kalerkantho

এনআরসি-র আতঙ্ক : পুরনো নথি খুঁজতে কলকাতায়

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৯:২৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এনআরসি-র আতঙ্ক : পুরনো নথি খুঁজতে কলকাতায়

আসামের জাতীয় নাগরিক পঞ্জীতে ১৯ লাখ মানুষের নাম বাদ যাওয়ার ফলে তাদের নাগরিকত্ব প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তাদের এবার কী হবে - আটক করে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হবে, না কি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে, তা নিয়ে সংবাদপত্রে, সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত আলোচনা চলছে ।

আদতে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা ছিলেন, এখন আসামে থাকেন, তবে সেখানকার এনআরসি-তে নাম ওঠে নি, এরকম বহু মানুষ রোজ ভিড় করছেন কলকাতার রাজ্য লেখ্যাগার বা স্টেট আর্কাইভসে।

এরকমই দু'জন, আসামের কোকরাঝাড় জেলার বাসিন্দা শাহিদ আলি আর সেকেন্দার আলি।

এই সরকারি আর্কাইভসে রাখা রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সব ভোটার তালিকা। ভোটার তালিকায় কারও নাম আছে কী না, তা খতিয়ে দেখে স্টেট আর্কাইভসই একমাত্র সার্টিফায়েড কপি দেয়ার অধিকারী। সেই সার্টিফায়েড কপি আদালতে গ্রহণযোগ্য।

আসামের বাসিন্দা শাহিদ আলি আদতে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা ছিলেন। নদী ভাঙ্গার পরে তিনি আসামের কোকরাঝাড়ে গেছেন রোজগারের আশায়।

পুরনো গ্রামের পঞ্চায়েত সার্টিফিকেট দিয়েছে যে তিনি আদতে সেখানকার লোক, এখন আসামে আছেন।

"আমার বাবা-দাদা সবাই পশ্চিমবঙ্গেরই ভোটার ছিলেন। কিন্তু সেই কাগজপত্র তো আমার কাছে নেই। সেসব খুঁজতেই কোকরাঝাড় থেকে কলকাতায় আসতে হলো,'' শাহিদ আলী বিবিসিকে বলেন।

"আমার নাম ওঠেনি এনআর সিতে, ছেলে মেয়ে কারও নাম নেই। বাবার ভোটার তালিকা দেখাতে না পারলে তো সবাইকে জেলে ধরে নিয়ে যাবে," তিনি বলেন।

পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলা থেকে এসেছিলেন মনোরঞ্জন মজুমদার। তার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে আসামে, এবং নাম এনআরসি-তে ওঠেনি।

"দিদির বিয়ে হয়েছে ওখানে। ও যে আসলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার ছিল, সেই প্রমাণপত্র নিতে এসেছি," জানালেন মজুমদার।

পশ্চিমবঙ্গে এখনও এনআরসি চালু না হলেও কেন্দ্র সরকার বারেবারেই বলছে এ রাজ্যেও তারা এনআরসি চালু করবে।

তা থেকেই ভয় হয়েছে কলকাতার বাসিন্দা পৌলমী রায়চৌধুরী বা ডোমজুড়ের বাসিন্দা শেখ মেহবুব আলমের মতো বহু মানুষের।

"আসামের মতো এখানেও যদি এনআরসি চালু হয়, আর কাগজপত্র যদি দেখাতে না পারি, তাহলে ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যেতে পারে। আগে থেকেই তাই কাগজপত্র যোগাড় করে রাখছি," বলছিলেন পৌলমী রায়চৌধুরী।

ব্যারাকপুরের বাসিন্দা চায়না চ্যাটার্জীও পূর্বপুরুষের নাম ভোটার তালিকায় আছে কী না, সেই খোঁজ করতে এসেছিলেন স্টেট আর্কাইভসে।

"আমার ঠাকুরদা, বা সব পূর্বপুরুষরাই এখানকার বাসিন্দা। ইংরেজ আমলে সরকারি কর্মীও ছিলেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ। কিন্তু এত পুরনো কাগজপত্র খুঁজে পাচ্ছি না," বলেন চায়না চ্যাটার্জী।

তিনি বলছেন, যদি আসামের মতো এনআরসি চালু হয়, তাই নথি যোগাড় করে রাখতে হবে।

''এগুলো না দেখাতে পারলে তো পূর্বপুরুষদের পরিচয়ই তো দিতে পারব না, প্রমাণ করতেই পারব না যে তারা এখানেই থাকতেন,'' তিনি বলেন।

স্টেট আর্কাইভসের পরিচালক ড. সীমন্তী সেন বিবিসিকে জানান, রোজ প্রায় চার-পাঁচশো মানুষ আসছেন তাঁর দপ্তরে যাদের মধ্যে অনেকেই এখন আসামের বাসিন্দা, কিন্তু হয়তো আগে পশ্চিমবঙ্গে থাকতেন।

"পুরনো ভোটার তালিকায় নিজের বা পূর্বপুরুষের নাম আছে কী না, সেই সার্টিফায়েড কপি যোগাড় করে তারা আসামের বিদেশি ট্রাইব্যুনালে যাবেন,'' ড. সেন বলেন।

''পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে দপ্তরের নিয়মিত কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে এই এনআরসি-র সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য,'' তিনি বলেন।

ড. সেন বলেন, পশ্চিমবঙ্গে যদিও এনআরসি-র নোটিফিকেশনই হয় নি, তবুও সেখান থেকেই বেশী মানুষ আসছেন।

''পত্রিকায় নানা খবর পড়ে আতঙ্কে তারা চলে আসছেন," তিনি বলেন।

হাওড়া জেলার ডোমজুড়ের বাসিন্দা শেখ মেহবুব আলমের গলায় সেই আতঙ্কের ছবিই উঠে এলো।

"কাগজে দেখছি তো আসামের মানুষের কী অবস্থা হচ্ছে। কাগজপত্র নেই বলে অনেকে ফেঁসে যাচ্ছে সেখানে,'' তিনি বলেন।

'' আমাদের যাতে সেরকম না হয়, তাই আগে থেকেই সব জোগাড় করে রাখছি,'' আলম বলেন।

পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাদের অবশ্য এখন ফিরে যেতে হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়ে দিচ্ছেন যে আসামের মানুষের নথি খতিয়ে দেখে সার্টিফায়েড কপি দেয়াটাই এখন সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালু হলে, তারপরে এ রাজ্যের বাসিন্দাদের নথি খতিয়ে দেখার আবেদন নেয়া হবে।

- বিবিসি বাংলা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা