kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

নারী করোনা রোগী ঢাকার হাসপাতালে ১০ দিন, ফেসবুকে তিনি যা লিখলেন

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ এপ্রিল, ২০২০ ১৭:০৭ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নারী করোনা রোগী ঢাকার হাসপাতালে ১০ দিন, ফেসবুকে তিনি যা লিখলেন

৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় কভিড-১৯ পজিটিভ রিপোর্ট আসার পর দ্বিধায় পরে গেছিলাম কোথায় থেকে চিকিৎসা নিব। আইইডিসিআর এর একজন ডাক্তার বললেন আপনার যেহেতু তেমন কোন  সিমটম্স নেই তাই আপনি বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিতে পারেন। বাসায় বয়স্ক বাবা-মা আর ছোট ভাগ্নে থাকায় তাদের সেফটির কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলাম হাসপাতাল এর সেবা যতই খারাপ হোক হাসপাতাল এই যাব। আইইডিসিআর এ আমার এ সিদ্ধান্তের কথা জানতেই ওরা আমাকে কুয়েত বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এর control room এর number দিল.. Call দিলাম ambulance পাঠানোর জন্য.. রাত ১০.০০ টার দিকে ambulance এ করে রওনা দিলাম হাসপাতাল এর উদ্দেশ্যে। রাত ১১.৩০ এর দিকে পৌঁছলাম। আমাকে room এ পাঠানোর আগেই এক ডাক্তার আমার সব details নিয়ে নিল।

হাসপাতাল এ ছিলাম ১০ দিন। এই ১০ দিনে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। facebook খুললেই অনেক কিছু দেখা যায়- যেমন : ছেলে করোনা সন্দেহে মাকে জঙ্গলে ফেলে চলে গেছে আবার করোনা আক্রান্ত বাবার লাশ নিতে অস্বীকৃতি... এই রকম news এ যখন facebook এর news feed ভর্তি ঠিক তখনি এই হাসপাতাল এ আমার চোখের সামনে পৃথিবী তার অন্য রূপ মেলে ধরলো। সেই পৃথিবী ভালোবাসার। একে অপরের পাশে থাকার। তাইতো Covid-19 Positive wife এর পাশে থাকার জন্য, সাহস যোগানোর জন্য সুস্থ husband ও হাসপাতাল এ ভর্তি হয়েছে.. অসুস্থ মা- বাবাকে সেবা করার জন্য নিজের life risk নিয়ে মেয়েও থেকে গেছে হাসপাতাল এ.. ২৪ ঘন্টা Covid-19 আক্রান্ত প্রিয়জনেদের সেবা করে যাচ্ছে তারা.. '' হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয় সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়''... কিন্তু যারা বইতে পারে তাদের জন্যই আছে উত্তম প্রতিদান। আর সেই প্রতিদান আসে পরম করুনাময় আল্লাহ তাআলা র পক্ষ থেকে। আর তাই আল্লাহর অশেষ রহমতে আর মেহেরবানীতে আমি চলে আসার দিন পর্যন্ত এই মহান হৃদয়ের অধিকারী মানুষদের Covid-19 negative ছিল।এতো নেতিবাচক খবরের ভীরে এই রকম ভালোবাসা,বিশ্বাস আর সাহসিকতার গল্প গুলো অল্প হলেও নতুন করে বাঁচতে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

আরো এক case দেখলাম.. Covid-19 শুধু জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট তেই থেমে নেই.. এটা আসে বিভিন্ন সিমটম্স নিয়ে। আমি যখন আইইডিসিআর এ জানালাম আমার তো জ্বর কাশি শ্বাসকষ্ট কিছুই নেই... যে গলা ব্যথা ছিল ঐটাও Antibiotic নেয়ার পর অনেকটাই কমে গেছে.. গত ১৯ দিন আমি আর আমার পরিবারের কেউ ঘরের বাহিরে যাইনি...! আমার কীভাবে positive আসলো!! আমার প্রশ্নের উত্তরটা ছিল এই রকম যে- দেশের প্রায় ৮০% লোকের positive আসবে যদি test করানো হয় কিন্তু এদের কোন সিমটম্স নেই.. Virus টা ওদের আক্রান্ত করে ঠিকই কিন্তু কিছু বোঝার আগেই রোগী ভালোও হয়ে যায়.. হাসপাতাল এও তার নমুনা দেখলাম কয়েকটা। পুরান ঢাকার দুইটা family এর সাথে পরিচয় হয়েছে ...

১। লোকটি হাসপাতাল এ admit হয় Covid-19 positive সব লক্ষন নিয়ে.. পরিবারের অন্যান্যদেরকেউ যখন test করানো হলো তখন দেখা গেল উনার স্ত্রী ও এক ছেলের positive কিন্তু বাকি দুই ছেলের negative. আর আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হলো Positive স্ত্রী আর ছেলের কোন সিমটম্স ছিল না আর এখন পর্যন্ত নেই। ওরা চাইলেই ঘরে বসেই চিকিৎসা নিতে পারতো কিন্তু আমরা জাতি হিসেবে এতোটাই নিম্নমানের যে বাসার বাড়িওয়ালা ওদের বাসা থেকে বের করে দেয়াতে হাসপাতাল এ ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছে। যাইহোক লোকটি এখন পুরোপুরি সুস্থ। আশা করি ২-৩ দিনের মধ্যে full family release পেয়ে যাবে।

২। আমার দেখা পুরান ঢাকার ২ নাম্বার family এর কথা বলি। এই Uncle (বয়স আুমানিক ৬৫+) এর Positive ধরা পরে শুধুমাত্র diarrhea সিমটম্স নিয়ে. দুদিন পর উনার wife ভর্তি হলো করোনার সব সিমটম্স নিয়ে। এর দুদিন পর উনাদের ছেলে ভর্তি হল শুধুমাত্র কাশী নিয়ে.. যদিও একইসাথে ছিল তারপরও ছেলের wife আর ওদের ছেলে-মেয়েদের negative ছিল। আমি আসার দিন দেখে আসছি uncle অনেকটাই সুস্থ আর aunty-র ও জ্বর চলে গেছে শুধু হালকা শ্বাসকষ্ট আছে.. ওইটাও চলে যাবে ইনশাআল্লাহ.. হতেই পারে next week এ হয়তো এই family ও release পেয়ে যাবে।

আরো একটা ঘটনা বলি যারা ICU নিয়ে ভয়ে আছেন তাদের জন্য.. এক ভাইয়া করোনা positive নিয়ে ভর্তি হয় ৫ এপ্রিল.. অবস্থা অনেক খারাপ থাকায় উনাকে ICU তে নিয়ে যাওয়া হয়। উনার ভাষ্যমতে ICUতে ২৪ ঘন্টা nurse থাকে (এই information তাদের জন্য যারা ভাবেন nurse রা শুধু ঘুমাইতেছে দেশের এই crisis moment এ)। যাই হোক উনি করোনার সাথে ICU তে ৩ দিন fight করে normal ward এ চলে আসেন ৯ এপ্রিল। হয়তো গতকাল উনার release হয়ে গেছে।

আমি হাসপাতাল এর যে floor এ ছিলাম সেখানে বেশিরভাগ এর অবস্থাই অনেক stable ছিল.. এই ১০ দিনে আমি মৃত্যু দেখেছি দুইজনের.. আল্লাহ যেন উনাদের সহ আরো যারা করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন সবাইকে কবরের আযাব মাফ করেন এবং বিনা হিসেবে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করেন.. সৃষ্টিকর্তার কাছে এই প্রার্থনা করি.. আমিন।।

