kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

সোনাগাছির যৌনকর্মীরা কাকে ভোট দেবেন?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ১১:২৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সোনাগাছির যৌনকর্মীরা কাকে ভোট দেবেন?

ফাইল ফটো

ভারতের উত্তর কলকাতার বিখ্যাত যৌনপল্লী সোনাগাছি। ভারতের জাতীয় নির্বাচনে বর্তমানে সে এলাকায় চলছে ভোট উৎসবের প্রস্তুতি। তবে এবার নির্বাচনের আগে সোনাগাছির যৌনকর্মীরা জানিয়ে দিলেন, এবার তাঁদের ভোট পড়বে- নোটায়। ভারতের নির্বাচনে আপনি যদি কোনো প্রার্থীকে পছন্দ না করেন তাহলে নান অফ দ্য অ্যাবোভ বা নোটায় ভোট দিতে পারেন। এবার সেটিতে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তই নিয়েছেন তাঁরা। কোনো পক্ষই তাঁদের পক্ষ নেয়নি। অতএব এবার প্রতিবাদ জানাবেন ব্যালট বাক্সে। বুঝিয়ে দেবেন কোনো রঙ, কোনো নেতাতেই আস্থা নেই আর।

কাউকে ভোট না দেওয়ার কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, প্রতি পাঁচ বছর পর পর ছবিটা কম বেশি একই রকম থাকে। এতদিনে তা বুঝে গিয়েছেন যৌনকর্মীরা। তাই তাঁদের কথা ‘আমাদের কথা কে ভেবেছে, যে আমরা কারো কথা ভাবব?’

৫৫ বছরের শেফালি রায় বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতারাই দেশের আইন তৈরি করেন। রোজ কত শত আইন তৈরি হচ্ছে, কত আইন সংশোধিত হচ্ছে। অথচ আমাদের অধিকার নিয়ে সংসদে একবারও আলোচনা হয়না তো।’

লোকসভা কিংবা বিধানসভা, ভোটের মৌসুম এলেই কত দল, কত হেভিওয়েট নেতারা কথা দিয়ে যান শেফালি এবং শেফালির মতো হাজার হাজার যৌনকর্মীর পেশা আইনি স্বীকৃতি পাবে এবার। ভোট মিটলে সবকিছু আগের মতোই।

সোনাগাছির কর্মীদের অধিকার নিয়ে বিগত বেশ কিছু বছর ধরে লড়াই করে আসছে বেসরকারি সংস্থা দুর্বার। সংস্থার সচিব কাজল বসুর কথায়, ‘আমাদের পেশা অন্য যে কোনও পেশার মতোই। তাহলে আমাদের কেন এত হেনস্থা হতে হয়? কত বার কত নেতার কাছে আবেদন করলাম। ভোটের আগে সবাই কথা দিয়েছে। আর ক্ষমতায় এসে ভুলে গিয়েছে। ওরা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে আমাদের এড়িয়ে যেতে পারেন। তাহলে আমরা কেন ওদের দিকটা ভাবব?’

সমস্যাটা কিন্তু শুধু রাজনৈতিক নেতাদের উদাসীনতা নয়। অনেকেরই এখানে কাজ করার বৈধ পরিচয়পত্র নেই। কেউ বাবা মায়ের কাছ থেকে, কেউ বা স্বামীর ঘর থেকে পালিয়ে এসেছিলেন বছর কয়েক আগে। এখন সে ঘরেই ফিরবেন পরিচয়ের প্রমাণ নিতে, সেই ‘সাহস’ এই সমাজ তাঁদের দেয় না। জন্মের সনদপত্র অনেক দূরের কথা, ঘর ছাড়ার পর নতুন ঠিকানা কিংবা নতুন কাজ কোনোটাই বলে উঠতে পারেন  না শেফালিরা।

এখানকার অনেক যৌনকর্মীই ভোটার নন। দুর্বারের নথিভুক্তিকরণের কার্ড, ঊষা ব্যাঙ্কের পাসবই, প্যান কার্ড, সঙ্গে স্থানীয় সাংসদ কিমবা বিধায়কের চিঠি। সে সবের ভিত্তিতে কয়েক দফা যাচাই পর্ব শেষ হলে নির্বাচন কমিশনের দফতরে একটা সাক্ষাৎকার। ভোটার তালিকায় নাম তোলার নিয়ম এরকমটাই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোনাগাছির এক কর্মী জানালেন, ‘আমাদের এলাকার বিধায়ক শশী পাঁজা, সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় মাঝে মাঝে আমাদের খোঁজ খবর নেন। ভোটের আগ দিয়ে প্রচারেও আসছেন ওরা। কিন্তু আমাদের কার্ডই নেই, ভোট দেব কী করে?’

৫০ বছরের কলাবতী দেবী বলেন, ‘নিজেদের কার্ড নেই। বাচ্চাদের কার্ড করা কতটা কঠিন বুঝতে পারছেন? বৈধ পরিচয়পত্র নেই, তাই সমাজকল্যাণমূলক কোনও প্রকল্পের সুবিধা পাই না আমরা।’ তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমরা এই দেশের নাগরিক নই?’

সদ্য তিরিশের কোঠায় পৌছনো এক কর্মী বলেন, ‘কেউ অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে আইডি কার্ড ছাড়া সরকারি হাসপাতাল ভর্তি নেয় না।’

ব্যাংক নোট বাতিলের ঝামেলাও কম পোহাতে হয়নি এ পল্লির বাসিন্দাদের। সে সময় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সরে গিয়েছিল পায়ের তলার মাটি। হু হু করে কমতে থাকল খদ্দেরের আসা যাওয়া। রোজ নতুন অনিশ্চয়তা।

আরেকজন কর্মী বলেন, ‘তাও সিপিএম আমলে আমরা কিছু নৈতিক সমর্থন পেতাম। অন্তত আমাদের সমস্যার কথা শুনতেন নেতারা। বৈধ পরিচয়পত্র নিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন। তৃণমূল জমানায় সেরকম কিছু হয়নি।

সোনাগাছির যে ৯১ জন যৌনকর্মী আইডি কার্ডের জন্য আবেদন করেছিলেন, তাদের মধ্যে ৫০ জন কার্ড পেয়েছেন। অধিকাংশের অভিযোগ স্থানীয় নেতারা সহযোগিতা করেননি। সোনাগাছি সংলগ্ন বউ বাজার, রবীন্দ্র সরণি, রামবাগানের যৌন পল্লীতে ৪০ জন বৈধ পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন করেছিলেন। এদের মধ্যে কেউ পাননি কার্ড। বসিরহাট, টিটাগড়, শান্তিপুরেও ছবিটা একই। জনা পঞ্চাশেক কর্মী আবেদন করেছিলেন ভোটার কার্ডের জন্য। কার্ড হাতে পাননি কেউই।

তাঁদের সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। কম করে হাজার দশেক যৌনকর্মী। প্রত্যেকের পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচ জন ধরলেও ৫০ হাজারটা আঙুল এবার ভোট দেবেন নোটায়। একটা ভোটও তো বদলে দিতে পারে কত সমীকরণ, কত হিসাব।
সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

মন্তব্য