kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

ফুলল না 'ও' রিঙ, উড়ল না চন্দ্রযান-২

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৫ জুলাই, ২০১৯ ১৫:৫১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফুলল না 'ও' রিঙ, উড়ল না চন্দ্রযান-২

ভারতের চন্দ্রযান-২

সোমবার ভোররাতে আচমকা স্থগিত হয়ে গেছে ভারতের দ্বিতীয় চন্দ্রাভিযান। কিন্তু এতো তোড়জোড় এবং প্রস্তুতির পরেও কেন এ ঘটনা ঘটল? কার গাফিলতি ছিল? গলদ কিংবা ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল কোথায়?এ নিয়ে বিশ্বজুড়েই জল্পনা শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন, রকেটে জ্বালানি ভরার সময় কোনও বিপত্তি ঘটেছে। কেউবা বলছেন, উৎক্ষেপণের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী ও সর্বাধুনিক জিএসএলভি মার্ক থ্রি রকেটকে খুব ভালভাবে পরীক্ষা করে নেওয়া হয়নি।

ভারতীয় মহাকাশ সংস্থা ইসরোর সূত্রে জানা গেছে, সরষের মধ্যে ভূতটা ছিল। সমস্যা ছিল রকেটের 'ও' রিং-এ। জ্বালানি ভরার সময় সেই 'ও' রিং ঠিকমতো ফুলে ফেঁপে উঠতে পারেনি বলে রকেটে ভরা জ্বালানি লিক হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। এর ফলে ভয়াবহ দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়।

এই 'ও' রিং কী? জিএসএলভি রকেটের আকার একটি ১৪ তলার বাড়ির সমান। তার একেবারে নীচে থাকে বড় একটি সলিড প্রপেল্যান্ট চেম্বার, যা ভরা থাকে জ্বালানিতে। সেই চেম্বারের চারপাশ থেকে কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো চারটি পা বেরিয়ে মাটির সঙ্গে লাগানো থাকে। এই পাগুলোকে বলা হয় সলিড প্রপেল্যান্ট বুস্টার। এই সলিড প্রপেল্যান্ট চেম্বারের ওপর থেকে পরপর বসানো থাকে তরল জ্বালানি ভরার জন্য দুটি চেম্বার। এই চেম্বারগুলোর নাম লিকুইড প্রপেল্যান্ট চেম্বার। এ দুটি চেম্বারের মধ্যে একটিতে থাকে তরল হাইড্রোজেন গ্যাস। অন্যটিতে থাকে তরল অক্সিজেন গ্যাস। রকেট উৎক্ষেপণের সময় একেবারে নীচের সলিড প্রপেল্যান্ট চেম্বারে থাকা জ্বালানিতে যখনই অগ্নিসংযোগ করা হয়, সঙ্গে সঙ্গে তা প্রচণ্ড একটা চাপের সৃষ্টি করে, সেই চাপের ফলে ওপরে লিকুইড প্রপেল্যান্ট চেম্বার অসম্ভব জোরে নড়তে শুরু করে। সেই প্রচণ্ড চাপ আর কম্পনে দুই লিকুইড চেম্বারের মধ্যে রাখা গ্যাস (হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন) পানি তৈরি করে।

এখানে আরও একটি ঘটনা ঘটে। নীচের সলিড প্রপেল্যান্ট চেম্বারে যেহেতু অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল, সেই তাপে ওপরের লিকুইড প্রপেল্যান্ট চেম্বারের মধ্যের পানি বাষ্পে পরিণত হতে শুরু করে। পানি ক্রমাগত বাষ্পে পরিণত হলে চেম্বারের চাপ ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। সেই চাপে বাষ্প যাতে বাইরে বেরিয়ে আসতে না পারে সেজন্য দুই চেম্বারের মাঝে লাগানো থাকে ওই 'ও' রিং। এখানে প্রয়োগ করা হয় অনেকটা প্রেসার কুকারের নীতি। ঠিক যেমন বাষ্পের লিক আটকাতে প্রেসার কুকারের ঢাকনার চারপাশে রাবারের রিং আটকানো থাকে। যাতে ঢাকনার চারপাশ দিয়ে বাষ্প লিক না করে। ঠিক সে রকমই বাষ্পের লিক রুখতে জিএসএলভি-র ওই দুই চেম্বারের মাঝে রাবারের 'ও' রিং লাগানো থাকে। যাতে তাপে রাবার ফুলে উঠে জায়গাটা আরও ব্লক করে দেয়। আর একটা নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে প্রচণ্ড চাপে ওই বাষ্প বেরিয়ে আসে এবং রকেটকে ওপরের দিকে ঠেলে তুলে দিতে সাহায্য করে।

ইসরো সূত্রে জানা গেছে, এখানেই সমস্যা হয়েছিল। সলিড প্রপেল্যান্ট চেম্বারে অগ্নিসংযোগ করার পর নিয়ম মেনে ওপরের লিকুইড প্রপেল্যান্ট চেম্বারে পানি বাষ্পে পরিণত হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু চারপাশে লাগানো 'ও' রিং প্রসারিত না হওয়ার ফলে দুই চেম্বারের মাঝ থেকে লিক করতে থাকে বাষ্প।

রকেট যতই ওপরের দিকে উঠকে থাকে, ততই নীচের সলিড প্রপেল্যান্ট চেম্বারে সব জ্বালানি শেষ হয়ে গিয়ে তার চারটি বুস্টারের খোল রকেট থেকে সমুদ্রের মধ্যে খসে পড়ে। রকেট যখন পৃথিবী থেকে ৪০ হাজার কিমি ওপরে চলে যায় তখন দুটি লিকুইডের একটির তরল জ্বালানি শেষ হয়ে গিয়ে সেই খোলটিও সমুদ্রে খসে পড়ে। বাকি একটি তরল জ্বালানির প্রপেল্যান্ট চেম্বারকে সঙ্গে নিয়ে কোনও মহাকাশ যানকে পিঠে চাপিয়ে রকেট তার গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। তার মানে-এক্ষেত্রে চন্দ্রযান-২ চাঁদের কক্ষপথে ঢুকে পড়ার আগে পর্যন্ত ওই জিএসএলভি মার্ক–থ্রি রকেটের তরল জ্বালানি ভরা শেষ প্রপেল্যান্ট চেম্বারটি রকেটের সঙ্গেই থাকবে। যখনই চাঁদের অভিকর্ষ বলের টানে তার কক্ষপথে ঢুকে পড়বে চন্দ্রযান-২, রকেট থেকে বেরিয়ে তরল জ্বালানি ভরা শেষ প্রপেল্যান্ট চেম্বার-সহ রকেটের বাকি খোলটিও মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়বে।

এদিকে, কলকাতা ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্স (আইসিএসটি) কর্মকর্তা বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপ চক্রবর্তী বলছেন, আমার কাছে যতদূর খবর রয়েছে, ওই 'ও' রিং-এর সমস্যার জন্যই চন্দ্রযান ২-এর যাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে জানুয়ারি মাসেও ল্যান্ডারের একটি পা ভেঙে যাওয়ায় চন্দ্রযান ২-এর ইসরোর উৎক্ষেপণ পিছিয়ে দিয়েছিল ইসরো। তারপর ল্যান্ডারের ওজন বাড়িয়ে প্রায় দেড় টন করা হয়। এর ফলে ওই ল্যান্ডারকে পিঠে চাপিয়ে রওনা করানোর জন্যে জিএসএলভি মার্ক ২ রকেটের বদলে এবার আরও শক্তিশালী জিএসএলভি মার্ক-থ্রি রকেটকে বেছে নেওয়া হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৬ সালে এই 'ও' রিং কাজ করেনি বলেই উৎক্ষেপণের এক মিনিট ২৯ সেকেন্ড-এর মধ্যেই সাত মহাকাশচারীকে নিয়ে ভেঙে পড়েছিল চ্যালেঞ্জার মহাকাশযান। তখন ফ্লোরিডায় অসম্ভব ঠাণ্ডায় জমে গিয়েছিল ওই 'ও' রিং। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান এ বিষয়ে তদন্ত করেছিলেন। 

সূত্র : আনন্দবাজার 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা