kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৯ চৈত্র ১৪২৬। ২ এপ্রিল ২০২০। ৭ শাবান ১৪৪১

দিল্লির সহিংসতা : বিয়ের ১২ দিনের মাথায় স্বামীহারা ফাতিমা!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২০:০১ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



দিল্লির সহিংসতা : বিয়ের ১২ দিনের মাথায় স্বামীহারা ফাতিমা!

ছবি সূত্র : আনন্দবাজার

সবেমাত্র ধর্ম সাক্ষী করে একে অপরের সঙ্গে সারাজীবন কাটানোর অঙ্গীকার করেছিলেন তারা। ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল তাদের। কিন্তু বিয়ের ১২ দিনের মাথাতেই ভেঙে গেল সব স্বপ্ন। নতুন বউয়ের রান্না করা ভাত খেয়ে দুপুরবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন সদ্য বিবাহিত ২২ বছরের আশফাক হুসেন। আর বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁর। এমনকি তাঁর মৃতদেহটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিন দিন ধরে গায়ে প্রবল জ্বর নিয়ে ঘরের কোণে পড়ে রয়েছেন ২১ বছরের তসলিন ফাতিমা। স্বামীকে জানার, চেনার সুযোগটাই যে মিলল না!

পূর্ব দিল্লির গোকুলপুরীর অন্তর্গত মুস্তফাবাদের ঘিঞ্জি গলিতে এক বস্তিঘরে সপরিবারে থাকতেন অশফাক হুসেন। পেশায় বিদ্যুৎকর্মী তিনি। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন্স ডেতে উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরের সাখনিতে তসলিনের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। পরিবার পরিজনকে নিয়ে সবকিছু মেটাতেই বেশ কয়েক দিন লেগে যায়। ভেবেছিলেন সব কিছু মিটিয়েই দিল্লি ফিরবেন। তসলিনকে নিয়ে সেখানেই নতুন জীবনে পা রাখবেন। একে অপরকে চিনবেন, জানবেন। শুরু হবে মধুর দাম্পত্য জীবন।

কাজের প্রয়োজনে রবিবার রাতে একাই মুস্তফাবাদের বাড়িতে ফিরে আসেন আশফাক। ঠিক ওই সময়ই জাফরাবাদ এবং মৌজপুরে বিক্ষোভের আগুনে হাওয়া লাগে। উত্তরপ্রদেশেও সে খবর পৌঁছয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে পর দিন ফিরে আসেন তসলিনও। নতুন বউ হিসাবে ওই দিন তার কাঁধেই রান্নার ভার পড়ে। তা সেরে দপুর ২টার দিকে সকলে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া সারেন। সেই প্রথম পাশাপাশি বসে খাওয়ার সুযোগ হয় তসলিন ও আশফাকের। এ ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি। কিন্তু কে জানত, আর কিছু সময় পর সব পাল্টে যাবে?

সেদিন দুপুরে খাওয়ার পরই একটি ফোন আসে আশফাকের কাছে। বলা হয়, পাড়ায় একটি বাড়িতে আচমকা বিদ্যুৎ চলে গেছে। তাকে গিয়ে দেখতে হবে। সেই মতো ১২ দিনের স্ত্রীকে রেখে বাড়ি থেকে বের হন আশফাক। সেটাই তাদের শেষ দেখা। তারপর আর ফেরা হয়নি আশফাকের। বাড়ি থেকে কিছু দূর এগোতেই গুলিবিদ্ধ হন তিনি। পরিবারের লোকজন কিছু জানার আগে স্থানীয়রাই তাঁকে নিউ মুস্তফাবাদের আল হিন্দ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেই মৃত্যু হয় আশফাকের। ময়নাতদন্তের জন্য পরে গুরু তেগবাহাদুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর দেহ। কিন্তু শুক্রবার পর্যন্ত মৃতদেহ বুঝে পায়নি পরিবার।

রবিবার রাত থেকেই বন্দুক, লাঠি এবং পেট্রল বোমা নিয়ে মুস্তফাবাদে ঢুকতে শুরু করে তাণ্ডবকারীরা। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশ এবং দমকলবাহিনীকে একাধিক বার ফোন করা হলেও, কারও দেখা মেলেনি। বুধবার এলাকায় অ্যাম্বুল্যান্স পর্যন্ত ঢুকতে পারেনি। এলাকার একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয় দুষ্কৃতীরা। আগুন ধরানো হয় একটি স্কুলেও। একাধিক বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। গত তিন দিন ধরে ছেলের ওয়ার্কশপে বসে কেঁদে চলেছেন আশফাকের বাবা। শুধু নিজের ছেলে নয়, চার দিন ব্যাপী হিংসায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের সকলকে শহিদ ঘোষণা করতে হবে বলে দাবি করেছেন। সরকার অপরাধীদের কড়া শাস্তি দেবে বলে আশাবাদী  তিনি।

আর তসলিন? কিছু বলার মতো অবস্থা নেই তার। স্বামী হারানোর শোকে একটি ঘরে গত তিন দিন ধরে তীব্র জ্বর নিয়ে পড়ে রয়েছেন এই তরুণী। এই তিন দিনে একটি দানাও মুখে তোলেননি। পানি পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখেননি। সবাই তাকে শুশ্রুষার চেষ্টা করছেন। কিন্তু স্বান্ত্বনায় কি আর এই শোক দূর হয়? তসলিনের মুখে একটাই আফসোস, 'মানুষটা কেমন, তা জানতেও পারলাম না।'

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা