kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৩ ডিসেম্বর ২০২০। ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২

১০ বছরের টিলির মতো আমিও বলি, যদি একটা জীবনও বেশি বাঁচে!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৭ জুন, ২০২০ ১১:৫৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১০ বছরের টিলির মতো আমিও বলি, যদি একটা জীবনও বেশি বাঁচে!

২০০৪ সালে আমি গিয়েছিলাম অস্ট্রেলিয়া। সংগীতশিল্পী জাহাঙ্গীর সাঈদ ও আমি সেখানে প্রায় ১৫ দিন ছিলাম। ফিরলাম সিঙ্গাপুরে। সেখানে আমার সাথে যোগ দিয়েছিল আমার পরিবারের সদস্যরা।

যেদিন ফিরে আসবো সেদিন পৃথিবীর ভয়ংকরতম এক সুনামি আঘাত হেনেছিল শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স ও মালয়েশিয়ায়। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেশগুলির মধ্যে ছিল থাইল্যান্ড। সেখানে মাইখাও সমুদ্র সৈকতে রোদপোহাতে গিয়েছিল টিলি স্মিথ নামে এক বৃটিশ স্কুলছাত্রী।

টিলি দেখতে পেলো হঠাৎ সমুদ্রের সব পানি তীর থেকে উল্টোদিকে সরে যাচ্ছে। অস্বাভাবিক ফেনাসহ ঢেউগুলি যেনো তীর ছেড়ে দূরে যাচ্ছে আর সার্ফবোর্ড, জেটস্কিগুলি শুকনো বালুতে মুখ থুবড়ে পড়ছে।

ঠিক দু'সপ্তাহ আগে টিলির স্কুলে ভূগোলের শিক্ষক তাদের সুনামি পড়িয়েছেন ও এই লক্ষণগুলির কথাই বলেছেন। টিলি সাথে সাথে তার মাকে এটা বললো। বলার পরপরই টিলির মা জানালেন তারা যে হোটেলে ছিল, সেই জে ডাবলইউ ম্যারিয়ট এর ম্যানেজারকে। তার নাম ক্রেইগ স্মিথ।

তিনি টিলির কথা বিশ্বাস করলেন ও দ্রুত সব কর্মচারিকে বললেন হোটেলের সামনের সৈকতে অবস্থানরত পর্যটকদের হোটেলে ফেরাতে ও নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে বলতে। সুনামি আঘাত হানার কয়েক মিনিট আগে তারা প্রায় সবাইকে ফিরিয়ে আনতে পারলেন।

ফুকেটের যে কয়েকটি সৈকতে মানুষ প্রাণ হারায় নাই সেই সুনামিতে, তার একটা হলো মাইখাও। কারণ টিলির কথায় হোটেলের ম্যানেজার ও তার মা বিশ্বাস করেছিল। আর সমুদ্রের তীরের জনতা হোটেল কর্মীদের বিশ্বাস করেছিল।

বাস্তবে এরকম ঘটনা কম ঘটে। কারণ ক্ষমতাবানরা টিলির মতো বালিকার কথা বিশ্বাস করে না। এই প্রবণতাকে বলে রিস্ক ব্লাইন্ডনেস। ঝুঁকি অন্ধত্ব।

এমনকি জনতাও এ ধরনের সতর্কবাণীতে বিশ্বাস করে না। তারা উল্টো যে সতর্ক করে তাকেই সমালোচনা করে, গালাগাল দেয়। কারণ তারা পয়সা খরচ করে বেড়াতে এসেছে। অন্য কেউ তাদের আনন্দ কেন নষ্ট করবে?

থাইল্যান্ডের এক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তা স্মিথ ধার্মাসারোজা সাতবছর আগে সুনামির বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। তাকে পাগল, নির্বোধ বলে গালাগাল করা হয়েছিল। সরকারের কিছু লোক টেলিভিশনে তিনি এই কথা বলাতে তাকে দেশের পর্যটন শিল্পের ধ্বংস চায় বলে নিন্দা করেছিল।

কাকতালীয়ভাবে টিলির নাম টিলি স্মিথ। হোটেল ম্যানেজারের নাম ক্রেইগ স্মিথ। জলবায়ু কর্মকর্তার নামও স্মিথ। হতে পারে স্মিথরা স্মিথদের বিশ্বাস করে।

যেটাই হোক না কেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে কেউ যদি বিপদ নিয়ে সতর্ক করে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয়।

বাংলাদেশের অল্প কিছু মানুষ করোনা নিয়ে ফেব্রুয়ারি মাস বা তারও আগে থেকে কথা বলেছে। তার মধ্যে একজন জাহিদুর রহমান। ভাইরোলজিস্ট। একজন আমি। একটি সংগঠন এফডিএসআর। আমরা দুজনেই আবার এফডিএসআরের সদস্য। অনেকটা টিলি স্মিথের মতো বিষয়টা কাকতালীয়।

বেশকিছু লোক তখনি গালাগাল শুরু করে দিয়েছিলেন। আমরা নাকি অহেতুক এসব বলি। দেশের বিখ্যাত এক চিকিৎসক বললেন চিকিৎসা করলেও এটা ৭ দিনে সারবে, না করলেও ৭ দিনে। এটা সর্দিকাশি। আর মেডিসিন সোসাইটির মহাজ্ঞানী বললেন এটা কখনো বাংলাদেশে আসবে না।

অথচ এখনো আমরা করোনা মোকাবেলায় সক্ষমতা দেখাতে পারি নাই। এখনো পিপিই সরবরাহের সংকট পুরোপুরি দূর হয় নাই। ৬১ জন চিকিৎসক মৃত্যুবরণ করেছেন।

বুকে হাত দিয়ে বলেন তো, ১৯ মার্চ আমরা বলার আগে কয়টা লোক জানতেন চিকিৎসকদের জন্য, পুলিশের জন্য, সকল স্বাস্থ্য কর্মীর জন্য, পরিচ্ছন্নতা কর্মীর জন্য, সাংবাদিকের জন্য নানারকম পিপিই লাগে?

জানতেন না। এমনকি বিজিএমইএও জানতো না পিপিই কিভাবে বানাতে হয়। দেশে এই জিনিস তৈরি হতো না।

আমরা বলার কথা ছিল না। কথা ছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এটা জানবে। টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস সেক্টরকে আগে থেকেই বলবে দেশে এটা বানাতে।

আমরা বলার পরে কারা আসলেন? প্রথম এগিয়ে আসলেন বুয়েটের ও অন্যান্য জায়গা থেকে পড়াশোনা করা কিছু প্রকৌশলী।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বললো দেশে পিপিইর কোনো অভাব নাই। বিএমএ সংবাদ সম্মেলন করে বললো যথেষ্ট পিপিই আছে। পরে দেখা গেলো সেসব পিপিইর অনেকগুলাই রেইনকোট আর মাস্ক নকল।

আমরা ঠিকই টিলি স্মিথের মতো বললাম। কিন্তু হোটেল ম্যানেজারের মতো কাউকে পাওয়া গেলো না। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ম্যানেজারেরা ঝুঁকি অন্ধত্বে থাকলেন। রিস্ক ব্লাইন্ড বা ঝুঁকিকানা এসব লোকজন তারপরে কানার মতো নানারকম কাজ করে গেলেন।

এই কানাদের মধ্যে সেরা কানা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তিনি ১৩ এপ্রিল দেশের শ্রেষ্ঠ প্রতারকদের এক সংগঠন জেকেজি হেলথকেয়ারকে করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহের কাজ দিলেন। তৈরি হলো পৃথিবীর ইতিহাসের এক ঘৃণ্য প্রতারণার কাহিনী।

সেটাও টিলি স্মিথের মতোই ১৩ এপ্রিলেই আমরা প্রতিবাদ করলাম। শোনা হলো না। দু'মাস দশদিন পরে এখন বোঝা যাচ্ছে কে ঠিক ছিল।

আমরা ধৈর্য্য ধরেছি ও বিশ্বাস করেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সক্ষমতায়। তিনি জানলে সমাধান আসবেই। এই একজনই মন দিয়ে কিছু শোনেন। বোঝেন। বুঝলে সেটা করেন। আর তাই বলেই গেছি যা সঠিক সেটি।

টিলি স্মিথদের কথা শুনতে হয়। কারণ দশ বছরের সেই মেয়েটি নিজের কথা ভেবে কিছু বলে না। নিজের পকেট ভরতে চায় না। ক্ষমতাও চায় না।

শুধু ভূগোলের ক্লাসটা ভালো করে করেছিল, তাই যা সঠিক বোঝে সেটা বলে। চায় শুধু মানুষ বাঁচুক।

এখন বলেছি ০ - ০ - ১০০ - ১০০। ১০০ দিনে চাইলে করোনাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা সম্ভব।

বলেই চলেছি। বলতেই থাকব। যদি একটা জীবনও বেশি বাঁচে। সে জীবনের দাম পৃথিবীর সকল সম্পদের চেয়ে বেশি।

(চিকিৎসক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষারের ফেসবুক থেকে)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা