kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

এমন উদ্ভট সমাজ আমি দেখিনি : তসলিমা নাসরিন

অনলাইন ডেস্ক   

২৫ জুন, ২০২১ ১৭:১৯ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



এমন উদ্ভট সমাজ আমি দেখিনি : তসলিমা নাসরিন

পত্র পত্রিকায় আমার লেখা প্রথম ছাপা হয় ১৯৭৩ সালে। তখন থেকেই গদ্য পদ্য লিখি।আমার লেখার বিষয় তখন প্রেম, বৈষম্যহীনতা, সমতার সমাজ,  পিতৃতন্ত্রকে অস্বীকার, নারীবিদ্বেষের প্রতিবাদ, সমানাধিকার, নারীবাদ। ১৯৭৮ সাল থেকে কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা করি। নিজে লিখি, অন্যদের লেখা ছাপাই। ওই সময় নারীবাদ বলতে সমাজে কিছু ছিল না। মেয়েদের জন্য 'বেগম' জাতীয় পত্রিকা ছাপা হতো। ওসবে থাকতো কী করে স্বামীর মন রক্ষা করতে হয়, কী করে শিশু পালন করতে হয়, ঘর সাজাতে হয়।

১৯৮৬ সালে আমার প্রথম কবিতার বই বের হয়। ১৯৮৯ সালে দ্বিতীয় কবিতার বই। বইগুলোয় ছিল প্রচুর নারীবাদী কবিতা, আপসহীন। ১৯৮৭ সাল থেকে জাতীয় পত্রিকাগুলোয় কলাম লিখতে শুরু করি। ১৯৯০ থেকে এক এক করে কলামগুলো বই হয়ে বেরোতে থাকে, অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। কলামগুলো মূলত ছিল নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আর নারীর সমানাধিকারের জন্য চিৎকার। সব বয়সের নারী তখন গোগ্রাসে লেখাগুলো পড়ছে।

সেই সময়  পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আমার বিরুদ্ধে গর্জে উঠলো।  লক্ষ লক্ষ নারীবিদ্বেষী মৌলবাদী আমার মাথার মূল্য ঘোষণা করেছিল, রাস্তায় মিছিল করেছিল, আমাকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু শুধু কি তারাই? সরকার থেকে শুরু করে দেশের সবাই, কবি লেখক, শিল্পী  সাহিত্যিক সাংবাদিক, সম্পাদক প্রকাশক, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, উকিল মোক্তার, ব্যবসায়ী চাকরিজীবি, বেকার অবেকার, উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত, রাতারাতি তসলিমা বিরোধী হয়ে উঠলো।

যেন এক তুড়িতে ঘটে গেল ব্যাপারটা। মৌলবাদীদের সুরে সুর মেলালো প্রগতিশীল বলে খ্যাত পুরুষতন্ত্রের ষণ্ডারা। দেখার মতো ঘটনা বটে। কত বড় শক্তিশালী দল আমার বিরুদ্ধে থাকলে আজ ২৭ বছর আমাকে অন্যায়ভাবে দেশে ফিরতে না দিয়েও কোনও সরকারকে সামান্যও সমালোচনা শুনতে হয় না। একজনই সরকারের সমালোচনা করে, একজনই অন্যায়টিকে স্মরণ করায়, সে আমি। কী লিখেছিলাম আমি? কী অপরাধ করেছিলাম যার শাস্তি আমৃত্যু নির্বাসন? 

যা লিখেছিলাম, ঠিক তা-ই আজ ৩০/৩৫ বছর পর নারী পুরুষেরা টেলিভিশনের টক শো'তে গিয়ে বুক ফুলিয়ে বলছে এবং জনগণের হাততালি পাচ্ছে। যা লিখেছিলাম ঠি তা-ই আজ ৩০/৩৫ বছর পর নাটক সিনেমায় বলা হচ্ছে এবং দর্শক শ্রোতার প্রশংসা পাচ্ছে। যা লিখেছিলাম তা-ই আজ ৩০/৩৫ বছর পর নারী পুরুষেরা পত্রিকায় লিখছেন, বইয়ে লিখছেন এবং দেশের সর্বত্র তাঁদের মান বাড়ছে, সম্মান জুটছে। আমি কিন্তু আজও ব্রাত্য।

আমার প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করাটা সকলের জাতীয় দায়িত্ব। যে যত ঘৃণা প্রকাশ করে, তার তত মূল্য বাড়ে সমাজে। পৃথিবীতে অনেক উদ্ভট সমাজ দেখেছি, এমন উদ্ভট সমাজ আমি দেখিনি। বিঃদ্রঃ সকলে যেন কমেন্ট বক্সে বলতে শুরু করবেন না  যে আপনারা চান আমি যেন দেশে ফিরি, দেশে তো জঙ্গিরা থাকছে, নেড়িকুত্তা্রাও থাকছে, আমি কেন থাকতে পারবো না! এ ধরণের কমেন্ট বড় জ্বালা ধরায়।

- তসলিমা নাসরিনের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে



সাতদিনের সেরা