kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

হরমুজ প্রণালীতে ‘হামলা’ নিয়ে মুখোমুখি ইরান ও আমেরিকা

এ ঘটনা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা বিশ্বের নেই: জাতিসংঘ মহাসচিব

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৫ জুন, ২০১৯ ১০:১৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হরমুজ প্রণালীতে ‘হামলা’ নিয়ে মুখোমুখি ইরান ও আমেরিকা

ওমান উপসাগরে জাপান ও নরওয়ের দুটি তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ইরান দায়ী বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে অভিযোগ করেছে ইরান তাকে ভিত্তিহীন এবং উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছে। গত বৃহস্পতিবার ওমান উপসাগরে জাপানের কোকুয়া কারেজিয়াস ও নরওয়ের ফ্রন্ট অ্যালটেয়ার ট্যাংকারে বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়। উভয় নৌযানের নাবিকদের উদ্ধার করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌযান। পরে তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয়ই নিজ নিজ নৌযানে উদ্ধার করা নাবিকদের ছবি প্রকাশ করে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র গতকাল একটি ভিডিও প্রকাশের পর দাবি করেছে, ইরানের নৌবাহিনীর এক নৌযানকে জাপানের কোকুয়া কারেজিয়াস ট্যাংকারের পাশ থেকে একটি অবিস্ফোরিত মাইন অপসারণ করতে দেখা গেছে। ভিডিওর পাশাপাশি এসংক্রান্ত কিছু ছবিও প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র।

ওমান উপকূলে গত বৃহস্পতিবারের ঘটনায় ইরানের দায় নিয়ে শুধু নিজেরা কথা বলে ক্ষান্ত হয়নি যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও তারা ওই প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জনাথন কোহেন নিরাপত্তা পরিষদের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ইরানবিরোধী বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। ইরান ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য স্পষ্ট হুমকি’, এমন মন্তব্যও করেছেন কোহেন।

যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল দাবি করেছেন, আসল ঘটনার বিন্দুমাত্র প্রমাণও হাজির করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এনে যুক্তরাষ্ট্র ‘কূটনৈতিক নাশকতা’ চালাতে চাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন এ ইরানি মন্ত্রী।

এ ছাড়া ইরানের প্রেসিডেন্ট রুহানি গতকাল কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের বৈঠকে অভিযোগ করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার গত দুই বছরে সব আন্তর্জাতিক গঠনতন্ত্র ও নীতিমালা ভেঙে, অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে আক্রমণাত্মক পথ বেছে নিয়েছে এবং এ অঞ্চলে ও বিশ্বজুড়ে স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানি মিশনও গতকাল বিবৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ অ্যাখ্যা দেওয়া হয় এবং ‘ইরানভীতি’ থেকে এ ধরনের অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ওমান উপসাগরের ঘটনায় বাস্তবতা উদ্ঘাটনের ওপর জোর দিয়েছেন এবং সংঘাত বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তেমন কিছু যদি ঘটে থাকে, তবে তা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা বিশ্বের নেই। উপসাগরীয় অঞ্চলের এ সংঘাত এক বিরাট ঘটনা।’

ওমান উপসাগরে গত বৃহস্পতিবার নরওয়ের ট্যাংকারে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে এবং জাহাজে দিনভর আগুন জ্বলে। এ ছাড়া জাপানের একটি ট্যাংকারেও বিস্ফোরণ ঘটে, তবে ওই জাহাজের আগুন সঙ্গে সঙ্গে নিভিয়ে ফেলা হয়। এ দুটি জাহাজে বিস্ফোরণের জন্য ইরানকে দায়ী করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে গত ১২ মে ওমান উপসাগরেই চারটি জাহাজে হামলা হয়। সেদিন সৌদি আরবের দুটি, নরওয়ের একটি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি জাহাজে হামলার জন্য ইরানকেই দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের পরমাণু চুক্তি নিয়ে এমনিতেই পরস্পর মারমুখী অবস্থানে আছে তেহরান-ওয়াশিংটন। তার ওপর ওমান উপসাগরে ইরানের উপকূল থেকে মাত্র ২৫ নটিক্যাল মাইল দূরে গত বৃহস্পতিবার দুটি বিদেশি ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরও সেখানে ইরানি নৌযানের উপস্থিতি ছিল বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

 

হরমুজ প্রণালী ইরান ও আমেরিকার কাছে কেন এতোটা গুরুত্বপূর্ণ?

যেখানে এই ঘটনাগুলো ঘটছে, সেটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। এই পথটি হরমুজ প্রণালী হিসেবে পরিচিত।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তেল রপ্তানি করা হয় হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল যায় এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং অন্যান্য জায়গায়।

হরমুজ প্রণালীর একদিকে আছে আরব দেশগুলো। এসব দেশের মধ্যে আমেরিকার মিত্র দেশগুলো রয়েছে। হরমুজ প্রণালীর অন্য পাশে রয়েছে ইরান।

হরমুজ প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ যে অংশ সেখানে ইরান এবং ওমানের দূরত্ব মাত্র ২১ মাইল।

এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের জন্য দুটো লেন রয়েছে এবং প্রতিটি লেন দুই মাইল প্রশস্ত।

হরমুজ প্রণালী সংকীর্ণ হতে পারে। কিন্তু জ্বালানী তেল বহনের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাহাজ চলাচল করার জন্য হরমুজ প্রণালী যথেষ্ট গভীর এবং চওড়া।

পৃথিবীতে যে পরিমাণ জ্বালানী তেল রপ্তানি হয়, তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়।

এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন এক কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়।

মালাক্কা প্রণালী দিয়ে জ্বালানী তেল রপ্তানি হয় এক কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল এবং সুয়েজ খাল দিয়ে প্রতিদিন ৫৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়।

হরমুজ প্রণালী হচ্ছে ইরানের জ্বালানী তেল রপ্তানির প্রধান রুট। ইরানের অর্থনীতির জন্য এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের মোট রপ্তানি আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ আসে জ্বালানী তেল রপ্তানির মাধ্যমে। ২০১৭ সালে ইরান ৬৬০০ কোটি ডলারের তেল রপ্তানি করেছে।

ইরানের উপর আমেরিকা নতুন করে যে অবরোধ দিয়েছে তাতে তারা মোটেও খুশি নয়।

ইরান বলেছে, তাদের তেল রপ্তানিতে আমেরিকা যদি বাধা দেয়, তাহলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কোন তেল রপ্তানি করা যাবেনা।

ইরান বলেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যত তেল পরিবহন করা হবে সেটি তারা বন্ধ করে দেবে।

১৯৮০'র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় এ ধরণের ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় ইরাক এবং ইরান পরস্পরের তেল রপ্তানি বন্ধ করতে চেয়েছিল।

তখন জ্বালানী তেল বহনকারী ২৪০টি তেলের ট্যাংকার আক্রান্ত হয়েছিল এবং ৫৫টি ডুবে গিয়েছিল।

ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে চায় তাহলে সেটির কিছু নেতিবাচক দিক আছে। হরমুজ প্রণালী অশান্ত হয়ে উঠলে পৃথিবীজুড়ে জ্বালানী তেলের দাম বাড়বে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা