kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ভারতের কভিড 'নাজ' ক্যাম্পেইনের পরিধি প্রকাশিত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১৯:২৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভারতের কভিড 'নাজ' ক্যাম্পেইনের পরিধি প্রকাশিত

প্রতীকী ছবি।

চার্চিল কলেজের গেটস ক্যামব্রিজ স্কলার রমিত দেবনাথ ও সেলভিন কলেজের ফেলো এবং সাস্টেইন্যাবিলিটি ইন দ্য বিল্ট এনভায়রনমেন্ট বিষয়ের প্রভাষক ড. রনিতা বর্ধনের একটি নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, মহামারির প্রথম তিন মাসে ভারত সরকারের 'নাজ' তত্ত্বের প্রয়োগ অনেক জায়গায় ভাইরাস মোকাবেলায় সহায়তা করেছিল।

ভারতে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন কভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং ৮০ হাজারেরও বেশি মৃত্যু হয়েছে (২০২০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত), যা দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে এর চেয়েও বড় ট্রাজেডি হতে পারত যদি ভারত সরকার প্রথম দিকেই  বিশ্বের অন্যতম কঠোর এবং দীর্ঘতম লকডাউন বজায় রাখার জন্য নাজ তত্ত্ব ব্যবহার না করত। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচার বিভাগের বিহেভিয়ার এন্ড বিল্ডিং পারফরম্যান্স গ্রুপ থেকে রমিত দেবনাথ এবং ড. রনিতা বর্ধনের একটি নতুন সমীক্ষায় এমনটি বলা হয়েছে।

মেশিন লার্নিং এবং এআই-ভিত্তিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে প্রায় ৪০০টি সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করে তারা দেখায় যে, কভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করার জন্য ভারত কীভাবে সরকারি কর্মচারী, বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্য সেবাদানকারী, উত্পাদনকারী, খাদ্য সরবরাহকারী এবং শিক্ষার্থী সহ ১.৩ বিলিয়ন মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করতে ১৪ টি মূল নীতিমালা ঘিরে নাজ তত্ত্ব ব্যবহার করেছে।

গবেষকরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছ থেকে প্রাপ্ত উদ্দীপনা সারা দেশ জুড়ে লকডাউন এবং সামাজিক দূরত্বের নিয়মের উপর ব্যাপক প্রভাব তৈরিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

প্লাস ওয়ান-এ প্রকাশিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২০ সালের ১৫ ই জানুয়ারী থেকে ১৪ ই এপ্রিলের মধ্যে বিভিন্ন জরুরি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার নাজ কৌশল ব্যবহার করেছে। নাজিং হল এমন একটি পন্থা যা জনগোষ্ঠীর আচরণ পরিবর্তন করার জন্য ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুই ধরণের প্রভাব ব্যবহার করে।

জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারিতে, চীন থেকে আগত যাত্রীদের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর দিকে নিবদ্ধ ছিল নীতিগত উদ্দীপনাসমূহ। তবে শিগগিরই এটি অন্যান্য উদ্বেগ সমাধান করতে স্থানান্তরিত হয়। মার্চের মধ্যে, ভ্রমণে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করার চেষ্টা, জনাকীর্ণ ও জনসমাগমের জায়গায় যেতে লোকজনকে নিরুৎসাহিত করা, এবং কঠোর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ২৪ শে মার্চ, মোদী জাতিকে বলেছিলেন যে "সংক্রমণের চক্রটি ভেঙে ফেলার জন্য ২১ দিন জরুরি, অন্যথায় দেশ ও আপনার পরিবারকে ২১ বছর পিছিয়ে যেতে হতে পারে"। পরের দিন ভারত লকডাউনের প্রথম ধাপে প্রবেশ করে।

সরকার ভাইরাস সম্পর্কে মিথ্যা খবর মোকাবেলা এবং জনগণকে মাস্ক ব্যবহার এবং ঘন ঘন হাত ধোয়ার নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য বোঝানোর ক্ষেত্রে 'নাজ' ব্যবহার করেছে। একই সাথে, সরকার ড্রোন, স্থানিক বিশ্লেষণ, লো পাওয়ার ব্লুটুথ মোবাইল ফোন অ্যাপ্লিকেশন এবং হিউম্যানয়েড রোবট ইত্যাদি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শহরাঞ্চলে নজরদারি চালিয়েছিল।

রমিত দেবনাথ বলেন, "ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে যেখানে বিস্তীর্ণ জনসংখ্যা এবং ভূ-স্থানিক বিভাজন, নিরক্ষরতার উচ্চ হার এবং একটি অত্যন্ত দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে নাজভিত্তিক নীতি অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"

রনিতা বর্ধন আরো বলেন, “সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে এটা থামানোর দরকার ছিল এবং একটি অভিন্ন লড়াইয়ের জন্য বিশাল জনসংখ্যাকে একত্রিত করতে হয়েছিল - এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমাদের অনুসন্ধানগুলো প্রমাণ করে যে মানুষকে বোঝাতে সরকারের বৈজ্ঞানিক তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি কিছু প্রয়োজন ছিল। তারা দেশপ্রেম, পরিবার, ধর্ম এবং সম্প্রদায় সহ শক্তিশালী মূল্যবোধের প্রতি আবেদন করেছিল।"

গবেষণায় ‘জরুরি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর নাগরিক সহায়তা ও ত্রাণ তহবিল’ (পিএম কেয়ার ফান্ড) এর ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়েছে যা সঙ্কট মোকাবেলায় জনগণকে ক্ষুদ্র অনুদান দেওয়ার জন্য এবং জনগণের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য গঠন করা হয়েছিল। ৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী করোনা মোকাবেলায় অগ্রণীকর্মীদের সাথে সংহতি জানিয়ে দশ মিনিটের জন্য স্বেচ্ছায় লাইট স্যুইচ বন্ধ করার জন্য জনগণকে আহ্বান জানান। এর মধ্যে বেশিরভাগ নাজ সামাজিক মিডিয়া বিজ্ঞাপন, এসএমএস ফরোয়ার্ড এবং সম্প্রচার মাধ্যম দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল।

সমীক্ষায় দেখা গেছে যে সরকারী মন্ত্রণালয়গুলো জাতীয় চাহিদা মেটাতে ভারতের উৎপাদন সংস্থাগুলোকে পিপিই, হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং মাস্ক প্রস্তুত করার জন্য জোর দিয়েছিল এবং এই সংকটকালে দেশের খাদ্য সুরক্ষা এবং সরবরাহ শৃঙ্খল অব্যাহত রাখার  চেষ্টা করেছিল - ভারতের কৃষকরা ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তাদের শীতের ফসল সংগ্রহ করেন। 

এদিকে, সরকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের মাধ্যমে অর্থায়ন করে মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ভারতের বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়কে উৎসাহ দিয়েছিল। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কভিড-১৯ বিষয়ে গবেষণার জন্য সাশ্রয়ী ডায়াগনস্টিকস, ভ্যাকসিন, অ্যান্টিভাইরাস, রোগের মডেল এবং অন্যান্য গবেষণার প্রস্তাব জমা দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছিল।

এই সময়কালে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের মধ্যে রয়েছে পাবলিক স্পেস এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে সামাজিক দূরত্বকে উৎসাহিত করার জন্য রোবট এবং জিপিএস ও ব্লুটুথ ব্যবহার করে কন্টাক্ট ট্রেসিং অ্যাপ (আরোগ্যসেতু)। মানুষকে অ্যাপ্লিকেশনটি ব্যবহার করতে প্রভাবিত করার জন্য বারবার এসএমএস রিমাইন্ডার ব্যবহার করা হত। মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ও ‘ফাইট করোনা আইডিয়াথন’এর মতো কর্মসূচি চালু করে কভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নিতে ভারতের স্টার্ট-আপ এবং উদ্ভাবনী সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

শিক্ষাকে সমর্থন করার জন্য, সরকার ভারতের জাতীয় ডিজিটাল লাইব্রেরির ব্যাপক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে হোম-স্কুলিংকে উৎসাহিত করেছিল। এমনকি সরকার লকডাউনের সময় লোকদের ঘরে রাখতে সহায়তা করার জন্য জাতীয় চ্যানেল দূরদর্শনে  ‘৮০ ও ‘৯০ এর দশকের জনপ্রিয় টিভি শো সম্প্রচার করেছে।

সমীক্ষাটি দেখায় যে, সঙ্কট বৃদ্ধির সাথে সাথে কীভাবে নাজ কৌশলগুলো বিস্তৃত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, জানুয়ারি থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে, সরকারের আয়ূষ মন্ত্রণালয় ব্যাপকভাবে আয়ুর্বেদের ঔষধি চর্চা অনুসরণ করতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য যোগের মাধ্যমে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার দিকে মনোনিবেশ করেছে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেও জোর দিয়েছিল। তবে, মার্চের মাঝামাঝি সময়ে সংক্রমণের হার বাড়ার সাথে সাথে, #YOGAathome এর মতো হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ধীরে ধীরে ঐতিহ্যবাহী চিকিত্সা থেকে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা প্রচারের দিকে সরে এসেছিল।

গবেষকরা টপিক মডেলিং নামে একটি সামাজিক বিজ্ঞান পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, যেটির টেক্সট মাইনিং এবং ভাষা প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে ভিত্তি রয়েছে। এটি এক সেট নথি থেকে ক্লাস্টার শব্দগুলো নির্ধারণ করতে টেক্সট ডেটাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করে।

২০২০ সালের ৭ জুন থেকে সরকার লকডাউন নিষেধাজ্ঞাগুলো অপসারণ শুরু করে এবং এর পর থেকে ভাইরাসের বিস্তার ত্বরান্বিত হয়। তবে সরকারের নাজ প্রচারের যে সুবিধা রয়েছে তা এখনো বোঝা যাচ্ছে বলে গবেষকরা বিশ্বাস করেন। রনিতা বর্ধন বলেছেন: “বছরের প্রথম দিকে মাস্ক পরা এবং সামাজিক দূরত্বসহ নাজ দ্বারা উৎসাহিত আচরণগত পরিবর্তনগুলো এখনো পুরো ভারত জুড়ে মেনে চলা হচ্ছে। এই প্রভাবন এখনো জীবন বাঁচাতে সহায়তা করছে।

এই সমীক্ষায় ভারত সরকারের নীতিগত হস্তক্ষেপগুলির সাফল্য বা ব্যর্থতা মূল্যায়ন করার চেষ্টা করা হয়নি, বরং বোঝার চেষ্টা করা হয়েছিল যে কীভাবে নীতিগত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রচ্ছন্ন নাজ তৈরি করা হয়েছিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা