kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৩ জুলাই ২০১৯। ৮ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৯ জিলকদ ১৪৪০

ট্যাংকার হামলা : তথ্য গোপন করছে যুক্তরাষ্ট্র!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৩ জুন, ২০১৯ ০১:১৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ট্যাংকার হামলা : তথ্য গোপন করছে যুক্তরাষ্ট্র!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ওমান উপসাগরে দুটি ট্যাংকারে বিস্ফোরণের জন্য ইরানই দায়ী। এর প্রমাণস্বরূপ একটি ভিডিও এবং ১৩টি ছবিও প্রকাশ করেছে তারা। কিন্তু সেগুলোতে কী দেখা যাচ্ছে? 
 
মার্কিন ড্রোন গুলি করে ভূপাতিতের পর উপসাগরীয় এলাকার পরিস্থিতি কতোটা ভয়াবহ, তার একটা ধারণা মিলছে। ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়ে শেষ মুহূর্তে তা প্রত্যাহার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
 
গত ১৩ জুন হরমুজ প্রণালীর ঠিক বাইরে ওমান উপসাগরে দুটি ট্যাংকারে বিস্ফোরণের পর থেকে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। ট্যাঙ্কারগুলোর একটি নরওয়ের ফ্রন্ট আল্টএয়ার এবং আরেকটি জাপানের কোকুকা কারেজিয়াস। একই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে মাইন পেতে রাখার অভিযোগ আনে। ইরান অবশ্য বরাবরই এ অভিয়োগ অস্বীকার করে আসছে।
 
এর আগে ১২ মে হরমুজ প্রণালীর কাছে চারটি জাহাজ বিস্ফোরণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখনো যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব বিশ্বে দেশটির বন্ধুরা ইরানের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ আনে। বিশ্বের তেল সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশই হয়ে থাকে এই প্রণালী দিয়ে।
 
তথ্যগোপন?
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন কোনো একটি জাহাজে লিম্পেট মাইন বসানো বা সরানো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এবং এর জন্য প্রয়োজন বিশেষ জ্ঞান। বিস্ফোরকগুলো চুম্বকের সহায়তায় জাহাজে বসাতে হয়। সাধারণত পানির নিচে এগুলো বসানো হয়, যাতে খালি চোখে না দেখা যায়। কিন্তু কোকুকা কারেজিয়াস জাহাজে বিস্ফোরণ হয়েছে পানির প্রায় এক মিটার ওপরে।
 
তবে জাহাজটি জাপানের যে প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছে, সে প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছ থেকে পাওয়া গেছে একটু ভিন্ন রকমের বক্তব্য। ইয়ুটাকা কাতাদা ১৪ জুন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বিস্ফোরণের ঠিক আগে জাহাজের কর্মীরা কিছু একটা উড়ে আসতে দেখেছেন।
 
এই বক্তব্যের কোনো ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্ত গবেষণা সংস্থা বেলিংকাটের এলিয়ট ডয়চে ভেলেকে বলেন, 'এই ঘটনায় আরো কিছু রয়েছে যা যুক্তরাষ্ট্র সবাইকে জানাচ্ছে না। মনে হচ্ছে তারা কিছু একটা লুকাচ্ছে।'
 
জার্মান রাজনীতিবিদরাও ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের কথা ভুলে যাননি। এর আগেও এবারের মতোই উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া একই ধরনের অভিযোগ এনেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
 
১৩ জুন বিকেলে ফ্লোরিডার টাম্পায় অবস্থিত ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড- সেন্টকম এক বিবৃতি দেয়। একই সঙ্গে সংস্থাটি একটি সাদাকালো, অল্প রেজুল্যুশনের ভিডিও নিজেদের ওয়েবসাইট, ইউটিউব এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রকাশ করে।
 
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ১ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে ইরানের রিভোলিউশনারি গার্ডের সদস্যদের কোকুকা কারেজিয়াসের গা থেকে মাইন সরাতে দেখা যাচ্ছে।
 
ভিডিওর শুরুতে লাইফ জ্যাকেট পড়া কয়েকজনকে দেখা যায়, যাদের একজনকে ট্যাঙ্কারের পাশে যেতে দেখা গেছে। কিন্তু ভিডিওটি একেবারেই অস্পষ্ট, কয়েকটি ক্লিপ থেকে কেটে জোড়া লাগানো এবং বিভিন্ন অবস্থান থেকে ধারণ করা। কিন্তু ভিডিওটি কিভাবে এবং কখন ধারণ করা হলো, সে বিষয়ে কিছুই জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
 
ভিডিওর পাশাপাশি সেন্ডকমের পক্ষ থেকে দুটি এডিট করা ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে। দূর থেকে তোলা ছবিটিতে জাহাজটির একপাশে লাল তীর দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে একটি বড় আকারের গর্ত এবং মাঝ বরাবর একটি কালো ছায়া।
 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলছে ছায়া সদৃশ বস্তুটিই বিস্ফোরিত না হওয়া মাইন। ইউএসএস ব্রেইনব্রিজের সূত্র দিয়ে প্রকাশ করা হয় ছবি দু'টো। মার্কিন নৌবাহিনীর এই ডেস্ট্রয়ারটি কোকুনা কারেজিয়াসের ২১ ক্রুকে উদ্ধার করে। এরপর স্বাভাবিকভাবেই তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা হয়নি।
 
অভিযোগের বিশ্লেষণ
মেরিন ট্রাফিক ট্র্যাকারের মতো কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব। এটি ব্যবহার করে ট্যাঙ্কারের গতিপথও জানা যায়। বিস্ফোরণের ঠিক আগে আগে ইরানের উপকূলেই অবস্থান করছিল ট্যাঙ্কারটি। আগের কয়েকটি ছবি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ভিডিও ফুটেজে দেখানো জাহাজটি আসলেই কোকুকা কারেজিয়াস।
 
ছবি বিশ্লেষণ করলে এটাও বোঝা যায়, তেলবহনকারী ট্যাঙ্কারটির পাশের ছোট নৌযানটি এক ধরনের স্পিডবোট যা ইরানে ব্যবহার হয়। তবে নৌযানে কারা ছিলেন তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। ফুটেজটি বিশ্লেষণ করে এর ধারনের সময় এবং স্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
 
বেলিংকাটের তদন্তকারী হিগিনস সন্দেহ করছেন, ইচ্ছে করেই কিছু জিনিস সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, 'একটা জিনিস আমার কাছে অবাক লাগছে, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের যে ছবিগুলো দেখাচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ইরানিরা নৌযান থেকে কিছু একটা সরাচ্ছেন। কিন্তু একটি ছবিতেও জিনিসটা কী, তা স্পষ্ট বোঝার উপায় নেই।'
 
হিগিনস বলেন, 'ভিডিওটিও এমন সময়ে শুরু হয়েছে যখন ইরানীরা জিনিসটা সরাচ্ছেন, এবং তাদের কারণে জিনিসটাকে ভালোমতো দেখাও যাচ্ছে না। আমার প্রশ্ন হলো, তাহলে ভিডিওটা আরো আগের সময় থেকে কেন দেখানো হচ্ছে না, যখন জিনিসটা স্পষ্ট বোঝার সম্ভাবনা ছিল।'
 
অভিযোগের পুনর্মূল্যায়ন
একটি ভিডিও এবং ১৩টি ছবিতে এক ধরনের মত প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পরিপ্রেক্ষিতে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তিনি বলেছেন, 'এই অভিযোগকে আমরা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। এই প্রমাণগুলোও বেশ শক্তিশালী।'
 
কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের হাজির করা কোনো প্রমাণেই লিম্পেট মাইন দেখা যায়নি। এমনকি ইরানি সৈনিকরাই যে মাইন স্থাপন করছে, সে ব্যাপারেও সন্দেহমুক্ত হওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। ফলে ১৩ জুনের ঘটনায় দুই ট্যাঙ্কারে যে লিমপেট মাইন দিয়েই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে এবং এর জন্য যে ইরানই দায়ী, তাও জোরের সঙ্গে বলা কখনই সম্ভব নয়।
 
১৩ জুন সকালে বিস্ফোরণের সময় দুটি ট্যাঙ্কারের মধ্যে দূরত্ব ছিল ১০ নটিক্যাল মাইল। নরওয়ের ফ্রন্ট আল্টএয়ারে প্রথম আগুনের ঘটনা ঘটে এবং জরুরি ভিত্তিতে সাহায্য চেয়ে সংবাদ পাঠানো হয়। কিন্তু এই ঘটনাতেও ইরানকে দায়ী করা হলেও কোনো প্রমাণ হাজির করা হয়নি।
 
ইরানের বেশকটি নৌযান বিস্ফোরণের সময় আশেপাশেই অবস্থান করছিল। তবে ইরানও নিজেদের নির্দোষ দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করেনি। টুইটারে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘সাবোটাজের কূটনীতির' অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি যুদ্ধ ‘উসকে দেয়ার' চেষ্টা চালাচ্ছে।
 
ফলে এখন পর্যন্ত কোনোকিছু সুস্পষ্ট প্রমাণ না হলেও কথার লড়াই ঠিকই চলছে। এই ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত ছাড়া সঠিক কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের আশঙ্কা বেড়ে চলেছে। জাহাজ দু'টির নাবিকদের জবানবন্দির ওপর এই মুহূর্তে অনেক কিছুই নির্ভর করছে। সূত্র: ডয়চে ভেলে

মন্তব্য