kalerkantho

শনিবার । ৮ কার্তিক ১৪২৭। ২৪ অক্টোবর ২০২০। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ফিকে হয়ে আসছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বপ্ন

হাসান ইমাম   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৪:১৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ফিকে হয়ে আসছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বপ্ন

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের যে প্রস্তাবের ভিত্তিতে ইসরায়েলের আত্মপ্রকাশ, একই প্রস্তাব অনুসারে স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রেরও প্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা; কিন্তু সাড়ে ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও এর বাস্তবায়ন হয়নি বরং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার স্বপ্ন ক্রমে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পটভূমিতে প্রশ্নটি আরো গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে—তবে কি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা অধরাই থেকে যাবে?

এক দশক আগেও অধিকৃত পশ্চিম তীরের একচিলতে জমিও যদি অধিগ্রহণের ঘোষণা দিত ইসরায়েল, আরববিশ্বের ২২টি দেশই এর প্রতিবাদে গলা চড়াত। অথচ গত জুনে যখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জর্দান উপত্যকার বিশাল একটি অংশকে নিজের দেশের অংশ করে নেওয়ার ঘোষণা দিলেন, আরবদুনিয়ায় তেমন কোনো উচ্চবাচ্য শোনা গেল না।

ইসরায়লের এ সিদ্ধান্তে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরো ক্ষীণ হয়ে পড়বে, ফিলিস্তিনিদের তরফ থেকে বারবার এমন আশঙ্কা জানানো হলেও সৌদি আরবসহ তাদের মিত্ররা মুখ খোলেনি। এর দুই মাস না পেরোতেই দুটি আরবদেশের সঙ্গে ইসরায়েলের স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপিত হলো। গত ১৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে এসংক্রান্ত চুক্তি সইয়ের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, আরো অন্তত পাঁচটি আরবদেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অথচ প্রয়াত সৌদি বাদশাহ আব্দুল্লাহর উদ্যোগে ২০০২ সালে ২২টি আরবদেশ একযোগে ঘোষণা দেয়, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল করা ফিলিস্তিনি জমির দখল ছাড়াসহ পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী মেনে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে না দেওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে আরবদুনিয়ার সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না। সেই ‘আরব ইনিশিয়েটিভ’ এখন আড়ালে পড়ে গেছে। আর হতাশ, ক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনিরা দেখছে, ইসরায়েলি দখলদারি ঘুচিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি আরববিশ্বের যে ঐক্যবদ্ধ সমর্থন, তাতে ফাটল ধরেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে ওয়াকিফহাল গোষ্ঠীরও এ বিষয়ে মতভিন্নতা নেই যে দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের লড়াই-সংগ্রাম-দুর্দশার দিক থেকে আরববিশ্বের অনেক দেশের নজর ক্রমে সরে যাচ্ছে।

তারা বলছে, আরব বসন্তের ধাক্কা, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন ও ইরাকে দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ, ইসলামিক স্টেটের উপস্থিতি-হুমকি, তেলের দামে অধোগতি ইত্যাদি কারণসহ অভ্যন্তরীণ নানা ইস্যুতে অনেক আরবদেশের সরকার এতটাই ব্যতিব্যস্ত যে ফিলিস্তিন ইস্যু তাদের কাছে তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। সেই সঙ্গে শিয়া ইরান নিয়ে এসব সুন্নিপ্রধান দেশের জুজুর ভয় তো রয়েছেই। ইসরায়েলেরও অবস্থান এই ক্ষেত্রে অভিন্ন।

বিবিসির সাংবাদিক মোহাম্মদ এয়াহিয়া মনে করেন, সৌদি আরবসহ আরো কিছু আরবদেশের ইরানভীতি এতটাই প্রবল যে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে তারা রক্ষাকবচ হিসেবে দেখছে। এয়াহিয়ার মতে, সৌদি আরব নিজেই আরব ইনিশিয়েটিভকে দুর্বল করে দিয়েছে। এর প্রথম ইঙ্গিত মেলে ২০১৮ সালে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরে। তিনি তখন মার্কিন-ইহুদি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে খোলাখুলি ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেন, দাবিদাওয়া নিয়ে তাঁদের নমনীয় হতে হবে। বিন সালমান বলেন, ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান সৌদি আরব চায়; কিন্তু ইরানের মোকাবেলা এখন তাঁদের ‘অগ্রাধিকারে’।

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং মুসলিমদুনিয়ার নেতৃত্ব নিয়ে টানাপড়েনকে কেন্দ্র করে আরবদেশগুলো বিভাজিত, যা ইসরায়েলকে তার উদ্দেশ্য হাসিলে অনেক সুবিধা করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহমেদ কুরু বলেন, ‘আরবদেশগুলো কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে রয়েছে আমিরাত, অন্যদিকে ইরান, ইরাক ও সিরিয়া, আবার কাতার হাত মিলিয়েছে তুরস্কের সঙ্গে।’ সেই সঙ্গে ইসরায়েলের পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসনের একপেশে আচরণে ফিলিস্তিনিরা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কোণঠাসা অবস্থায়। অভাব-অভিযোগ নিয়ে কথা বলার মতো আরবদুনিয়ায় তাদের মিত্র কমছে।

একসময় ফিলিস্তিনি ইস্যুতে আরবদেশগুলোতে যতটা আবেগ ছিল, এখন ততটা নেই বলে মনে করেন লন্ডনের গবেষণা সংস্থা চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক মোহাম্মদ আল-দাহশান। তাঁর মতে, আরবদেশগুলোর নতুন প্রজন্ম ফিলিস্তিনিদের লড়াই-সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করেনি। ফলে তাদের বাবা-দাদাদের তুলনায় তাদের মধ্যে ফিলিস্তিন নিয়ে আবেগ ততটা নেই।

তবে আল-দাহশান মনে করেন, একের পর এক আরবদেশ যদিও ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করছে; কিন্তু তা কতটা অর্থপূর্ণ হবে, শেষ পর্যন্ত সেসব দেশের জনগণের সিদ্ধান্তের ওপরই তা নির্ভর করবে। তিনি মিসর ও জর্দানের উদাহরণ টেনে বলেন, গত কয়েক দশকে দেশ দুটির সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক শুধু সরকারগুলোর ভেতর সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

মোহাম্মদ এয়াহিয়া মনে করেন, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সামনে এ মুহূর্তে বিকল্প খুব সামান্যই। আর আজকের পরিস্থিতির জন্য ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব বহুলাংশে দায়ী বলে মত দেন ওয়াশিংটনের গবেষণা সংস্থা ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক ওমর এইচ রহমান। তাঁর ভাষ্য, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুই বছর ধরে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নস্যাৎ করতে একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছেন, ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব বিকল্প কোনো প্রস্তাব-পরিকল্পনা হাজির না করে, বন্ধু বাড়ানোর চেষ্টা না করে, পুরনো বস্তাপচা স্লোগান দিয়ে চলেছে।’

আর আল-দাহশানের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বপ্ন অনেক ফিলিস্তিনিও আর দেখছে না। এর পক্ষে এই পর্যবেক্ষকের বক্তব্য, ‘পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে এখনো নতুন নতুন ইহুদি বসতি হচ্ছে। এরই মধ্যে সেখানে ইহুদি জনসংখ্যা আট লাখ ছাড়িয়ে গেছে। ওই সব বসতি রক্ষার নামে ফিলিস্তিনি জনবসতির মধ্যে দেয়ালের পর দেয়াল উঠেছে। গাজা ভূখণ্ড এখন একটি কারাগার।’

ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এখনো স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি বাতিল করে দেয়নি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন বলেই মনে করেন এই পর্যবেক্ষক। তাঁর মন্তব্য, সাধারণ ফিলিস্তিনিদের একটি অংশ মনে করছে, সামনে এখন একটাই বিকল্প, নিজেদের রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাদ দিয়ে ইসরায়েল রাষ্ট্রে সমান অধিকারের দাবি তোলা। ইসরায়েলকে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি গ্রহণযোগ্য একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনে সম্মতি দেবে, নাকি ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েল রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার দেবে। সূত্র : বিবিসি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা