kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

যৌন নিপীড়কের সঙ্গে বন্ধুত্বের জের, বিপাকে প্রিন্স অ্যান্ড্রু

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ১১:১৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যৌন নিপীড়কের সঙ্গে বন্ধুত্বের জের, বিপাকে প্রিন্স অ্যান্ড্রু

বিবিসির নিউজনাইট অনুষ্ঠানে প্রিন্স অ্যান্ড্রু

যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিইনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ডিউক অব ইয়র্ক প্রিন্স অ্যান্ড্রুর। এই অভিযোগে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। আর এই অভিযোগে  প্রিন্স অ্যান্ড্রুর ক্ষমা চাওয়া উচিত বলে দাবি উঠেছে। এই দাবি করেছেন যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়া নারীদের আইনজীবী স্পেন্সার কুভিন।

স্পেন্সার কুভিন বলেছেন, 'রাজকীয় এই ব্যক্তিত্ব নারীদের অবমাননা করেছেন। বিবিসির নিউজ নাইট অনুষ্ঠানে শনিবার প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সাক্ষাৎকারটি 'দুঃখজনক' আর 'হতাশাজনক'।

ওই সাক্ষাৎকারকে সমালোচকরা অনেকটা 'গাড়ি দুর্ঘটনার' সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া সঠিক ছিল বলেই মনে করেন প্রিন্স অ্যান্ড্রু।

এসব সমালোচনার মধ্যে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর প্রতি নতুন করে আহবান জানানো হচ্ছে যেন, তিনি মার্কিন ধনকুবের এপস্টিইনের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষকে খুলে বলেন। যুক্তরাষ্ট্রে যৌন পাচার সংক্রান্ত অভিযোগে বিচার শুরু হওয়ার আগে কারাগারে আত্মহত্যা করেন ৬৬ বছর বয়সী এপস্টিইন।

প্রিন্স অ্যান্ড্রু বলেছেন, ২০১০ সালে এপস্টিইনের সাথে সর্বশেষ বৈঠকের পর তাদের বন্দুত্বের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। 

গত কয়েক মাস ধরেই এপস্টিইনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় নিয়ে প্রশ্নের মুখে আছেন ডিউক অব ইয়র্ক।

সোমবার 'টুডে প্রোগ্রামে' কুভিন বলেন, এটা খুব হতাশাজনক যে, ওই লজ্জাকর ব্যক্তির সঙ্গে তার বন্ধুত্বের গভীরতার ব্যাপারটি স্বীকার করেননি তিনি (প্রিন্স অ্যান্ড্রু) এবং সেজন্য ক্ষমাও চাননি। আসল ব্যাপারটা হলো যে, তিনি সাজাপ্রাপ্ত একজন যৌন অপরাধীর বন্ধু এবং তার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এটা প্রমাণ করে যে, ওই ব্যক্তি (এপস্টিইন) মেয়েগুলোর সঙ্গে যা করেছে, সেটার গভীরতা তিনি বুঝতে পারছেন না।

নিউজনাইট অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারে রানী এলিজাবেথের তৃতীয় সন্তান প্রিন্স অ্যান্ড্রু বলেছেন, এপস্টিইনের তিনটি বাড়িতে তিনি গেলেও অপরাধমূলক কোন আচরণের ব্যাপারে তার সন্দেহ হয়নি।

কুভিন বলছেন, তিনি মনে করেন না, সেখানে যা ঘটছিল, সেটা কোনভাবে প্রিন্সের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে, ''যেখানে তরুণী মেয়েরা অবিরত সেসব বাড়িতে যাতায়াত করছিল।''

কুভিন বলছেন, এপস্টিইনের বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ এনেছেন, তারা এখন সম্ভাব্য সহযোগীদের ব্যাপারেও মনোযোগ দিতে শুরু করেছেন।

এপস্টিইনের সাবেক বান্ধবী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের ব্যাপারেও প্রশ্ন উঠেছে।

সন্দেহ করা হচ্ছে যে, ওই ধনকুবেরের জন্য অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যোগান দেয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল।

তবে অন্যায় কিছু করার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন মিজ ম্যাক্সওয়েল।

আইনজীবী লিসা ব্লুম, যিনি এপস্টিইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা পাঁচজন নারীর প্রতিনিধিত্ব করছেন, বিবিসির সাক্ষাৎকারের পর তিনিও প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে মার্কিন কর্তৃপক্ষের দ্বারা জিজ্ঞাসাবাদের আহবানে যোগ দিয়েছেন।

আইনজীবী লিসা ব্লুম প্রশ্ন তুলেছেন, কেন প্রিন্স অ্যান্ড্রু এপস্টিইনের সঙ্গে বন্দুত্বের কারণে ক্ষমা চাইছেন না?

বিবিসির ভিক্টোরিয়া ডার্বিশায়ার অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, আমি মনে করি, সাক্ষাৎকারটিতে তিনি নিজের জন্যই পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছেন এবং আমার মতে, এখন হয়তো (যুক্তরাষ্ট্রের) কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে কথা বলতে চাইবে। আমার মতে তাদের সেটা করাই উচিত।

এপস্টেইনের শিকার একজন ভুক্তভোগীর আইনজীবী গ্লোরিয়া অলরেড আইটিভির 'গুড মর্নিং ব্রিটেন' অনুষ্ঠানে বলেছেন, তিনি এখন জনমানুষের মতামতের আদালতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাঁর উচিত এফবিআইয়ের কাছে সাক্ষ্য দেয়া।

তিনি বলছেন, তিনি বুঝতে পারছেন না যে, নিউইয়র্ক, পাম বীচ এবং ভার্জিন আইল্যান্ডে এপস্টিইনের বাড়িতে ভ্রমণের সময় কীভাবে প্রিন্স জানতেন না যে, সেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের উপস্থিতি রয়েছে।

এরই মধ্যে লেবার পার্টির ছায়া বাণিজ্য মন্ত্রী ব্যারি গার্ডেনার বলেছেন, এপস্টিইনের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করতে যা করা দরকার, সেটাই প্রিন্স অ্যান্ড্রুর করা উচিত।

তিনি বলেছেন, সে সময়ে তিনি কী জানতেন এবং তার সাবেক বন্ধুর সঙ্গে কীভাবে সময় কাটিয়েছেন,সেটা বলার মাধ্যমেই তিনি একমাত্র সঠিক কাজটি করতে পারেন।

নিউজনাইট অনুষ্ঠানে প্রিন্স অ্যান্ড্রু জানান, তিনি শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দেবেন, যদি সেরকম কিছু জরুরি হয়ে ওঠে এবং যদি তাঁর আইনজীবীরা সেই পরামর্শ দেন।

ওই সাক্ষাৎকারের পরে ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে পড়েছেন প্রিন্স, যাকে জনসংযোগের বিপর্যয় বলে বর্ণনা করছেন ব্রিটেনের রাজতন্ত্রের পর্যবেক্ষকরা।

হুডার্সফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছেন, যাতে ডিউককে তাদের চ্যান্সেলরের পদ থেকে পদত্যাগ করার জন্য চাপ দেয়া হবে।

এর জবাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের (বিশ্ববিদ্যালয়ের) কাজের ধরণের সঙ্গে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর 'নতুনত্বের প্রতি আগ্রহ এবং উদ্যোক্তা মনোভাব' যেন প্রাকৃতিকভাবেই মিশে যায়।

বিবিসির সাক্ষাৎকারে ভার্জিনিয়া জোফ্রে বা যাকে সে সময় ভার্জিনিয়া রবার্টস নামে ডাকা হতো, তার সঙ্গে কোন ধরণের যৌন সংস্পর্শের কথা নাকচ করে দিয়েছেন প্রিন্স অ্যান্ড্রু।

ভার্জিনিয়া জোফ্রে জানিয়েছিলেন, প্রথমবার যখন ঘটনা ঘটে, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর।

প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তিনি এসব বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে চেয়েছেন এবং সততা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিউজনাইট অনুষ্ঠানে তিনি ঠিক তাই করেছেন।


দীর্ঘ পরিসরের ওই সাক্ষাৎকারটি যুক্তরাজ্যের গ্রাহকরা বিবিসি আইপ্লেয়ারে অথবা বিশ্বের গ্রাহকরা ইউউটিবে দেখতে পারবেন। সেখানে প্রিন্স অ্যান্ড্রু যা বলেছেন :

যে তারিখে তার সঙ্গে যৌন মিলন হয়েছে বলে ভার্জিনিয়া জোফ্রে বলেছেন, ২০০১ সালের ১০ই মার্চ, সেদিন তিনি একটি পার্টি আয়োজনের জন্য তাঁর মেয়েকে পিজ্জা এক্সপ্রেসে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং রাতে বাসাতেই কাটিয়েছেন।

তিনি প্রচুর ঘামছিলেন বলে যে তথ্য এসেছে, সেটি তিনি নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, অদ্ভূত একটি চিকিৎসাগত কারণে তার ঘাম হয় না। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় অ্যাড্রিনাল ওষুধের অতিরিক্ত প্রয়োগের কারণে এটি ঘটেছে।

জোফ্রের সঙ্গে তার যে ছবির কথা বলা হচ্ছে, সেটা সাজানো কিনা, তা তদন্ত করে দেখার আদেশ দিয়েছেন তিনি, যদিও এখনো সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।

ধনকুবের জেফরি এপস্টিইনের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে কথা বলাটা তার জন্য যেন একটি 'মানসিক সমস্যার কারণ' হয়ে দাঁড়িয়েছে। জোফ্রের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপার নিয়ে দরকার হলে তিনি শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দেবেন, যদি পরিস্থিতি সেরকম দাঁড়ায় এবং তার আইনজীবীরা পরামর্শ দেন।

উইন্ডসর ক্যাসেলে প্রিন্সেস বিয়েট্রিসের ১৮তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যখন এপস্টিইনকে নিমন্ত্রণ করা হয়, তখন তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ব্যাপারে তিনি কিছু জানতেন না।

এপস্টিইনের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকার কারণে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ে অনেক কিছু শেখার সুযোগ পেয়েছেন, তাই এই বন্ধুত্ব নিয়ে তাঁর (প্রিন্স অ্যান্ড্রুর) কোন অনুশোচনা নেই।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা