kalerkantho

সোমবার । ২৪ জুন ২০১৯। ১০ আষাঢ় ১৪২৬। ২০ শাওয়াল ১৪৪০

পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে উঠে আসছে বিজেপি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৯ মে, ২০১৯ ২১:৫৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে উঠে আসছে বিজেপি

ভারতের চলতি লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে উঠে আসতে পারে বিজেপি। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি, না  প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা, কোন কারণে মোদি বাহিনীর এই উত্থান? জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলে বিষয়টি নিয়ে চালায় অনুসন্ধান।

দুজন সাংসদ রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে। বিধায়কের সংখ্যাও মাত্র তিন। তা সত্ত্বেও ভোটের ফল প্রকাশের আগে এই রাজ্যে কার্যত দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তির মর্যাদা পেয়ে গিয়েছে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরা হচ্ছে নরেন্দ্র মোদির দলকেই। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বাংলায় তার দল কমপক্ষে ২৩টি আসনে জিতবে বলে দাবি করেছেন। এই দাবির সারবত্তা বোঝা যাবে ২৩ মে ফল বেরোলে। কিন্তু, তার আগেই বিজেপির উত্থান নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়ে গিয়েছে। এর পিছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

বিভাজনের রাজনীতি
তৃণমূল, বাম, কংগ্রেস-সহ দেশের অধিকাংশ দলের অভিযোগ, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে বিজেপি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে। হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ও তার রাজনৈতিক সহযোগী বিজেপির প্রধান কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ। এই রাজনীতি অন্য রাজ্যের মতো অবশেষে পশ্চিমবঙ্গেও সাফল্যের মুখ দেখতে চলেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

শক্তিশালী বিরোধী শক্তির অভাব
কংগ্রেস নেতা-কর্মী-বিধায়করা গত কয়েক বছরে দলে দলে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। বামেরাও ক্রমশ দুর্বল হয়েছে। দাপট বাড়িয়েছে তৃণমূল। রাজনীতিতে বিরোধী স্থান শূন্য থাকে না। তাই বাম ও কংগ্রেসকে টপকে চতুর্থ থেকে দ্বিতীয় শক্তির দিকে উত্থান হচ্ছে বিজেপির। দুর্বলতার কথা স্বীকার করে সিপিএম বিধায়ক তন্ময় ভট্টাচার্য বলেন, ‘তৃণমূলের সন্ত্রাসে আমাদের সংগঠন অনেক জায়গায় দুর্বল হয়েছে। ভয় দেখিয়ে, ভুয়া মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে নেতাদের। তাই সমর্থকদের একটা অংশ মনে করছে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে আমরা লড়াইয়ের জায়গায় নেই। বিজেপি সেই সুযোগটা নিচ্ছে।’

সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ
পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু ভোট প্রায় ৩০ শতাংশ। এদের সিংহভাগই তৃণমূলের সমর্থক। বিজেপির অভিযোগ, ভোটের স্বার্থে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যালঘু তোষণ করছেন, সংখ্যালঘুদের ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করছেন। বিজেপির এই প্রচার সংখ্যাগুরুদের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে বলে অনুমান রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিমলশঙ্কর নন্দ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘তৃণমূলের লক্ষ্য মুসলিম ভোট। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর কথাবার্তা, পোশাক, আচরণে এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি তিন তালাক প্রথা বাতিলেরও বিরোধিতা করেছেন তিনি। বসিরহাটের প্রার্থী নুসরাত জাহান তিন তালাকের বিরোধিতা করেছিলেন। সেখানে প্রচারে গিয়ে মমতা বলেছেন, নুসরাত বাচ্চা মেয়ে। আমরা তিন তালাকের বিরোধী নই। এটা সংখ্যাগুরুরা ভালো চোখে দেখছেন না।’

তৃণমূলের নিচুতলায় দুর্নীতি
শাসক দলের তাবড় নেতা-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থার মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। নারদ তদন্তে গোপন ক্যামেরায় টাকা নিতে দেখা গিয়েছে অনেককে। এই বিচারাধীন মামলাগুলির থেকে তৃণমূলের বেশি মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে পঞ্চায়েত স্তরে দুর্নীতি ও উৎকোচ। নিচুতলার তৃণমূল কর্মীরা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দিতে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ। স্কুল-কলেজে ভর্তি থেকে পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে টাকা নেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে উদ্ধত আচরণ, দুর্ব্যবহার।

এর ফলে জঙ্গলমহলসহ বিভিন্ন জেলায় বিজেপি গত বছরের পঞ্চায়েত নির্বাচনে চমকপ্রদ ফল করেছে। এর মধ্যে অনেক স্থানেই সংখ্যালঘুদের উপস্থিতি নগণ্য, মেরুকরণ ছাড়াই প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার ফলে বিজেপি ভালো ফল করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ত্রুটি স্বীকার করে নেন পুরুলিয়া কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী মৃগাঙ্ক মাহাতো।

পেশায় চিকিৎসক মৃগাঙ্ক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘একশ্রেণির কর্মীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ছিল। সে কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়৷ তার প্রতিফলন পঞ্চায়েত ভোটে দেখা গিয়েছে। তবে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি৷ দল অনেককে এ জন্য বহিষ্কার করেছে।’

২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৩৪ শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। যেখানে ভোট হয়েছে, তার অধিকাংশ স্থানে গ্রামীণ জনতা ভোট দিতে পারেনি বলে অভিযোগ। একটা বড় অংশের মানুষ তৃণমূলের উপর ক্ষুব্ধ৷ তাদের ভোট শাসকদলের বিরোধী হিসেবে বিজেপির দিকে যেতে পারে।

টাক দিয়ে নেতা কিনে নিয়েছে তৃণমূল?
কেন্দ্রে সরকারে আগ্রাসী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে সরাসরি তাঁর দ্বৈরথ। শাসক দলের সঙ্গে বিজেপি কর্মীদের সংঘাত হচ্ছে চতুর্দিকে। অর্থাৎ, তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়ার মতো ক্ষমতাধর বলে বিজেপি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছে। তাই বাম ও কংগ্রেস সমর্থকরা মোদি বাহিনীর দিকে ঝুঁকছেন। তাঁরা মনে করছেন, তৃণমূলের সঙ্গে টক্কর দিতে পারে বিজেপিই। মুর্শিদাবাদ, মালদার মতো পুরুলিয়াতেও কংগ্রেসের এখনো সংগঠন টিকিয়ে রেখেছে। জেলা সভাপতি নেপাল মাহাতো নিজেই এবার পুরুলিয়া কেন্দ্রে দলের প্রার্থী।

তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘মানুষ তৃণমূলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। তারা চাইছে যে কোনোভাবে তৃণমূলকে হারাতে।জনতা মনে করছে, শাসককে হারানোর জোর বিজেপিরই রয়েছে। তাই তারা পঞ্চায়েতে কংগ্রেস, বামের বদলে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। আমাদের নেতাদের কিনে নিয়েছে তৃণমূল। সাংগঠনিক দুর্বলতার এই সুযোগ পুরো নিয়েছে ওরা। সে দিক থেকে আমরা ব্যর্থ তো বটেই।’

গণতান্ত্রিক পরিসরের সঙ্কোচন
বিরোধীরা অহরহ অভিযোগ তোলে পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বিরোধী কন্ঠের স্বর ক্রমশঃ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে তৃণমূলের আমলে। এর প্রতিবাদে কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন, ‘দেখ খুলে তোর তিন নয়ন/ রাস্তা জুড়ে খড়গ হাতে/ দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন।’ এই পরিস্থিতিতে অনেকে বিজেপির হাত ধরছেন। অধ্যাপক বিমলশঙ্কর নন্দের মতে, ‘তৃণমূল উন্নয়ন করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। এমনটাই বার্তা দেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর আচরণে বোঝাচ্ছেন, তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত্। বিরুদ্ধাচরণ তিনি বরদাস্ত করবেন না।’

সব মিলিয়ে বিজেপির ভোট এবার অনেকটাই বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। সেই বৃদ্ধি কতটা হবে, তার উপর নির্বাচনের ফল অনেকটাই নির্ভর করছে।

সূত্র: ডয়চে ভেলে

মন্তব্য