এবার আসি ডাক্তার দের নিয়ে যাদের চুলকানি আছে.. এই ১০ দিনের এমন একটা দিনও ছিলোনা যেদিন ডাক্তার রা visit এ আসেন নি। প্রতিদিন দুইবার করে round দিয়ে গেছেন.. রোগীদের সাহস দিয়ে গেছেন.. রোগীদের কথা শুনেছেন.. সেই হিসেবে প্রয়োজনীয় advise দিয়েছেন.. যে রোগের কোনো medicine এখনো পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নাই সেখানে আর কতোটুকুইবা করবে ডাক্তাররা!! আমাকে release দেয়ার আগের দিন এক ডাক্তার আমাদের বলেছিল '' আপনারা release নিয়ে চলে যাবেন আর আমরা এখানে admit হব!! " কুয়েত বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এর সব ডাক্তার - nurse দের সবারই sample নিয়ে গিয়েছিল আইইডিসিআর.. কারন ওরা অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল.. !! তাই বলতেছি ডাক্তার nurse দের সম্মান করতে না পারেন at least গালি দিয়েন না.. একবার শুধু ভেবে দেখুন বর্তমান আক্রান্তের সংখ্যা এখনো ২হাজার এর মধ্যে আছে আর এখনি যদি সব ডাক্তার nurse রা অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে USA, Espana, Italy এর মতো অবস্থা হলে কে আপনাকে চিকিৎসা দিবে?? সৈনিক ছাড়া তো আর যুদ্ধ করা যায় না..!! আর এই করোনা যুদ্ধের আসল সৈনিক তো এরাই.. ডাক্তার.. Nurse..!!!

সবশেষে এই হাসপাতাল নিয়ে কিছু বলবো.. এই ১০দিন ৩ বেলা নিয়মিত খাবার-ঔষধ পেয়েছি...আগেই বলে রাখি ভাই এটা সরকারী হাসপাতাল তাই Isolation room এর কথা মাথাতেও আনবেন না,Vit-C Supplementary দরকার হলে বাইরে থেকে কিনে হাসপাতাল এ ঢুকবেন ...একদমই ভাবতে যাবেন না যে এইগুলো হাসপাতাল provide করবে! হাসপাতাল অনেক পরিস্কার কিন্তু আমরা জাতি হিসেবে অনেক নোংরা.. তাই পরিস্কারের মর্ম আমরা বুঝি না.. এইখানে গিয়ে বুঝতে পারছি যে জাতি 'হাগার' করার পর flash করতে পারেনা সেই জাতিকে Isolation আর quarantine বুঝাতে আরো ১০০বছর অপেক্ষা করতে হবে। মাথায় রাখবেন Government হাসপাতাল এ এক ward এ 6 টা bed এর জন্য একটা toilet.. তাই নিজের নোংরা গুলো নিজে পরিস্কার করে ফেললে তো কোনো দোষের কিছু নেই.. অন্তত আমি দেখিনা.. Cleaner এর জন্য ফেলে রাখার কী দরকার রে ভাই..!! ওরাও তো মানুষ.. ওদেরোতো জানের ভয় আছে নাকি..!!

যাদের আইইডিসিআর নিয়ে অনেক অভিযোগ !
আমি আইইডিসিআর থেকে অনেক support পেয়েছি ...আইইডিসিআর এর সহযোগিতাতেই এত তাড়াতাড়ি বাসায় আসতে পেরেছি..next wk এ আমার আরেকটা test করাবে আর ঐটা negative আসলেই বন্ধ room থেকেও মুক্তি পাব.. সেই দিনের আশায় আছি ....

উপরের সবকিছুই আমি এই ১০ দিনে যা দেখেছি যা বুঝেছি যা অনুভব করেছি তার বহি:প্রকাশ মাত্র...সম্পূর্ণ নিজস্ব মতামত। সাবধানে থাকবেন.. যেহেতু এই রোগের কোনো medicine নেই তাই একমাত্র উপায় হলো নিজের Immune System Boost Up করা.. করোনাকে ভয় না পেয়ে Immune System কে কাজে লাগান.. আর যদি এতটুকু symptomps আপনার মধ্যে দেখা দেয় লুকোছাপা না করে plz test করান.. চিকিৎসা নেন.. আশা করি আল্লাহর দয়ায় ভালো হয়ে যাবেন.. আজাইরা কারনে সিমটম্স লুকিয়ে আশেপাশের মানুষদের আর ডাক্তার দের সংক্রামিত কইরেন না। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন আর আশেপাশের সবাইকে ভালো রাখুন। নিজের ভালো থাকাটা যেমন জরুরী তেমনি আশেপাশের সবাইকে ভালো রাখাটাও আমাদের নৈতিক ও নাগরিক দায়িত্ব। আর সবসময় পরম করুনাময় আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন দেখবেন উনি ঠিকই আমাদের আলোর পথ, আশার পথ দেখাবেন....

-ফাইজ নাফিয়া রহমান এর ফেসবুক থেকে 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা