kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৪ জুন ২০২০। ১১ শাওয়াল ১৪৪১

করোনায় 'বিসিজি' টিকা কি সত্যিই কাজ করে? প্রমাণ খুঁজছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৮ এপ্রিল, ২০২০ ১৬:৫৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনায় 'বিসিজি' টিকা কি সত্যিই কাজ করে? প্রমাণ খুঁজছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা

যক্ষার টিকা ব্যাসিলাস ক্যালমেট-গুউরিন (বিসিজি) নেওয়া থাকলে করোনার ঝুঁকি কম বলে কয়েকদিন আগে জানিয়েছিল বিশ্বের কয়েকটি দেশের বিজ্ঞানীরা। তারা বলেছিলেন, যক্ষ্মার ভ্যাকসিন পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে এটি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করতে পারে।

করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সত্যিই যক্ষ্মার ভ্যাকসিন কার্যকরি কোন ভুমিকা পালন করতে পারে কি-না সেটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চের (আইসিএমআর) বিজ্ঞানীরা। যদি পরীক্ষাগুলি সফল প্রমাণিত হয় তবে এটি স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও বয়স্ক লোকদের প্রাণ বাঁচাতে বড় ভুমিকা রাখতে পারে।

তবে আইসিএমআরের সিনিয়র বিজ্ঞানী ডা. নিবেদিতা গুপ্তা বলেছেন, মহামারিকালীন জনস্বাস্থ্যের ব্যবহারের জন্য বিসিজি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বোঝার জন্য আরো ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। এটা সত্যিই কাজ করে এমন কোন প্রমাণ এখনও আমাদের হাতে আসেনি।'

ফরাসি মাইক্রোবায়োলজিস্ট অ্যালবার্ট ক্যালমেট এবং ক্যামিল গুউরিনের নামানুসারে এই ভ্যাকসিনটির নামকরণ করা হয়।  অত্যন্ত সংক্রামক শ্বাসকষ্ট যক্ষ্মার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ১৯১৯ সালে এটা তৈরি করা হয়েছিল। সেই থেকে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে যক্ষ্মা নির্মূলে অব্যর্থ প্রতিষেধক হিসাবে এটা ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

গুপ্তা বলছিলেন, মেডিসরক্সে পোস্ট করা অপ্রকাশিত মেডিকেল গবেষণার প্রাথমিক সমীক্ষা বিবেচনা করে আইসিএমআর আলোচনা শুরু করেছে। যেখানে দেখা গেছে যে যক্ষ্মা রোগের টিকা বিসিজি দেওয়ার বাধ্যতামূলক নীতিমালাভুক্ত দেশগুলিতে যেসব দেশে বাধ্যবাধকতা নেই সেসব দেশের তুলনায় করোনায় মৃত্যুর হার কম।

রবিবার টাস্কফোর্সের বৈঠকে আইসিএমআরের বিজ্ঞানীদের দল ভ্যাকসিনটির সম্ভাব্য ব্যবহার ও কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করেছে। গুপ্তা বলেন, টাস্কফোর্স সভায় বিসিজি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। তবে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের মধ্যে বিসিজির কার্যকারিতা কতটুকু হবে সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত বয়স্ক লোকদের বিসিজি টিকা দেওয়া হলে সেটা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আসলে, বিসিজি কোভিড -১৯ এ আক্রান্ত সকল বয়সের মানুষের মাঝে কাজ করবে সেই প্রমাণ এখনও আমাদের হাতে নেই।'

যদিও কমপক্ষে ছয়টি দেশের চিকিৎসকরা ট্রায়াল চালিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে প্রথম সারির স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রবীণ ব্যক্তিদের বিসিজি ভ্যাকসিন দেওয়া হলে তাদের নোভেল করোনভাইরাস সংক্রমণ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে কি-না সেটা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ভারতও নিজস্ব পদ্ধতিতে প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করছে।

গুপ্ত বলেছেন, 'আমরা কোভিড-১৯ সংক্রমণে বিসিজি টিকা ব্যবহারে পর্যপ্ত প্রমাণ ছাড়া কোন সিদ্ধান্তে আসবো না। জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকির সৃষ্টি করতে পারে এমন কোন পথে আমরা হাটবো না। পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পেলেই কেবল এটা ব্যবহারের জন্য সুপারিশ করবো'

এর আগে, করোনা প্রতিরোধে বিসিজি টিকার ভুমিকা নিয়ে মার্কিন মার্কিন সাময়িকী টাইম এ একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অবস্থিত মাডক চিলড্রেন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এমসিআরআই) গবেষকরা দেশটির বিভিন্ন হাসপাতালের চার হাজার স্বাস্থ্যকর্মীকে তালিকাভূক্ত করে এ নিয়ে বর্তমানে একটি গবেষণা করছেন।

এমসিআরআই'র পরিচালক অধ্যাপক ক্যাথরিন নর্থ বলেছেন, 'ক্লিনিকাল এই ট্রায়ালটি কোভিড-১৯ এর উপসর্গের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনটির কার্যকারিতা যথাযথভাবে পরীক্ষা করার অনুমতি দেবে। এটি আমাদের স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করতে পারে।'

তবে শুধু অস্ট্রেলিয়ায় নয় জার্মানিতেও এ নিয়ে বড় ধরনের গবেষণা চলছে। তারা এই গবেষণায় বয়স্ক রোগীসহ বিভিন্ন হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের অন্তভূর্ক্ত করছে। যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস এবং গ্রিসও এমন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করার কাজ শুরু করেছে।

এছাড়া যারা জীবনে একবার বিসিজি টিকা নিয়েছেন তারা এই রোগটি প্রতিরোধ করতে পারে বলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে করোনা আক্রান্ত রোগীদের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির কলেজ অব অস্টিওপ্যাথিক মেডিসিনের এক গবেষণায় জানানো হয়েছে।

নিউইয়র্ক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির কলেজ অব অস্টিওপ্যাথিক মেডিসিন বলছে, যেসব দেশে বিসিজি টিকাদান কর্মসূচি নেই- যেমন ইতালি, নেদারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র; এসব দেশে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে টিকাদান কর্মসূচি যেখানে আছে; সেখানে করোনায় আক্রান্তের প্রবণতা কম।

নিউইয়র্ক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির কলেজ অব অস্টিওপ্যাথিক মেডিসিনের অধ্যাপক ডা. গঞ্জালো ওটাজু বলেন, 'বিসিজি নামের এই ভ্যাকসিন যে মানুষের রোগ প্রতিরোধের জন্য অনেকে ক্ষেত্রে বেশ উপকারী তার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।'

তিনি বলেন, 'উদাহরণস্বরূপ, গিনি-বিসাউতে একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিসিজির মাধ্যমে টিকা দেয়া শিশুদের সামগ্রিক মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে; যা শ্বাসকষ্টের সংক্রমণ এবং সেপসিস হ্রাসে ভ্যাকসিনের প্রভাবের কারণেই হয়েছে।'

গবেষকদের আশা, করোনাভাইরাস সংক্রমিত কোভিড-১৯ রোগের কোনো প্রতিষেধক তৈরির আগ পর্যন্ত বিসিজি ভ্যাকসিন করোনাভাইরাসের সামগ্রিক প্রভাব কমাতে পারে।

সূত্র- দ্য প্রিন্ট।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা