kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

সুদানের ‘ইসলামিক স্কুল’গুলোতে চলা ভয়ানক নির্যাতনের চিত্র

অনলাইন ডেস্ক   

২০ অক্টোবর, ২০২০ ১৯:০৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সুদানের ‘ইসলামিক স্কুল’গুলোতে চলা ভয়ানক নির্যাতনের চিত্র

সুদানের ইসলামিক স্কুলগুলোতে শিশুদের পায়ে শিকল বেঁধে নিয়মিত নির্যাতন-নিপীড়ন করা হয়। এমনকি পাঁচ বছর বয়সী শিশুদেরও নিয়মিত পায়ে চেন বেঁধে রাখা হয়, শিকল পরিয়ে তাদের মারধর করেন ‘খালওয়া’ নামের এই ইসলামিক স্কুলের শিক্ষকরা, যাঁরা পরিচিত ‘শেখ’ নামে। তাঁরাই এই স্কুলগুলো পরিচালনা করেন।

বিবিসি গোপন ক্যামেরা বসিয়ে এ ধরনের ২৩টি স্কুলে শিশুদের মারধর ও নির্যাতনের ছবি তুলেছে। সুদানে এ রকম স্কুল রয়েছে ৩০ হাজার। নাদের নামের আত্যাচারের শিকার এক কিশোরের বাবা বলেন, আমার ছেলের ওপর যা হয়েছে তা আমি ক্ষমা করতে পারব না। আমি চাই গোটা বিশ্ব জানুক। আমি চাই না এটা চাপা থাকুক।

নাদেরকে এত প্রচণ্ড মারা হয়েছিল যে সে প্রায় মারাই যাচ্ছিল। তাকে ও তার বন্ধুকে শিক্ষকরা বেত মারেন। বিবিসি জানিয়েছে, তারা খালওয়া নামের পরিচিত ইসলামিক স্কুলে পড়াশোনা করত। সুদানে ৩০ হাজার খালওয়া আছে। এই স্কুলের মতো সব স্কুলেই বিনা খরচে পড়াশোনা করানো হয়। কিন্তু সেখানে শিশুদের ওপর ভয়ানক অত্যাচারের খবর প্রায়ই শোনা যায়। বিবিসি গোপন ক্যামেরা বসিয়ে এ ধরনের ২৩টি স্কুলে শিশুদের মারধর ও নির্যাতনের ছবি তুলেছে।

বিবিসি বলেছে, তারা অসংখ্য শিশুকে শিকল পরানো প্রত্যক্ষ করেছে। এক কিশোর জানায়, মাঝেমধ্যে আমাদের ছয়-সাতজনকে এক করে শিকল পরিয়ে দৌড়াতে বলা হতো। আমরা পড়ে যেতাম, তারা বেত মারত। আমরা আবারও উঠে দাঁড়াতাম।

বিবিসি জানায়, খারাপ ব্যবহারের জন্য অনেককেই মারধর করা হতো। কোরআন পাঠের সময় ভুল করলে অন্যদের ওপর ওরা চড়াও হতো। বিবিসিকে এক শিক্ষক বলেন, ওদের না মারলে ওরা মুখস্থ করে না।

যে খালওয়াতে নাদের পড়ত, সেটা বিবিসির দেখা সবচেয়ে খারাপ খালওয়াগুলোর একটি। অন্যগুলোর তুলনায় সেখানে সবচেয়ে বেশি শিশুকে শিকলে বেঁধে রাখা হতো। সেখানে এমনকি একটি কারাগারও ছিল। নাদের জানিয়েছে, সেখানে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে পাঁচ দিন কোনো খাবার বা পানি না দিয়ে।

খালওয়াগুলো পরিচালনা করেন দেশটির ধর্মীয় নেতারা। তাঁদের বলা হয় শেখ। সম্প্রদায়ের মধ্যে এই শেখদের প্রচুর ক্ষমতা রয়েছে। তাঁদের প্রভাবও রয়েছে। পরিবারগুলো তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে এমন ঘটনা বিরল। কিন্তু নাদেরের পরিবার ন্যায়বিচার পেতে বদ্ধপরিকর। 

নাদেরের মা বলেন, সত্যের জন্য যেকোনো মূল্য দিতে রাজি আমি। আমি বলব, আমি ভীত নই। অতীতে আমাদের কোনো অধিকার ছিল না। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। এখন নতুন সরকার আসার পর আমাদের অধিকার আমার পাচ্ছি।

নাদেরকে নির্যাতন করার জন্য দুজন শিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারা এখনো কোনো অবেদন করেননি। পাঁচবার শুনানি স্থগিত হয়েছে। 

শুধু নাদের নয়, আরো অনেক শিশুই মারধরের শিকার হয়েছে। এক কিশোর বলেছে, ‘ওরা আমাকে বেঁধে, মাটিতে শুইয়ে বেত দিয়ে মারত।’ তুমি তাদের কিছু বলার চেষ্টা করোনি- এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই কিশোর বলে, আমি বলতে পারতাম না কোনো কিছু। কারণ ওরা আমার মুখ বেঁধে রাখত। আমার মুখের ভেতর কাপড়ের টুকরো ভরে দিত।

খালওয়াত আলা খুলফা আল রাশিদীনের পরিচালক শেখ হুসাইন বলেন, প্রচীনকাল থেকে সুদানের শিক্ষার্থীদের শেকলে বাঁধার চল রয়েছে। বেশির ভাগ খালওয়ায় শিকল পরানো হয়, শুধু আমার এখানেই নয়। আমাকেও পরতে হয়েছিল। তিনি বলেন, আমি আমার ছেলেকেও শিকল পরিয়েছি। এমনভাবে শিকল পরানোর সুফল আছে বলে দাবিও করেন তিনি। পড়াশোনা না করার অভিযোগে শিক্ষার্থীদের মারাও হয়েছে বলে দাবি তার।

এদিকে সুদানের নতুন সরকার বলেছে, তারা খালওয়াগুলোর নির্যাতন বন্ধ করতে চায়। দেশটির ধর্মবিষয়ক মন্ত্রীকে সংস্কারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে সেখানে মারধর, নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা কোনোভাবে শিশু অধিকারের লঙ্ঘন না হয়।

সুদানের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী নাসেরেদ্দীন মুফরে বলেছেন, ‘কেউ আইন ভাঙলে তাকে থামানো হবে। তার খালওয়া বন্ধ করে দেওয়া হবে।’ কিন্তু বাস্তবে আসলে এমনটা ঘটছে না। বহু খালওয়া এখনো খোলা রয়েছে। সেখানে নির্যাতন চলছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা