kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

বিশেষজ্ঞ মত

হামলার প্রভাব শুধু শ্রীলঙ্কায়ই থাকবে না

শমসের মবিন চৌধুরী

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০৯:১৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হামলার প্রভাব শুধু শ্রীলঙ্কায়ই থাকবে না

শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এ রকম বড় হামলার ঘটনা প্রথম ঘটল। এই বর্বরতম ঘটনা কারা ঘটিয়েছে, এ নিয়ে শ্রীলঙ্কান সরকার এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেয়নি। তারা আন্দাজ করছে এবং কিছুটা ইঙ্গিত করছে, একটি জঙ্গিগোষ্ঠী ওই হামলা চালিয়েছে। কোন আন্তর্জাতিক মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠী এটির সঙ্গে জড়িত-সেটিও প্রকাশ্যে বলছে না শ্রীলঙ্কান সরকার। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি এখনো। এটি না বলার পেছনে তাদের হয়তো কোনো যুক্তি থাকতে পারে। যদি কোনো আন্তর্জাতিক মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠী এটি করে থাকে, এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। এর প্রভাব শুধু শ্রীলঙ্কার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি আরো নানা দিকে প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হতে পারে, যেটি আমরা অতীতে বারবার বলে আসছি, এই যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আমাদের দেশে, এটা একটি বিশাল সংখ্যা। এর মধ্যে যারা যুবক, এরা কিন্তু নিঃস্ব। এরা সব কিছুই হারিয়েছে। এদের মধ্যে থেকে কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীতে বা আইএস সদস্য হিসেবে রিক্রুট করা কোনো কঠিন ব্যাপার নয়। ওই পথে এদের উজ্জীবিত করা খুবই সহজ। যদি কেউ বোঝায়, ‘তোমরা মুসলমান। তোমরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছ।’ এসব বুঝিয়ে তাদের উগ্র পথে নিতেই পারে কেউ। ফলে শ্রীলঙ্কার ওই হামলার ঘটনায় বাংলাদেশে একটি প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এক নম্বর কথা হলো, যদি আন্তর্জাতিক কোনো ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠী এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে, বুঝতে হবে, আইএস তাদের ভৌগোলিক অবস্থান হারালেও তাদের যে কথিত আদর্শ, যেটি বিষাক্ত, সেটি বিলীন হয়ে যায়নি। সেটি এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আজকে শ্রীলঙ্কায়, কালকে মিয়ানমারে, পরশু বাংলাদেশে, কোনো দিন ভারতে বা অন্য কোথাও হামলা করতে পারে।

দ্বিতীয় কথা হলো, নিউজিল্যান্ডে গত মাসে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটি সেখানকার সরকার খুব শক্ত হাতেই নিয়ন্ত্রণ করেছে। সেই উদ্যোগ প্রশংসনীয়ও হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নিজে অসাধারণ উদ্যোগ নিয়ে ওই ঘটনার মোকাবিলা করেছেন। তা সত্ত্বেও মুসলমানদের মধ্যে ওই ঘটনায় একটি দাগ পড়তেই পারে এই ভেবে যে মুসলমানরা কোথাও নিরাপদ নয়। এই একটি ঘটনা এর সঙ্গে জড়িত হতেও পারে, না-ও পারে। আমি সম্ভাবনার কথা বলছি।

আমার জন্য এখন যেটি উত্কণ্ঠার বিষয় শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে, সেটি হলো যদি এটি প্রমাণিত হয় যে বা সরকার যদি প্রমাণ করতে পারে, আন্তর্জাতিক কোনো মুসলিম উগ্র সংগঠন এই হামলার সঙ্গে জড়িত, তাহলে শ্রীলঙ্কান মুসলমানদের ওপর একটি বাজে ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছি। কারণ শ্রীলঙ্কান কট্টরপন্থী মৌলবাদী বৌদ্ধরা অন্যভাবে নেবে এটিকে। কারণ অতীতে তারা এ রকম ঘটিয়েছে। গত চার-পাঁচ বছরে শ্রীলঙ্কান মুসলিমদের ওপর এরা নানাভাবে আক্রমণ করেছে। এক বছর আগেও বিশাল রায়ট হয়েছে সেখানে। শুক্রবার দিনে মুসলমানদের ওপর হামলা করা হয়েছে এবং জুমার নামাজ আদায় করতে দেওয়া হয়নি। গত রবিবারের এই ঘটনার পরে এ রকম ঘটনা আরো বড় আকার ধারণ করার শঙ্কা আমি এড়িয়ে যাচ্ছি না।

এরই মধ্যে দেখা গেছে, শ্রীলঙ্কান সরকার জরুরি অবস্থার ঘোষণা দিয়েছে। সান্ধ্য আইনও জারি করেছে। নিশ্চয় কোনো একটি বিষয় মাথায় রেখেই এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই হামলার কোনো পাল্টা আক্রমণ যাতে না হয় কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর, সরকার এখন সেদিকেই নজর দিচ্ছে। সব মিলিয়ে বলতে পারি, বিভিন্ন্ন দিক রয়েছে এই বর্বর হামলার। এটি মর্মান্তিক ও নিন্দনীয় ঘটনা।

শমসের মবিন চৌধুরী : সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার।
[অনুলিখন : রেজাউল করিম]   

মন্তব্য