kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

'এনআরসি খায়, না মাথায় দেয়!'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০৯:১৮ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



'এনআরসি খায়, না মাথায় দেয়!'

সত্যিকার ভারতের নাগরিক যাচাইয়ে আসামের এনআরসি (নাগরিক পঞ্জি) প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গেও বহু মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এর রেশ দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ-বীরভূমের দুই যুবকের মাঝে। শিকড়ের সন্ধানে কলকাতার কলেজপড়ুয়া কয়েক জন বন্ধু মিলে মঙ্গলবার দুপুরে স্টেট আর্কাইভস বা রাজ্য লেখ্যাগারের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। আবেদনপত্রে ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় বাবা-ঠাকুরদার নাম খুঁজছেন তাঁরা।

পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই এখন এনআরসির উদ্বেগে পুরনো নথিপত্র খোঁজা শুরু করেছেন। তবে কেউ কেউ গোপনে কাজটি করলেও রাজাবাজারের সরকারি স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক সৈয়দ আফতাব আলমের রাখঢাক নেই। স্পষ্ট বলছেন, 'বিজেপির রাজ্য সভাপতি তো বলেই দিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি হবে। ২০২১-এ শুনছি ওরাই ক্ষমতায় আসবে। তাই ঝুঁকি নিতে চাই না।'

উদ্বিগ্ন আফতাবের ঠাকুরদার বাবা নালন্দা থেকে ১৯১৬ সাল নাগাদ কলকাতায় এসেছিলেন। আসামের ধাঁচে এখানেও ১৯৭১-কেই নাগরিকত্ব প্রমাণের সময়সীমা ধরা হতে পারে ভেবে ১৯৬৬-র ভোটার-তালিকাই তাঁর লক্ষ্য। বর্ধমানের নাদনঘাটের ভোটার, পেশায় ফিজিওথেরাপিস্ট মুহাম্মদ ইয়াকুব শেখ বলছেন, 'আমরা কালনার সাত পুরুষের বাসিন্দা। কিন্তু দেশের সরকারকে বিশ্বাস নেই। কে, কখন বাংলাদেশি বলে দেগে দেয়!'

কলকাতা বন্দরে কন্টেইনার ব্যবসায়ী আব্দুর রেজ্জাক সর্দার নিজের 'দূরদর্শিতা'য় মিটিমিটি হাসছেন। 'এদের মতলবটা বুঝে এক মাস আগেই আমি আর্জি জানিয়েছি। একটু পরেই ভোটার তালিকার প্রমাণ হাতে পাব।'

শেক্সপিয়র সরণির সরকারি দফতরের একতলায় ঢুকতেই শুকনো মুখে এমন অজস্র প্রত্যাশীর ভিড়। এতদিন মূলত আসামের বাঙালিরাই আসছিলেন। 'এনআরসি-জুজুতে' সন্ত্রস্ত পশ্চিমবঙ্গবাসীই এখন দলে ভারী। বিভাগীয় সহ-অধিকর্তা সুবোধচন্দ্র দাস বললেন, 'ভোটের আগে অমিত শাহ বাংলায় এনআরসি হবে বলার পরেই এ রাজ্যের মানুষও দলে দলে আসছেন। আসামের এনআরসি (নাগরিক পঞ্জি) প্রকাশের পরে ভিড়টা আরও বেড়েছে।'

পুরনো ভোটার তালিকা এমন 'মহার্ঘ' হয়ে ওঠার পরে ১৯৭১ পর্যন্ত কয়েকটি জেলার ভোটার তালিকার ডিজিটাইজেশন হয়েছে। আসামের বাসিন্দা বাঙালিদের অনেকের পূর্বপুরুষ কোচবিহারের। এনআরসি-জটিলতায় কোচবিহারের চাপটাই বেশি ছিল স্টেট আর্কাইভসে। এখন অন্য জায়গা থেকেও আগন্তুকের ছড়াছড়ি।

সে অফিসেরই এক কর্মকর্তা বললেন, 'সোম-মঙ্গল দু'দিনেই ৬০ ও ৮০ জন এসেছেন। কর্মী কম। তাই সকলের আবেদনপত্র নিতে পারিনি।'

পুরনো ভোটার তালিকার জাবেদা খাতা খুলে আবেদনকারীদের খোঁজার অনুমতি দিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। কাউকে কাউকে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে কম্পিউটারে। নাম খুঁজে পেলে তা জানাচ্ছেন তাঁরা। মাসখানেক পরে নথি মিলিয়ে টাইপ করা নথি দিচ্ছে দফতর।

এই অফিসেই আসামের এনআরসি-র পর 'দেশহীন' বাসিন্দারাও আসছেন। সেই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গবাসীরও ভিড় বেড়েছে। কেউ জানেন না, এখানে এনআরসি হলে কবেকার নথি লাগবে। তবু যে যা পারেন, খড়কুটোর মতো নথি আঁকড়ে ধরছেন। বর্ধমানের মন্তেশ্বরের চাষি মোতু শেখ বোঝেনই না— 'এনআরসি' খায়, না মাথায় দেয়!

তাহলে কেন কাগজ খুঁজতে কলকাতায় এসেছেন? বললেন, 'গেরামে বলল, দেশে থাকতে হলে বাবার নামের ভোটার লিস্ট চাই। তাই সেই নথির খোঁজে মুরুব্বির সঙ্গে কলকাতায় এসেছি,' বললেন মোতু।

এনআরসির চক্রে পড়ে নাগরিকত্ব হারালে মারাত্মক ভোগান্তি হবে। নাগরিকত্বের অগ্নিপরীক্ষায় এখন এটুকু নথিই যে সম্বল! তাই খুঁজে বের করতেই হবে সেই কাগজ। সূত্র : আনন্দবাজার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা