kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

যে ১০টি কারণে অপ্রতিরোধ্য চীন

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৫ জুন, ২০১৯ ১৫:৩৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যে ১০টি কারণে অপ্রতিরোধ্য চীন

চীনের শক্তিশালী অর্থনৈতিক উত্থান পশ্চিমা বিশ্বে আতঙ্কের মতো। চীন তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামরিক দিক দিয়েও উন্নতির প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। চীনের সামরিক সমৃদ্ধি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে তাকে ওয়াশিংটনের নিকট প্রতিদ্বন্দ্বিই বলা যেতে পারে। আর যদি চীন অর্থনীতি ও সামরিক দিক দিয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে তাহলে আগামী দিনে বিশ্বের এক নম্বর দেশ হবে চীন। দেখে নিন যে ১০টি কারণে অপ্রতিরোধ্য চীন।

মহাকাশ অভিযানে চীন:

চাঁদের যে অংশটি পৃথিবী থেকে কখনোই দেখা যায় না, সেই দূরবর্তী দিকে এই প্রথম একটি রোবট চালিত মহাকাশযান নামিয়েছে চীন। চীনের মহাকাশযান চাঙ-আ ৪ চন্দ্রপৃষ্ঠে সফলভাবে অবতরণ করেছে বলে দাবি করছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। এটিকে চীনের মহাকাশ কর্মসূচির জন্য এক বিরাট সাফল্য বলে মনে করা হচ্ছে। চীন তাদের মহাকাশ স্টেশন কর্মসূচি শুরু করেছে ২০১১ সালে। সেবছর তারা 'টিয়াংগং-ওয়ান' নামে একটি স্টেশন পাঠায়। টিয়াংগং মানে হচ্ছে 'স্বর্গের প্রাসাদ'। চীন মহাশূন্যে ঘুরতে থাকা কোন স্যাটেলাইট ক্ষেপনাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করে ২০০৭ সালে। তাদের আগে এই সক্ষমতা ছিল কেবল যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার। সাইবার স্পেসে তথ্যের গোপনীয়তা এবং সুরক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে চীন ২০১৬ সালে এক বিরাট সাফল্য অর্জন করে।

চীনের ‘কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা’ বা ‌‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স:

প্রচলিত নানা প্রযুক্তির পাশাপাশি এবার আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা এআইয়ের বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে বেইজিং। দেশটির প্রায় ২০টি প্রদেশের উৎপাদনশীল কারখানাগুলোতে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু হয়েছে। প্রকাশ করা হয়েছে নীতিমালাও। গত বছর এআইয়ের ওপর ভিত্তি করে ১৫০০ নতুন কারখানা যাত্রা শুরু করেছে। গত বছর ১০ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয়েছে এ শিল্পে। যা ২০২১ এ সাড়ে ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। খরচ করা হচ্ছে গবেষণা ক্ষেত্রেও। ২০১৮ সালে ৩০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে শুধু গবেষণায়। যা ২০১৭ সালের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। এছাড়াও দুই বিলিয়ন ডলার খরচ করে নির্মাণ করছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স উন্নয়ন পার্ক।

সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন:

বিশ্বে জ্বালানি শক্তির রূপরেখা বদলে দিচ্ছে চীন। দেশটিতে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১৩০ গিগাওয়াট। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্পটিও দূরপ্রাচ্যের এ দেশটিতে অবস্থিত। চীনের টেনযার্ট মরুভূমির এ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১৫০০ মেগাওয়াট। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ সৌর প্যানেল চীনে তৈরি হয়।

কৃষি পণ্য উৎপাদনে চীন:

২০০০ সালের পর থেকে মানুষের প্রয়োজনীয় সবুজ পণ্য সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করেছে চীন। বর্তমানে বিশ্বের ২২ শতাংশ মানুষের উদরপূর্তি করছে চীনের কৃষি উৎপাদন। অথচ দেশটিতে কৃষি উৎপাদনে ব্যবহূত জমির পরিমাণ বিশ্বের মোট আবাদযোগ্য জমির ৭ শতাংশ। চাল, গম, আলু, টমেটো, জোয়ার, বাজরা, বাদাম, চা, বার্লি, তুলা, তেলবীজ, সয়াবিনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে শীর্ষস্থানে রয়েছে দেশটি।

চীনের জিডিপি গতি ধীর, কিন্তু এখনও উচ্চ:

চীনের প্রবৃদ্ধি ধীর গতিতে এগোচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে অনেক উচুতে অবস্থান করছে। চীনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বেড়ে দাঁড়িয়েছে শতকরা ৭.৪ শতাংশ। আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক গবেষক ডংডেং জানিয়েছেন, আগামী ৩০ বছরে প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ হলেই তা চীনের উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট। দেশটির স্থানীয় সরকারের উচিৎ ক্ষীণ দৃষ্টি বাদ দেওয়া এবং কেবলমাত্র প্রবৃদ্ধির হারের দিকে না তাকিয়ে থাকা। নতুবা চীনের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনেক ক্ষতি করে ফেলবে। অর্থনীতির পুনর্গঠন এবং শিল্প খাতের উন্নয়ন সাধন করা আমাদের করণীয় বিষয়ের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রবৃদ্ধির হার ৭.৪ শতাংশের অর্থ হল, এটি এখনও পরিমিত সীমার মধ্যেই রয়েছে।

বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে শীর্ষে চীন:

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা। গত বছর প্রায় ১২ লাখ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির মধ্য দিয়ে বিশ্ব বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে চালকের আসনে রয়েছে চীন। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব জ্বালানি নীতি কেন্দ্রের ‘অয়েল ২০১৯-অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ফোরকাস্ট টু ২০২৪’ শীর্ষক প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তেল বাজার ও শিল্প বিভাগের প্রধান নিল এটকিনসন এসব তথ্য উল্লেখ করেন। চীনের বিকল্প জ্বালানিসংশ্লিষ্ট নীতি বৈদ্যুতিক ট্রাক ও বাস খাতের সম্প্রসারণে সহায়তা করছে, বিশেষত শহরের বায়ুর মান নিয়ন্ত্রণে এ নীতি বেশ সহায়ক বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রবন্ধে। চীন বৈদ্যুতিক ট্যাক্সি ও সরবরাহ গাড়ি নির্মাণ করে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।

লিঙ্গ বৈষম্য কমাচ্ছে চীন:

উন্নয়ন করতে হলে সমানভাবে নারী ও পুরুষের ভুমিকা দরকার। আর তার জন্য দেশটি লিঙ্গ বৈষম্য কমানোর দিকে মনযোগ দিচ্ছে। তবে লিঙ্গ বৈষম্য কমাতে একটু ধীর গতিতে এগোচ্ছে তারা। ২০১৮ সালে এক জরিপে লিঙ্গ বৈষম্য কমানোর দিক থেকে ১০৩তম হয়েছে ১৪৯টি দেশের মধ্যে। তবে তারা চেষ্ঠা চালাচ্ছে লিঙ্গ বৈষম্য কামাতে। 

বিআরআইসি জোটের নেতৃত্বে: 

বিআরআইসি বা ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন এবং ভারত জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন। ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক্স ফোরাম ইনডেক্সের ২৮তম অবস্থানে রয়েছে চীন। দেশটি আইটি, গবেষণা খাতে বিনিয়োগ এবং উন্নয়নে বিআরআইসি জোটের সবচেয়ে উপরের স্থানে রয়েছে। সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানির পরেই চীনের অবস্থান রয়েছে আবিষ্কারের ক্ষেত্রে।

সামরিক খাতে চীন:

গত বছরের চেয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ বৃদ্ধি করে এ বছর প্রতিরক্ষা খাতে ১৭৭.৬১ বিলিয়ন ডলার বাজেট বরাদ্দ করেছে চীন। ২০১৮ সালে সামরিক খাতে বাজেট ছিল ১৭৫ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেটের তুলনায় এর পরিমাণ অন্তত তিনগুণ বেশি। এই হারে বৃদ্ধি চলতে থাকলে চীনের প্রতিরক্ষা বাজেট ২০০ বিলিয়নে গিয়ে ঠেকবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেটের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।

ট্যুরিজম উন্নয়নে চীন:

ট্যুরিজমের দিকে থেকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশ হবে চীন। ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনালের করা এক নতুন গবেষণায় বলছে, ছুটি কাটনোর জন্যে সব থেকে বেশি জনপ্রিয় দেশ হবে চীন। এই গবেষণা বলছে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তর্বর্তী এবং বহির্গামী পর্যটক গমনের হার বাড়বে চীনের বিভিন্ন অঞ্ঝলে। ২০৩০ সাল নাগাদ চীন বিশ্বের এক নম্বর পর্যটক ভ্রমণকারী দেশ হিসাবে ফ্রান্সকে ছাড়িয়ে যাবে। ২৬০ মিলিয়ন বহির্গামী ভ্রমণের সাথে বহির্গামী ভ্রমণের দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানিকেও ছাড়িয়ে যাবে তারা। ২০১৮ সালে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন পর্যটক ভ্রমণের রেকর্ড পাওয়া যায় চীনে। ২০২৩ সালের মধ্যে এটি ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন বৃদ্ধি পাবে। গবেষণা মতে, তাইওয়ান এবং হংকংসহ এশিয়ার দেশগুলো থেকে বিপুল পরিমাণে পর্যটক আসছে চীনে। আর সেই জন্যে চীন হতে যাচ্ছে বিশ্বের এক নম্বর পর্যটক গমনকারী দেশ।

তাহলে চীনের এই অপ্রতিরোধ্য যাত্রা থামাবে কে? আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চীন হয়ে উঠবে বিশ্বের এক নাম্বার দেশ। সব ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে যাবে বিশ্বের সবকটি দেশকে।

সূত্র: উইফোরাম, ইউরোমনিটর, ইন্ডিয়াটাইমস

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা