kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

মৃত নদীকে বাঁচিয়ে তুললেন ২০ হাজার নারী!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৬ জুন, ২০১৯ ১৪:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মৃত নদীকে বাঁচিয়ে তুললেন ২০ হাজার নারী!

নদী প্রকল্পে কাজ করছেন নারীরা

তীব্র পানি সঙ্কট ভারতে। এটি দেশটির অন্যতম একটি প্রধান সমস্যা। দেশটিতে এর ফলে প্রতিবছর জন-বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটে। কিন্তু ব্যতিক্রম দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তামিলনাড়ু রাজ্যের নারীরা। এই রাজ্যের ভেলোর জেলার ২০ হাজার নারী  একটি মৃতপ্রায় নদীকে প্রাণ দিয়েছেন। তারা এ জন্য দীর্ঘ চার বছর নিরলস পরিশ্রম করেছেন। 

তামিলনাড়ু একটি খরাপ্রবণ রাজ্য। এ রাজ্যের ২৪টি জেলার মধ্যে ভেলোর অন্যতম। এই জেলার একমাত্র নদী নাগানধি। নদীটি ভেলোরের মানুষদের কাছে বেঁচে থাকার এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় পানির উৎস ছিল। ১৫ বছর আগেই নদীটি শুকাতে শুকাতে মৃতপ্রায় হয়ে যায়। এ কারণে স্থানীয় লোকেরা তীব্র পানি সংকটে বেঁচে থাকতে নিজেদের ধানি জমি খুঁড়তে শুরু করেন। 

এদিকে দক্ষিণ ভারতের উত্তরাখণ্ডের পউরি গাড়ওয়ালে থেকে শত মাইল দূরে ভারতের উত্তর দিকেও একই দৃশ্য চোখে পড়বে। সেখানে প্রায় ১০০ জন গ্রামবাসী ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়েই নানা মাপের রিজার্ভার তৈরি করতে পরিশ্রম করে চলেছেন। এমনকি তারা নিজেরা স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে শুরু করেছেন, যাতে বর্ষার পানি ধরে রাখা যায় এবং সকলেই জলের সমস্যা থেকে দূরে থাকতে পারেন। 

পানি সংকটের কারণে উত্তর ভারত এবং দক্ষিণ ভারত বারবার খবরে আসে তাদের। সেখানকার কিছু জায়গায় এখনো কি পরিমাণ পানির সমস্যা রয়েছে এবং কি করে সেখানকার মানুষরা দিন কাটান তা সারাবিশ্বের সামনে উঠে আসে এই ঘটনাগুলোর মাধ্যমে। আর এই একটি স্থানে পানি বাঁচানোর প্রচেষ্টাগুলোই তখন বাকিদের কাছে নিদর্শিত পাথেয় হয়ে থাকে। 

২০ হাজার নারীর ৪ বছরের একান্ত প্রচেষ্টায় নাগানধি নদীকে ২০১৮ সালে আবারও স্রোতস্বিনী করে তোলা হয়েছে। ৩৫০০ কুয়ার পানি এবং প্রচুর নুড়ি পাথর ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে বর্ষার পানি অগভীর খাতেও বয়ে চলতে পারে এবং নদীটি বহমান থাকে।

এ বিষয়ে 'নাগানধি বাঁচাও' প্রকল্পের ডিরেক্টর চন্দ্রশেখরণ কুপ্পান বলেন, কোনো নদীকে পুনরায় বাঁচিয়ে তোলার জন্য শুধু তার বহমানতার দিকে নজর দিতে হয়, বিষয়টা এরকম নয়।  নদীর গভীরতাও যাতে ঠিক থাকে সেদিকেও নজর দিতে হয়। এক্ষেত্রে বৃষ্টির পানিও যাতে মাটি শুষে নিয়ে জমিয়ে রাখে সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই বৃষ্টি হলে সেটা এ জাতীয় নদীর ক্ষেত্রে খুব কাজে দেয়।

২০১৪ সালে শুরু করা এই প্রকল্পটির সাফল্য আসে ২০১৮ সালে। নদী বাঁচানোর এই প্রকল্পটির নাম 'নাগানিধি রিজুভেন্যাশন প্রজেক্ট, অ্যান আর্ট অব লিভিং ফাউন্ডেশন ইনিশিয়েটিভ(এওএল)'।

বিগত দশ বছরের হিসেব অনুসারে, ভেলোরের অর্ধেকের বেশি কৃষক পানির অভাবে গ্রাম ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে গেছেন। কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে চাষের জন্য পানি পাননি। আর যারা রয়ে গেছেন, তারা তাদের পরিবারের সাথে কোনোক্রমে এদিক ওদিক টুকটাক কাজ করে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়েছেন। আর এ সময়েই এওএল নামক সংস্থাটির স্বেস্চ্ছাসেবকরা এসে তাদের পাশে দাঁড়ান। এর আগে সংস্থাটি কর্ণাটকের বেদবতী এবং কুমুদবতী নদীকেও পুনরায় নাব্যতা ফিরিয়ে দিয়েছিল ।

শুরুতে কাজটা খুব একটা সহজ ছিল না। সংস্থাটি প্রথমেই একটি দল তৈরি করে নেয়। এরপর  দলের সদস্যরা প্রথমে স্যাটেলাইট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে এলাকার ভূতত্ত্ব বিচার করে, জমি পরীক্ষা করে, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মেপে কাজ করতে শুরু করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে কাজের অনুমতি দেয়ার পরে  মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গারান্টি অ্যাক্টে (এমজিএনআরইজিএ) স্থানীয় নারীদের কাজ করানো শুরু হয়। এতে সেই নারীদের দৈনিক আয়ের উপায়ও হয়ে যায় সহজেই।

এই প্রকল্পে কর্মরত ৩২ বছরের নাথিয়া দড়ি বেয়ে বেয়ে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। 

তিনি জানান, ভেলোরের কান্যায়মবাদি ব্লকের সালামানাথাম গ্রামে প্রায় ৩৬ টা কুয়া খুঁড়েছেন তিনি, যেগুলো বৃষ্টির পানিতে ভরে উঠেছে। একবার সাফল্য আসায় তিনি বুঝে ছিলেন, এবার গ্রামে ফসলও ফলানো যাবে। এক একটি কুয়া প্রায় ২০ ফুট গভীর, ১৫ ফুট লম্বা এবং ৬ ফুট চওড়া। এগুলো খুঁড়ে তৈরি করতে প্রায় ২৩ দিন লেগেছে ১০ জন শ্রমিকের।

নাথিয়া বলেন, এখন আমাদের জমিতেই ধান ফলাতে পারব আমরা। বিষয়টা কয়েকদিন আগেও আমরা কল্পনা করতে পারতাম না। আমরা যদি এমজিএনআরইজিএ-তে স্বাক্ষর করি তবে প্রতিদিন আমাদের আয়ও হবে ২২৪ টাকা করে। 

এসব শুনে ভেলোরের কালেক্টর এস এ রামান বলছেন, এই প্রকল্পের সাফল্য তাদের উৎসাহ দিচ্ছে।

এদিকে উত্তর ভারতের পউরি গাড়ওয়ালের ১৩ বছরের ছাত্রী দীপা রাওয়াত এবং তার বন্ধু স্কুল শেষে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য রিজার্ভার তৈরি করতে মাটি খুঁড়ছেন। সেখানকার সরকারি স্কুলগুলো প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীকেই এ কাজে উৎসাহ দেয়। বলা হয়, এক একটি রিজার্ভার যাতে অন্তত ২ ফুট গভীর হয় সেদিকে নজর দিতে।

এ বিষয়ে পোখরার ব্লকপ্রধান সুরিন্দর সিং রাওয়াত বলেন, এখনই হিমালয়ের কাছে থাকা গ্রামগুলোর মানুষদের সচেতন হওয়া খুব জরুরি। যাতে ভবিষ্যতের জন্য তারা পানি সঞ্চয় করে রাখতে পারেন। তা না করলে সমস্যা যে বাড়বে তাতে সন্দেহ নেই।  এখানকার গ্রামগুলোতে পানি দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে, পানির উৎসও বেশ কম।  ফলে দিন দিন পানি যত কমবে এই এলাকা থেকে লোকজন চলে যাবেন।  তাই গণ জাগরণ ছাড়া এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে মুক্তির কোনো আশা নেই।

সূত্র : দ্য ওয়াল

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা