kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মেয়ে জন্ম নিলেই ১১১টি গাছ লাগায় গ্রামবাসী, খোলে নিরাপত্তা 'ট্রাস্ট'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৩:৫২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মেয়ে জন্ম নিলেই ১১১টি গাছ লাগায় গ্রামবাসী, খোলে নিরাপত্তা 'ট্রাস্ট'

পৃথিবীর সব সংস্কৃতিতেই সন্তান জন্মকে ঘিরে কোনো না কোনো ঐহিহ্যবাহী আচার পালন করা হয়ে থাকে। কিন্তু ভারতের রাজস্থানের পিপলান্ত্রি গ্রামের বিষয়টাই আলাদা। সেখানে কোনো ঘরে কন্যা জন্ম নিলে তার জন্যে গোলাপী পোশাক বা খেলনা দেওয়া হয় না। ও উপলক্ষে সেখানে গুনে গুনে ১১১টি গাছ রোপন করা হয়। প্রতি নবজাতক কন্যার আগমন উদযাপনে লাগানো হয় ১১১টি গাছ! 

তবে ভারতে কন্যা সন্তান জন্মের ইতিহাসটা বেশ কালো। এখন পর্যন্ত অসংখ্য পরিবার রয়েছে যারা মেয়ে শিশুর আগমনকে পরিবারের জন্যে বোঝা বলে মনে করে। গ্রামে-শহরে এখন পর্যন্ত মেয়েকে বিয়ে দিতে যৌতুকের আতঙ্কে থাকতে হয় বাবা-মাকে। তাই মেয়েদের চেয়ে অনেক বেশি আকাঙ্ক্ষিত থাকে ছেলেরা। তবে এমনও আছেন যারা মেয়েদেরকে পরিবারের লক্ষ্মী মেনে নেন। মেয়ের ১৮ পার না হলে বিয়ে দেন না। তাদের পর্যাপ্ত শিক্ষাও দেওয়া হয়। তবে এদের সংখ্যা হাতেগোনা। এমন চিত্র বাংলাদেশেও দেখা যায়। 

তবে আজকের কাহিনিটা ভারতের একটি ছোট গ্রামের। যে দেশে মেয়ে সন্তান মানেই বিপদ বলে মনে করা হয়, যেখানে মেয়েরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অত্যাচার-নিপীড়নের শিকার, সেখানকার একটি গ্রামের এই সংস্কৃতি সত্যিকার অর্থেই মেয়েদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে ভালো সময়ের জানান দেয়। 

অনন্য এই নিয়ম চালু করেছিলেন পিপলান্ত্রি গ্রামের সাবেক গ্রামপ্রধান শায়াম সুন্দর পালিওয়াল। তিনি মেয়ে সন্তানের বাবা হওয়া উপলক্ষে নিজেই ১১১টি গাছ লাগিয়েছিলেন। তিনি যখন মারা যান তখন মেয়েটার বয়সও বেশি না। পালিওয়াল পরবর্তিতে গ্রামপ্রধানের দায়িত্ব পালন না করলেও তার পথে হাঁটা শুরু করে গ্রামের অন্যান্য পরিবার। এক সময় তা প্রচল হয়ে যায়। 

শুধু তাই নয়, গ্রামে কোনো পরিবারে মেয়ের জন্ম হলে সব পরিবার মিলে তার ভবিষ্যতের জন্যে ছোট একটা 'ট্রাস্ট' গঠন করেন। এতে জমা থাকে ৩১ হাজার রুপি। এর এক-তৃতীয়াংশ প্রদান করেন মেয়েটার বাবা-মা। মেয়েটার বয়স ২০ বছর হওয়া পর্যন্ত এই অর্থ তার পাশে 'ফান্ড' হিসেবে কাজ করে। কেবল এই 'ট্রাস্ট' এর জন্যেই মেয়েটি কখনোই নিজেকে তার বাবা-মায়ের ঘাড়ে বোঝা বলে মনে করে না। 

এই 'ট্রাস্ট' এর বিপরীতে মেয়েটির বাবা-মাকে একটি চুক্তিতে আসতে হয় সমাজের সাথে। সেখানে তারা প্রতিজ্ঞা করেন যে, তাদের মেয়ের বয়স ১৮ না হওয়া পর্যন্ত তারা তাকে বিয়ে দেবেন না। পাশাপাশি মেয়েকে পর্যাপ্ত শিক্ষাগ্রহণের ব্যবস্থাও করবেন। সেই সঙ্গে আরো প্রতিজ্ঞা করেন, মেয়ের জন্ম উপলক্ষে লাগানো ১১১টি গাছের যত্নও তারা নেবেন। 

গাছ লাগানোর উপকারিতা নিয়ে নতুন করে বোঝানোর কিছু নেই। একে তো এই গাছগুলো পরিবারের এবং মেয়েটির সম্পদ হিসেবে থাকছে, তার ওপর গ্রামের পরিবেশও আরো স্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে। গ্রামের এই সংস্কৃতি কেবল মেয়েদের প্রতি শ্রদ্ধাই প্রকাশ করেন না, প্রকৃতির প্রতি তাদের ভালোবাসার অনন্য নজির স্থাপন করেছে। 

এমনই এক কন্যা সন্তানের পিতা গেহরিলাল বলাই। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, ঘুমন্ত মেয়েটিকে দেখলে তার যতটা ভালো লাগে, তেমনই লাগে গাছগুলোকে বেড়ে উঠতে দেখতে। 

এই গাছগুলো গ্রামের প্রত্যেক কন্যার প্রতীক হয়ে উঠেছে। গাছের যত্নআত্তি এবং পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচাতে গ্রামবাসীরা বেশ পরিশ্রমও করে। তারা অ্যালোভেরার গাছ লাগান। একটা মেয়ের জীবনের কঠিন সময়টাতে বাবা-মা ও স্বজনরা যেমন পাশে থাকেন, তেমনইভাবে গাছের পাশেও তারা আছেন।

পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত বিষয়ের সাথে গ্রামের মানুষের সম্পর্কটা অনেক গভীর। পালিওয়ালের দিয়ে যাওয়া এই চর্চা সমাজের প্রত্যেক সদস্যের ভবিষ্যতটাকেও অটুট করে দেয়। 

গত ছয় বছরে প্রায় আড়াই লাখ গাছ লাগানো হয়েছে এই গ্রামে। এই সংস্কৃতি গ্রামের সামাজিক জীবটাকেও অনেক শান্তিময় করে দিয়েছে। সমাজে অপরাধপ্রবণতা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। কন্যা শিশুর প্রতি ভালোবাসাও যেন অনেক বেড়ে গেছে। 

মানুষের সামাজিক জীবন এবং প্রকৃতির সম্পর্কের গভীরে যদি আমরা প্রবেশ করি, তবে এই গ্রামের চিত্র আমাদের এক অনবদ্য এবং বিস্ময়কর সমাধান দেয়। আধুনিক জীবনের অনেক সমাধানের খোঁজ মিলেছে এই গ্রামের সংস্কৃতিতে। এ ধরনের সামাজিক চর্চা গোটা বিশ্বকেই বদলে দিতে পারে। আজকে বুনে দেয়া ছোট্ট একটি গাছের চারা একটা সময় বিশাল এক মহীরূহে পরিণত হবে- এটা মনে রাখতে হবে। 

সূত্র: ওয়ান গ্রিন প্ল্যানেট 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা