kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নাগরিকপঞ্জি : হিন্দু না ওরা মুসলিম…

শুভাশিস মৈত্র   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১৪:০৭ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



নাগরিকপঞ্জি : হিন্দু না ওরা মুসলিম…

নাগরিকপঞ্জি তৈরি হবে। যারা ভারতীয় নয় তাদের খুঁজে বের করা হবে। কারণ ভারত দেশটা শুধু ভারতীয়দের। ভারত শুধু ভারতীয়দের, শুনলেই তো মনে হয় কথাটায় যুক্তি আছে। ঠিকই তো, যারা ভারতীয় নয়, তারা কেন ভারতে থাকবে?

কিন্তু কেন দেশে দেশে এই প্রশ্ন ওঠে বারবার? রাজ্যবিস্তার, ধর্মপ্রচার, যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদী লুট, দাস ব্যবসা, শ্রমিকচালান, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ- এমন বহু কারণে একটি নির্দিষ্ট শাসিত এলাকায় বিভিন্ন ছোট-বড় জাতিসত্তার উপস্থিতি। এই উপস্থিতির ইতিহাসের রথের চাকায় চোখের জল, রক্ত লেগে আছে। আর তাদের মধ্যে বিদ্বেষের জন্মের ইতিহাস, ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে বিতারণের ইতিহাস, খুবই প্রাচীন।

টানা ৮০০ বছর মুসলিম দখলে থাকার পর, প্রায় ৫০০ বছর আগে যখন স্পেন থেকে লাখো মুসলিমকে (যাঁরা খ্রিস্টান হতে রাজি হলেন না) বহিষ্কার শুরু হলো, তার আগে বিরাট বিরাট মসজিদ ভেঙে সেগুলিকে চার্চে পরিণত করা হয়েছিল। 'স্প্যানিশ ইনকুইজিশন'-এর সেই নির্মম ইতিহাসেরই আধুনিক মডেল, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়ন। বা চীনের উইঘুর মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রাখা, যা এখন আর অভিযোগ নয়, ঘটনা।

গুজরাটে ২০০২ সালে যখন সংঘবদ্ধভাবে মুসলিম নিধন হচ্ছে, তখন সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি এখন 'হিন্দু হৃদয়ের সম্রাট'। তিনি আরএসএসের প্রতিনিধি। ট্রাম্প যখন বলেন কালো মানুষ বা বাইরে থেকে আসা মানুষেরা ঠিক করবে না আমেরিকার ভবিষ্যৎ, তখন ভারতে শোনা যাচ্ছে, সব দল মুসলমানদের এবং অনুপ্রবেশকারীদের ভোটে জেতার চেষ্টা করছে, একমাত্র বিজেপি বলছে এর বিরুদ্ধে হিন্দুদের জোট বাঁধতে।

ধরা যাক সব প্রতিবাদ ব্যর্থ হলো, ভারতব্যাপী নাগরিকপঞ্জি তৈরি হলো। ধরা যাক, দেখা গেল সারা দেশে এক কোটি মানুষ প্রয়োজনীয় নথি সরকারকে দেখাতে পারলেন না। আইন হচ্ছে, হিন্দুরা নথি দেখাতে না পারলেও তাঁদের কোনো অসুবিধে হবে না। তাহলে দাঁড়াল, মূলত নথিহীন মুসলিমদের খুঁজে বের করা হবে। নথির ব্যাপারে একটা শ্লেষাত্মক কথা এর মধ্যেই বলা হয়েছে, কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁর লেখাপড়াসংক্রান্ত নথি খুঁজে না পান, তাহলে এই লাখো দরিদ্র মানুষের কাছে পুরনো নথি দাবি করা কতটা যুক্তিসঙ্গত? যদিও সে কথায় কান দেওয়ার লোক এখন আর তেমন নেই।

যদি দেশের এক কোটি মুসলমানকে চিহ্নিত করা যায় এবং দাগিয়ে দাওয়া যায় বিদেশি বলে, তাহলেও কোনো দেশেই তাঁদের ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়, এক কোটি মানুষকে ডিটেনশন ক্যাম্পে রেখে বছরের পর বছর খাওয়ানোর মতো অর্থও কোনো সরকার বেশি দিন জোগাতে পারবে বলে মনে হয় না। কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই তাঁদের ভোটাধিকারসহ বিভিন্ন অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। এর ফলে যেটা হবে, এর সাংঘাতিক খারাপ প্রভাব পড়বে দেশের অন্য মুসলিমদের ওপর। এ ছাড়াও আরো এমন কিছু জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে যা আমরা আগাম আন্দাজই করতে পারছি না। সম্ভবত হিন্দুত্ববাদীরাও এর তাৎক্ষণিক সুবিধাজনক প্রতিক্রিয়া নিয়েই উল্লসিত, এর সুদূরপ্রসারী ফল নিয়ে ভাবছে না।

এই নাগরিকপঞ্জি তৈরি করায় দেশের বেশির ভাগ মানুষের সায় রয়েছে, তা ২০১৯-এর ভোটের ফলই বলে দিচ্ছে। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বড় অংশই এর পক্ষে। লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে এসে বিজেপি নেতারা প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছেন, তাঁরা ক্ষমতায় এলে সারা দেশে নাগরিকপঞ্জি করবেন। সব দেখে-শুনে আশঙ্কা হতেই পারে, উগ্র জাতীয়তাবাদের ওপর নির্ভর করে আমরা কি ক্রমেই 'সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিসত্তার গণতন্ত্র'র পথে এগিয়ে যাচ্ছি? নাগরিকপঞ্জি সম্ভবত তার পক্ষে একটা বড় ধাপ।

'সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিসত্তার গণতন্ত্র'র একটা বড় উদাহরণ ইসরায়েল। যেখানে মুসলিমরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। সেখানেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই এমন বৈষম্য দিব্যি চলছে। জনসমর্থন আছে বলেই তা চলছে।

সংবিধান অনুসারে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সমান। কিন্তু, সংবিধান মেনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই, আমাদের দেশে যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে, তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে মুসলিমদের। এটা কিন্তু চলছিল বহুদিন ধরেই। বিজেপি সরকার এটাকে ত্বরান্বিত করেছে, এবং সেটা গোপনে নয়। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, তাদের জনসমর্থন বেড়েছে। এই জনসমর্থন বৃদ্ধির পেছনে যে প্রধান দুটো বিষয় কাজ করেছে, তা হলো, প্রথম, দীর্ঘ প্রচারে বড় অংশ মানুষের মধ্যে হিন্দুত্ববাদীরা একটা ধারণা অনেকটাই গেঁথে দিতে সফল হয়েছে যে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না করে মুসলিমরা একদিন সংখ্যাগুরু হয়ে উঠবেন এই দেশে। বদলে যাবে ভারসাম্য এবং বিন্যাস। যদিও এই প্রচারের পেছনে সেন্সাস রিপোর্টের কোনো সমর্থন নেই। বরং উল্টো।

হিন্দু জনসংখ্যার মতোই মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারও কমছে। ২০০১ থেকে ২০১১, এই দুই জনগণনার বিচারে ১০ বছরে হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৯.৯ থেকে কমে হয়েছে ১৬.৭ শতাংশ। অর্থাৎ ৩ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ওই ১০ বছরে ২৯.৫ থেকে কমে হয়েছে ২৪.৬। অর্থাৎ ৫ শতাংশ কমেছে। ভারতের সব ধর্মের মানুষের বিচারেই মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন সব থেকে কম। এই হার থেকে বিশেষজ্ঞদের মত, আগামী ৩০ বছরের মধ্যে ভারতীয় মুসলিমদের মৃত্যুহার এবং জন্মহার সমান হয়ে যাবে। এই তথ্য সরকারি। যে কেউ সেন্সাস রিপোর্ট দেখে নিতে পারেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে দেশটা মুসলিমপ্রধান দেশ হয়ে যাবে এই ভ্রান্ত ধারণা বড় অংশ হিন্দুর মধ্যে বদ্ধমূল। হিন্দুত্ববাদীরা এই প্রচার প্রতিনিয়ত করেও থাকে সুকৌশলে।

দ্বিতীয় কারণ, হিন্দুদের বড় অংশ বিশ্বাস করেন, বিজেপি বাদে বাকি সব দল মুসলিম তোষণের রাজনীতি করে। এটাও তথ্য হিসেবে এক বিরাট ভুল। যদি তোষণ করা হতো, তাহলে মুসলিমরা সর্বক্ষেত্রে এতটা পিছিয়ে থাকতেন না। জনসংখ্যার শতাংশের বিচারে মুসলিমদের যতটুকু প্রাপ্য, তা তারা অতীতে কখনও পাননি। এখনও পান না। এই না-পাওয়াটা বেড়েই চলেছে।

পঞ্চাশের দশকে দেশে মুসলিম জনসংখ্যা যেখানে ছিল ১০ শতাংশ, তখন মুসলিম আইপিএসের সংখ্যা ছিল ৫ শতাংশের নিচে। ২০১১র সেন্সাস অনুসারে দেশে মুসলিম জনসংখ্যা ১৪ শতাংশ। ২০১৬ সালের হিসেব বলছে, দেশে মুসলিম আইপিএস ৩ শতাংশের নিচে। জম্মু-কাশ্মীরকে বাদ দিয়ে ধরলে ২.৫ শতাংশ। রাজ্য সরকারের পুলিশের চাকরিতে পরীক্ষা দিয়ে যে অফিসারেরা পদোন্নতির জেরে আইপিএসের পদমর্যাদা পান, সেখানেও দেখা যাচ্ছে, এমন আইপিএসদের ৭ শতাংশ মুসলিম ছিলেন ২০০৬ সালে, ২০১৬ সালে সংখ্যাটা কমে হয়েছে ৩.৮ শতাংশ।

জনসংখ্যার বিচারে মুসলিমরা ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ, কিন্তু কারাগারে মোট বিচারাধীন বন্দিদের ২১ শতাংশ মুসলিম। যদিও সারা দেশে যত অপরাধীকে আদালত শাস্তি দিচ্ছে তার ১৫.৮ শতাংশ মুসলিম। এই সংখ্যাটা মুসলিম জনসংখ্যার শতাংশের কাছাকাছি। এর থেকে বলাই যায়, ভারতীয় বিচার ব্যবস্থায় মুসলিমরা সুবিচার পাচ্ছেন। এটা একটা বিরাট বড় আস্থা এবং ভরসার জায়গা।

১৯৫৩ সালে ভারতীয় সেনায় মুসলমান কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ২ শতাংশ। ১৯৯৯ সালের তথ্য, কর্নেল বা তার ওপরের পদে মুসলমান কর্মকর্তার সংখ্যা ১ শতাংশ। বাজপেয়ি সরকারের আমলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজের একটি বিবৃতি পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে তিনি বলছেন, সেনায় উঁচু পদে মুসলিমরা কাম্য নন, ঠিক বা ভুল যাই হোক,  কারণ বেশির ভাগ ভারতীয় এর বিরোধী। ১৯৮৫ সালে এ নিয়ে একটি সমীক্ষাও হয়, তাতেও ভারতীয় হিন্দুদের থেকেও এই মতই উঠে আসে। তবে নিচুতলায় সামরিক বাহিনীতে মুসলিমদের উপস্থিতি তুলনায় ভালো। ২০০০ সালের হিসেব, সংখ্যাটা ২.৫ শতাংশ। নেভিতে ৩.২ এবং এয়ারফোর্সে ২.১। মুসলিম আইএএস ২০০৬ সালে ছিলেন ৩ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৩.৩ শতাংশ। যা জনসংখ্যার বিচারে খুবই নগণ্য।

প্রশাসনে যেমন মুসলিমদের উপস্থিতি কমছে, তেমনই কমছে রাজনীতিতেও। ১৯৮০ থেকে ২০১৪, এই সময়ে নির্বাচিত মুসলিম সাংসদের সংখ্যা কমে অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। ১৯৮০ সাল। তখন ভারতের জনসংখ্যার ১১.৪ শতাংশ ছিল মুসলিম, মোট সাংসদ ৫৪২, মুসলিম সাংসদ ৪৯, অর্থাৎ ৯ শতাংশ। ২০১৪ সাল। মুসলিম জনসংখ্যা ১৪.২ শতাংশ, মোট সাংসদ ৫৪৩, মুসলিম সাংসদ ২০, অর্থাৎ ৩.৭ শতাংশ। কেন কমছে মুসলিম সাংসদ? প্রধান কারণ, জনসংখ্যার বিচারে মুসলিম রাজনীতিকদের যে ক'টি আসন প্রাপ্য হতে পারত, তার থেকে অনেক কম আসন মুসলিমদের জন্য ছাড়ে রাজনৈতিক দলগুলো। এমনকি দেখা গিয়েছে, নিশ্চিত আসনও মুসলিমদের তুলনায় কম ছাড়া হয়।

ব্যতিক্রম কিছুটা বামপন্থীরা এবং তৃণমূল কংগ্রেস, আরজেডিসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দল। তৃণমূল কংগ্রেসের মুসলিম প্রার্থী এবং মহিলা প্রার্থী প্রায় সব সময়ই অন্য অনেক দলের থেকে তুলনায় বেশি। এটা তোষণ নয়, সুবিচারের চেষ্টা। অথচ ২০১৯-এর ভোটের ফল দেখলে এটা পরিষ্কার, যে দলই এই সুবিচারের পথে হাঁটার চেষ্টা করেছে, হিন্দু ভোটারদের একটা বড় অংশ সরে গিয়েছেন তাদের থেকে। জনসংখ্যা বিচার করে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর চেষ্টা কংগ্রেসও কখনও করেনি। তার কারণ হিন্দু ভোটারকে খুশি করা। ২০১৪ তে কংগ্রেস ৫.৬ শতাংশ আসন মুসলিম প্রার্থীদের জন্য ছেড়েছিল। আর বিজেপি ছেড়েছিল ১.৬ শতাংশ আসন। সিপিএম ১৫ শতাংশ, তৃণমূল ১৬ শতাংশ। সমাজবাদী পার্টি ১৮.৪ শতাংশ, আরজেডি ২০.৭ শতাংশ।

বেসরকারি চাকরি, সরকারি চাকরি, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায়ও মুসলিমদের খুঁজতে হয় দূরবীন দিয়ে। উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ তো ছেড়েই দিলাম, পশ্চিমবঙ্গের মতো 'প্রগতিশীল’ বাম জমানায় কোনো মুসলিম মেয়র হননি, কোনো মুসলিম পুলিশ কমিশনার বা হোম সেক্রেটারি, চিফ সেক্রেটারি হননি। হননি তার কারণ, সংখ্যাগুরু ভোটারদের মুখ চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এই কাজ করতে সাহস পায় না। প্রয়াত আইপিএস এইচ এ সফি অবসরের পর একদিন দুঃখ করে আমাকে বলেছিলেন, 'পুলিশ কমিশনারের পদ আমার প্রাপ্য ছিল, আমি মুসলমান বলে আমাকে করা হয়নি'। তাহলে তোষণটা হলো কোথায়! হিন্দুত্ববাদীদের এটাই সাফল্য যে তারা এই তোষণের ভুল ধারণা বেশির ভাগ হিন্দুর মনের গভীরে গেঁথে দিতে সফল হয়েছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতের ওপর দাঁড়িয়ে বিজেপি আজ সারা দেশে নাগরিকপঞ্জির কথা বলছে। এর ফলে তাদের পক্ষে হিন্দু ভোট আরো মজবুত হবে। আগামী বেশ কয়েকটা নির্বাচন মনে হয় এর ওপরেই হবে। বিরোধীরা কি পারবে এই কঠিন যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়াতে?

(সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। লেখক : শুভাশিস মৈত্র, প্রবীণ সাংবাদিক।)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা