kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নেই‚ অথচ এই নারীর হাতে ট্রেনের যাত্রী সুরক্ষার দায়িত্ব

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৬ জুন, ২০১৯ ১৭:৩৫ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নেই‚ অথচ এই নারীর হাতে ট্রেনের যাত্রী সুরক্ষার দায়িত্ব

কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা করা নেই প্রীতিলতা মণ্ডলের। কিন্তু বিশেষ এক ক্ষমতা রয়েছে তার। ট্রেনের রেকের আন্ডারক্যারেজে কোনো যন্ত্রাংশ বিকল হয়ে গেলে তাতে কী সমস্যা হয়েছে, সেটা বলে দিতে পারেন অনায়াসে। 

যখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ব্যর্থ হন কী কারণে যন্ত্র বিকল হয়ে গেছে সেটা খুঁজে বের করতে, তারা স্মরণাপন্ন হন প্রীতিলতার। প্রীতিলতা বলেন আর তারা শোনেন। জানা গেছে, ওই নারী সাধারণ একজন মেকানিক। ভারতের দক্ষিণ পূর্ব রেলের সাঁতরাগাছি নতুন কম্পোজিট গ্রিড কোচিং রক্ষণাবেক্ষণ ডিপোতে আছেন। 

হাওড়া চেন্নাই করমণ্ডল এক্সপ্রেস এবং হাওড়া বেঙ্গালোর যশবন্তপুর এক্সপ্রেসের ভারপ্রাপ্ত মিস্ত্রি তিনি। তার দৃষ্টি খুব তীক্ষ্ণ, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ত্রুটিগুলো আর কারো চোখে না পড়লেও তার চোখে ঠিক পড়বেই। 

সিপিআরও, এসইআর সঞ্জয় ঘোষ জানান, ‘রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। তারা জানিয়েছেন প্রীতিলতার ওপর তাদের অপার নির্ভরশীলতার কথা। প্রীতিলতা যদি ট্রেনের যন্ত্রাংশ সংক্রান্ত কোনো ত্রুটি বা সমস্যার কথা বলেন, তাহলে সবটা আবার দেখে নেওয়া হয়। বেশিরভাগ সময় সত্যিই কোনো না কোনো গলদ ধরা পড়ে। 

তিনি আরো বলেন, খুব সূক্ষ্ম ফাটল বা ছিদ্র যা মানুষের চোখে পড়ার মতো নয়, সেটারও খোঁজ পাওয়া যায়। প্রীতিলতার পরামর্শ অনুসারে দূরগামী ট্রেনগুলোকে যথাযথভাবে পরীক্ষা করে তবেই ছাড়া হয়।

তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, প্রীতিলতা প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন, রেকের নীচে পিটলাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করে যাওয়া, স্ক্রু টাইট করা, ক্লিপ চেক করা, জায়গা মতো হাতুরির ঘা মেরে সব ঠিকঠাক করা, এই সব কিছুতেই তাকে ছাড়া চলে না বললেই চলে। 

রেলে চাকরি করা বা আদৌ চাকরি করার কোনো ইচ্ছা ছিল না প্রীতিলতার। স্টেশন মাস্টার স্বামীর সঙ্গে তিনি সাতরাগাছিতে বসবাস করতেন। এক বছরের মেয়ে নিয়ে এই দম্পতি বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু স্বামীর অকালমৃত্যু পালটে দিল প্রীতিলতার জীবন। সাঁকরাইল স্টেশনে ডিউটি করার সময় হারনেসে মৃত্যু হয় তার স্বামীর। 

চাকরিটা পেয়ে যান প্রীতিলতা। অফিসে অন্য কোথাও কোনো পদ ফাঁকা না থাকায় বাধ্য হয়ে ফিল্ড পোস্টিংয়ে যেতে হয় তাকে। ইচ্ছা না থাকলেও সংসার চালানোর জন্য এইরকম কাজ করতে বাধ্য হন চাকরি টিকিয়ে রাখতে। 

তিনি বলেন, শুরুর দিকে তো একেবারেই অসহ্য লাগত। আমাকে কাজ করতে হতো দম বন্ধ হয়ে আসে এমন ঘুটঘুটে অন্ধকার সরু, চাপা একটা জায়গায়। পুরো ক্রিউতে আমিই একমাত্র নারী। কিন্তু আমার তো উপায় ছিল না কোনো। মেয়েটা ছোট। ওকে মানুষ করতে হবে। আমি সুপারভাইজারকে অনুসরণ করতাম তিনি যখন নানা জিনিস, যন্ত্রাংশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখতেন। কেমন করে ভুল ত্রুটির জায়গাগুলোতে চক দিয়ে দাগিয়ে দিতেন, সবটাই খুব মন দিয়ে দেখতাম। আমার কাজ ছিল ত্রুটিগুলোকে সারাই করে চকের দাগ গুলো মুছে দেওয়া। ধীরে ধীরে আমি কাজ শিখে ফেলি। 

তিনি আরো বলেন, এখন এক ঝলক দেখা মাত্রই বুঝে যাই কোথাও কোনো গলদ আছে কিনা। আমি নিজেই চেষ্টা করি ঠিক করতে আর না পারলে বড় অফিসার কাউকে ডাকি। এসি কোচের দায়িত্বে রয়েছি আমি। ব্রেক ব্লকগুলো বদল করতে হয়, অ্যালার্ম চেইন পরীক্ষা করা ইত্যাদি আরো নানা দিক আমাকে দেখতে হয়। এখন কাজটা করতে ভালোই লাগে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা