয়া ও অস্বীকৃত অঞ্চল নাগোর্নো-কারাবাখের পতাকায় আবৃত ছিল।

তারা ছোট একটি দেয়ালের ওপর বসে ছিল। ওই পর্যায়ে আজারবাইজানি ভাষায় কেউ একজন নির্দেশ দেয়: "তাদের মাথায় তাক করো।" এরপর একাধিক গুলির শব্দ শোনা যায় এবং দুই বন্দিকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখা যায়।

ভিডিওকে 'ভুয়া' দাবি আজারবাইজানের

বিবিসি নিশ্চিত করেছে যে দুই ভিডিওতেই নির্দেশ প্রদানকারী ব্যক্তি আঞ্চলিক বাচনভঙ্গিতে কথা বলা আজারবাইজানি নাগরিক। আর প্রথম ভিডিওতে দেখতে পাওয়া বন্দিদেরই দ্বিতীয় ভিডিওতে হত্যা করা হয়। আজারবাইজানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভিডিওগুলোকে ভুয়া হিসেবে দাবি করেছে এবং এই ধরনের ভিডিও প্রকাশ করে উসকানি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে।

ভিডিও ক্লিপগুলো অবশ্য প্রকাশিত হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সরিয়ে নেওয়া হয়। তর পরদিনই আজারবাইজানের প্রসিকিউটর জেনারেল ঘোষণা দেন যে ওই ভিডিওগুলো যে ভুয়া, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন তারা।

ভিডিওগুলো কী আসলেই ভুয়া? 

প্রকাশিত হওয়া দু'টি ভিডিও যাচাই করে বিবিসি নিশ্চিত হতে পেরেছে যে সেগুলো হাদরুত অঞ্চলে নেয়া হয়েছে, দক্ষিণ নাগোর্নো-কারাবাখের ফুজুলি অঞ্চলের কাছের যেই শহরে তুমুল যুদ্ধ হয়েছে। ৯ থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে কোনো সময় ভিডিওগুলো রেকর্ড করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আজারবাইজান ৯ অক্টোবর হাদরুত শহরের দখল নেওয়ার দাবি করলেও তার তিনদিন পরও শহরটির দখলকে কেন্দ্র করে তীব্র যুদ্ধ হয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে।

বেলিংকাট ওপেন সোর্স তদন্তকারীরা প্রথমবার ওই ভিডিওগুলোর সত্যতা নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশ করে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী: "ভিডিওতে আটক হওয়া দুই ব্যক্তি আর্মেনিয়ান যোদ্ধা যারা ৯ থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে আজারবাইজানের সেনাদের, সম্ভবত স্পেশাল ফোর্স, হাতে আটক হওয়ার অল্প সময় পর মারা গেছে।"

আজারবাইজানের অনলাইন কমেন্টেটররা ওই ভিডিও ক্লিপের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করলেও বিবিসি যেসব সেনা বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারা মনে করেন যে ভিডিওটি আসল। সাবেক ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বিবিসিকে নিশ্চিত করেন যে: "এগুলো আসল বুলেট এবং এটি আসল হত্যাকাণ্ড। এটিকে সাজানো মনে করার কোনো কারণ আমি দেখি না।" তিনি বলেন যে একটি গুলির ক্ষত থেকে মাথার মগজ সদৃশ বস্তু বের হয়ে আসতেও দেখা গেছে।

আর্মেনিয়ার বক্তব্য কী? 

আর্মেনিয়ার মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা আরমান তাতোইয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্দিদের হত্যা করার ঘটনাকে 'অনস্বীকার্য যুদ্ধাপরাধ' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, "এই ভিডিওগুলোতে দেখা যায় যে আজারবাইজানের সেনাবাহিনীর সদস্যরা বন্দিদের অপমান করে এবং চূড়ান্ত অপমানের মধ্য দিয়ে তাদের হত্যা করে।"

তিনি জানান, ইউরোপিয়ান আদালতে আর্মেনিয়ার প্রতিনিধি এরই মধ্যে ওই ভিডিওগুলোর কপি চেয়েছেন। তাতোইয়ান জানিয়েছেন যে তিনি ওই ভিডিওগুলোর কপি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার, ইউরোপিয়ান কাউন্সিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পক্ষকে পাঠাবেন।

হাদরুত অঞ্চলের ওই ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়ার পর যুদ্ধরত দুই পক্ষই বিবৃতি দিয়ে অনেক যুদ্ধবন্দির নাম প্রকাশ করেছে। আজারবাইজান দুইজন বন্দির চিকিৎসা সেবা পাওয়ার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে আর্মেনিয়ানরা কারাবাখের একটি হাসপাতালে এক আজারবাইজানি বন্দির চিকিৎসা পাওয়ার ছবি প্রকাশ করেছে। 

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা