kalerkantho

শনিবার । ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩০  মে ২০২০। ৬ শাওয়াল ১৪৪১

যেভাবে করোনায় মৃত্যুর হার কমিয়ে রাখতে পেরেছে জার্মানি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৮ মার্চ, ২০২০ ১৮:২০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যেভাবে করোনায় মৃত্যুর হার কমিয়ে রাখতে পেরেছে জার্মানি

চীনের উহান থেকে উৎপত্তি হওয়া প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের মূল এপিসেন্টার এখন ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলো। এরই মধ্যে ভাইরাসের ভয়াল থাবায় মৃত্যুপুরীতে পরিনত হয়েছে ইতালি ও স্পেন। দেশটিতে বাড়িতে বাড়িতে পড়ে আছে লাশ। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে কাকে মরতে দেবেন আর কাকে বাঁচাবেন! ইতালি ও স্পেনের হাসপাতালগুলিতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কোভিড-১৯ রোগীর ভিড়ে জায়গা নেই ওয়েটিং রুম, করিডোরেও।

এই যখন ইউরোপের দেশগুলোর পরিস্থিতি, সেখানে আশ্চর্যজনকভাবে জার্মানিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের তুলনায় মৃত্যুর হার অনেক কম। নানা পরিসংখ্যান দেখিয়ে জার্মানির জীবাণুবিজ্ঞানীরা এ তথ্য তুলে ধরছেন। এ নিয়ে বিশ্বের অনেকেরই বেশ কৌতূহল।

জার্মানির চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সেরা বলে মনে করা হয়। জার্মানির প্রত্যেক নাগরিকের স্বাস্থ্য বিমা থাকা অত্যাবশ্যক। প্রত্যেক চাকরিজীবী নাগরিকের মাসিক বেতন থেকে স্বাস্থ্য বিমার অর্থ বিমা প্রতিষ্ঠানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায়। যেসব নাগরিক বেকার বা সামাজিক ভাতার ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের চিকিৎসাভাতার অর্থ সরকার দিয়ে থাকে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জার্মানির চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থার ধাঁচে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যা ওবামা কেয়ার নামে পরিচিতি পেয়েছিল। তবে দুর্ভাগ্য, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করে দেন।

বিশ্বে চিকিৎসাশাস্ত্রের নানা বিষয়ের বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসের করালগ্রাস থেকে রক্ষা পেতে নানা গবেষণা, পদ্ধতি বা পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করছেন। জার্মানির রাজধানী বার্লিনে বুধবার ২৬ মার্চ চার জীবাণুবিজ্ঞানী তাঁদের গবেষণার ফলাফল জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, জার্মানিতে কেন আক্রান্ত ব্যক্তিদের তুলনায় মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম।

এই গবেষেকদের ফলাফল নিয়ে বার্লিন চ্যারিটি ও সরকারি পরামর্শদাতা গবেষক ক্রিশ্চিয়ান ড্রস্টেন জানিয়েছেন, 'মূল কারণটি হলো, আমরা জার্মানিতে দ্রুত করোনাভারাস শনাক্তকরণে বেশ কিছু পথ অবলম্বন করেছি। জার্মানিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে পরীক্ষাগারগুলোতে বেশ আগে থেকেই দ্রুত ডায়াগনস্টিকস বা লক্ষণ শনাক্ত করা হচ্ছে।' তিনি বলেন, এই মুহূর্তে জার্মানি প্রতি সপ্তাহে পাঁচ লাখ লোকের করোনাভাইরাসের লক্ষণ শনাক্তকরণের কাজ চলছে। শনাক্তকরণের পর দ্রুত তাঁদের রোগের লক্ষণ অনুযায়ী বাছাই বা আইসোলেশন করা হচ্ছে। এই আইসোলেশন কাজ না করলে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি দ্রুত অন্যদের সংক্রমিত করবে।

ক্রিশ্চিয়ান ড্রস্টেন বলেন, 'এ মুহূর্তে আমরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে আমেরিকা, চীন, ইতালি, স্পেন, জার্মানি ও ফ্রান্সে যে বিভীষিকাময় মৃত্যুর হার দেখছি, তা অকল্পনীয়। এই মুহূর্তে চীনকে পেছনে ফেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১ লাখ ৪ হাজার ২৫৬ জন, মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৭০৪। চীনে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৮১ হাজার ৩৪০, মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ২৯২। ইতালিতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৮৬ হাজার ৪৯৮, মৃতের সংখ্যা ৯ হাজার ১৩৪। ফ্রান্সে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৩২ হাজার ৯৬৫, মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৯৯৫। স্পেনে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৭২ হাজার ২৪৮, মৃতের সংখ্যা ৫ হাজার ৬৯০। জার্মানিতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৫৩ হাজার ৩৪০, মৃতের সংখ্যা ৩৯৯।

জার্মানিতে সংক্রমণের তুলনায় এখনো মৃত্যুর হার কম থাকা প্রসঙ্গে বার্লিন চ্যারিটি ও সরকারি পরার্শদাতা গবেষক ক্রিশ্চিয়ান ড্রস্টেন বলেন, 'আমরা বেশ আগে থেকেই আমাদের পরীক্ষাগারগুলোতে করোনাভারাসের জন্য আলাদা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এ ধরনের প্রাক–প্রস্তুতি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত অনেক দেশ গ্রহণ করেনি। শুধু পরীক্ষাগারগুলোতে পরীক্ষা করলেই যে মৃত্যুর হার কমে যাবে, বিষয়টি তা নয়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত পর শুরু হবে মূল প্রক্রিয়া, করোনাভাইরাস রোগীর বয়স ও পারিপার্শ্বিকতা এবং অন্যান্য উপসর্গ দেখে তাঁর চিকিৎসা করা হচ্ছে। এসব কারণে এখনো জার্মানিতে করোনাভারাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুর হার কম।'

বার্লিনে চিকিৎসক–গবেষকদের এই সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁরা জানান, করোনাভারাসের চিকিৎসা শুধু মূল ব্যাপার নয়, এর বাইরে জনসচতেনতা এই সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব ছড়াতে মুখ্য ভূমিকা হিসেবে কাজ করছে।

জার্মানির শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক মন্ত্রী আনিয়া কার্জিলেক জানিয়েছেন, করোনাভারাস প্রতিরোধে একটি সম্মিলিত টাস্কফোর্স গড়ে তুলতে ১৫ কোটি ইউরো অনুদান দেওয়া হয়েছে। এই সম্মিলিত টাস্কফোর্স এখন করোনাভারাসের বিস্তার রোধে নতুন নতুন গবেষণাসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

প্রাথমিক পরিকল্পনা হিসেবে বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলো করোনাভারাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার পদ্ধতি ও ধরন এবং তাদের কার্যক্রম নিয়ে তথ্যবিবরণী তৈরিসহ অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন। এ তথ্যবিবরণী বা ডেটা বিশ্লেষণ করে এই মহামারি রুখতে ব্যবস্থাপনা, ভ্যাকসিন ও কী ধরনের থেরাপি প্রয়োজন, সে বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা