kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

কাশ্মীরের দুঃখগাঁথা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ আগস্ট, ২০১৯ ২১:২৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কাশ্মীরের দুঃখগাঁথা

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বাসিন্দারা দুই সপ্তাহ ধরে অবরোধ, কারফিউ এবং সব রকম যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়াই বসবাস করছে। ডয়চে ভেলে'র প্রতিবেদক রিফাত ফরিদ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সেই কাশ্মীরের শ্রীনগরের মানুষের জীবনের গল্প বলেছেন।

তিনি বলেন, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সবচেয়ে বড় শহর শ্রীনগরে সব কিছু নিশ্চুপ হয়ে যাওয়ার সময় চলতি বছরের ৫ আগস্ট রাত দেড়টা নাগাদ। ফোন সংযোগ এবং ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রাস্তাঘাটও সুনসান হয়ে পড়ে।

সোমবার ভোরবেলা রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শহর জুড়ে আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়। শ্রীনগর তালাবন্ধ হয়ে পড়ে। আমি সাত বছর ধরে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছি। কিন্তু এসব ঘটনা জানাজানি হতেই সেখানে অপ্রতিরোধ্য এক ধরনের আঘাত পাওয়া যায় ।

সকাল ৭টায় যখন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। তখনো স্পষ্ট হয়নি কী হতে যাচ্ছে? কেন শহরটি অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, তা নিশ্চিত করার কোনো উপায় ছিল না।

কিছু চেকপয়েন্টের প্রহরীরা আমাকে পাশ কাটিয়ে যেতে দেয়। তবে অন্যদের দিকে আমাকে ফিরে যেতে বলা হয়। চেকপয়েন্টে যেখানে আমাকে ঘুরে আসতে বলা হয়েছিল, সাংবাদিক হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়ে ভুল হয়েছে, তাই সেটা করা বন্ধ করে দিয়েছি।

আমি ঠিক করেছি, কোনো কিছু ঘটছে কিনা সেটা পরীক্ষা করার জন্য বড় ট্রমা কেয়ার হাসপাতালে যাব। দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম। রোগীদের ভিড় ছিল না, ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। কিন্তু তখনো বিভ্রান্তি কাটেনি। মানুষ বুঝতে পারছিল না কী হচ্ছে।

আমার অফিসে পৌঁছার সময় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সাত দশকের পুরনো অনুচ্ছেদ ৩৭০ ধারা বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন, যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে অর্ধস্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিল।

এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর ভারত সরকার চিন্তিত ছিল যে, বিক্ষোভ আর বিক্ষোভে ভেসে যাবে। এর আগে ২০০৮, ২০১০ এবং ২০১৬ সালে যা ঘটেছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে কয়েক হাজার পর্যটক ও হিন্দু তীর্থযাত্রীকে সরিয়ে নিয়ে যায়। শ্রীনগরে কারফিউ জারি হয়, মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ভারত সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কাশ্মীরিদের মধ্যে ভীতি প্রকাশ করে যে, এই অঞ্চলের ডেমোগ্রাফি পরিবর্তনের প্রধান প্রচেষ্টা অনুসরণ করা হবে। ভারতশাসিত কাশ্মীর ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল।

শ্রীনগর কার্যত নিরব আর সেখানে ফোনের লাইন এবং ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বসবাসকারী মানুষ পৃথিবী থেকে এবং একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তারা বন্ধু ও আত্মীয়দের খবরের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করে।

শ্রীনগরের আমার বাড়িতে আমার বাবা ও মা প্রথম দিনের অবরোধের সময় আগে থেকেই চাপ অনুভব করছিলেন। আমরা প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় করেছিলাম, কিন্তু তারা চিন্তিত ছিল যদি কিছু হারিয়ে যায়। ওষুধ, খাবার ও দুধ চেক করে নেন তারা। প্রথম রাতে একেবারে চুপচাপ ছিল শহর।

পরের দিন ৭ আগস্ট ঠিক করলাম আবার বেরিয়ে যাব শহর দেখতে। সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় সংবাদ মাধ্যমে খবর পাঠানোর উপায় ছিল না।

আমাকে আবার রাস্তায় থামিয়ে প্রশ্ন করা হয়, আপনি কোথায় যেতে চান? আমি সতর্কতার সঙ্গে উত্তর দিতাম। তারপর আধা-সামরিক সেনারা সিদ্ধান্ত নেয়।

শ্রীনগরে প্রতি কয়েকশ মিটারে আটকে দেওয়া হচ্ছিল। শ্রীনগরের ঐতিহাসিক চত্বর লাল চক, যেখানে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরু কাশ্মীরি নাগরিকদের বাড়তি সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেখানেই সিলমোহর পড়ে যায়।

চারিদিকে নড়াচড়া ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আর জরুরি অবস্থায় জরুরি নম্বর ফোন বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় ছিল না। আমি মহারাজা হরি সিং হাসপাতালের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি।

সড়ক দুর্ঘটনায় জখম এক যুবককে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন ছিল। তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা ছাড়া উপায় ছিল না।

অ্যাম্বুল্যান্স চালক জানান, ওই ব্যক্তি তার বাইক চালানোর সময় ট্রাকের ধাক্কায় জখম হয়েছেন। আর কেউ তাকে রাস্তার পাশ থেকে তুলে নিয়ে যায়নি ।

আমি আবেগপ্রবণ হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে এলাম। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে এক নারী বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি আমার কাঁধের ওপর হাত রেখে বললেন, তোমার হৃদয় আমার মতো দুর্বল মনে হচ্ছে।

আমার ৯ বছরের ভাইঝি এবং আমার দুই বোন। তাদের বয়স ৩ ও ৫ বছর। কোনো নতুন জামাকাপড় পরার ছিল না। আমরা বাড়িতে কোনো সুস্বাদু খাবার রান্নার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। বাচ্চারা একটা বাগানে বেড়াতে গিয়ে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের অনুমতি ছিল না বলে আফসোসের অন্ত ছিল না তাদের।

কাশ্মীরে অবরোধ শুরু হলে গত ৫ আগস্ট থেকে বহু দিন পেরিয়ে গেছে। মানুষের হিসেব হারিয়েছে দিনগুলো। নিশ্চয় অনেকেই আর স্মরণ করে না কোনো দিনকে। এটা এখন কোনো পার্থক্য তৈরি করে না।

প্রতিদিন এখন কাশ্মীরে একই রকম দেখতে; একই অবরোধ, একই অবস্থা। আমাদের কোনো ইন্টারনেট নেই, ফোনও নেই, আর কোনো উপায় নেই বন্ধু ও আত্মীয়দের ফোন করার। মৃত্যু আর শোক জানার উপায় নেই। আনন্দ-সুখের মুহূর্তগুলো জানানোর এবং জানার উপায় নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা