kalerkantho

সোমবার  । ১৬ চৈত্র ১৪২৬। ৩০ মার্চ ২০২০। ৪ শাবান ১৪৪১

শ্বাসরুদ্ধকর গর্ভযাত্রা

ডা. রেজাউল করিম কাজল   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২১:২৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শ্বাসরুদ্ধকর গর্ভযাত্রা

ছবি ফেসবুক থেকে

ভালোবেসে জেদ করে খালাতো ভাইকে বিয়ে করে জিনিয়া। নিজের পছন্দে যারা বিয়ে করে তাদের দিকে শত বক্র দৃষ্টি তাক করে থাকে। সংসারের সেতুবন্ধন দৃঢ় করতে দ্রুত সন্তান ধারন করে জিনিয়া। কিন্তু গর্ভাবস্থার শেষ দিকে সন্তানের জটিলতা সন্দেহ হওয়ায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয় জিনিয়া। সন্তান প্রসবের মাত্র ১২ ঘণ্টা পরেই নবজাতকের মৃত্যু। সন্তানের মুখ দেখার সুযোগ হয়নি জিনিয়ার। পরের সন্তান গর্ভেই নষ্ট হলো। তৃতীয় সন্তান প্রসবের জন্য ঢাকা আসার সুযোগ হয়নি। মফস্বল শহরের ক্লিনিকেই অপারেশন। আবারও একই পরিণতি। জিনিয়া পোস্ট অপারেটিভ রুমে থাকতেই সন্তান ফিরে গেল সৃষ্টি কর্তার কাছে। জিনিয়ার সংসার চলে তীর্যক দৃষ্টির মুখরোচক আলোচনা হয়ে।

আমার এক স্টুডেন্ট এর কাছে জিনিয়া জানতে পারে গর্ভাবস্থার প্রায় শুরুতেই জানা যায় ভ্রুণের ডিএনএ ঘটিত ত্রুটি যার মাধ্যমে অনাগত সন্তানের পরিণতি কি হবে তাও নির্ধারণ করা যায়। আবারও আশার ক্ষীণ আলো দেখে জিনিয়ার গর্ভধারণ। সময়মতো আমার স্টুডেন্ট জিনিয়াকে পাঠায়। দীর্ঘ কাউন্সেলিং এর পর জিনিয়া ও তার স্বামীর রক্তের নমুনা, গর্ভাবস্থায় ১৫ সপ্তাহে এমনিওটিক ফ্লুইড (গর্ভাবস্থায় ভ্রুণের চারপাশের তরল যার মধ্যে ভ্রুণের ডিএনএ থাকে, ১১ সপ্তাহে গর্ভফুলের নমুনা সংগ্রহ করা হয় তবে দেশের বাইরে পাঠালে নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে) পাঠানো হলো ভারতের বিখ্যাত ডিএনএ ল্যাব মেডজেনোম এ। পরীক্ষার নাম ট্রায়ো ক্লিনিক্যাল এক্সোম সিকোয়েন্সিং অর্থাৎ জিনিয়া ও তার স্বামীর প্রায় সাড়ে আট হাজার গুরুত্বপূর্ণ ডিএনএ (জীন) দেখা হবে। এর মধ্য যে সমস্ত সন্দেহজনক ডিএনএ বা জীনগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের অনাগত সন্তান পেতে যাচ্ছে তা নির্ণয় এবং তার পরিণতি নির্ধারণ করা যাবে। উত্তর মিলবে ডিএনএ ঘটিত ত্রুটিই জিনিয়ার সন্তানদের মৃত্যুর জন্য দায়ী কি না।

নমুনা পাঠানোর তিন সপ্তাহের মধ্য রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা। দুই সপ্তাহ পর মেডজেনোম ল্যাব এর ডিএনএ বিশেষজ্ঞের ফোন, 'ডা. কাজল, আপনার পাঠানো নমুনা নিয়ে আমরা একটা সমস্যায় পড়েছি, এই নমুনা থেকে প্রচলিত পদ্ধতিতে কোনভাবেই ডিএনএ পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। গত ২০ বছর যাবত আমি ডিএনএ নিয়ে কাজ করি, কখনোই এই সমস্যায় পড়িনি, আপনি কাইন্ডলি আবার নমুনা পাঠান।'

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এখন জিনিয়ার ১৭ সপ্তাহ গর্ভধারণ চলে। আবারো তাকে বোঝানো হলো, আবারও নমুনা পাঠানো হলো। মেডজেনোম ল্যাব নমুনা হাতে পেয়ে জানালো, বিষয়টি তারা সারা পৃথিবীর ডিএনএ ল্যাব বিশেষজ্ঞদেরকে জানিয়েছে।

কয়েকদিন পর ফ্রান্স এর এক ডিএনএ বিশেষজ্ঞ ফোন করলেন। 'ডা.কাজল, তোমার রোগী জিনিয়া ও তার স্বামী পরস্পর খালাতো ভাই-বোন। তাদের পুর্বপুরুষেরা কেউ পাকিস্তান, ইরান, লেবান বা তুরস্ক থেকে আগত হতে পারে?'

আমি বললাম, হ্যাঁ, হতে পারে, কারণ আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তাদের পুর্বপুরুষেরা পাকিস্তানের হতে পারে। তিনি জানালেন, 'তাহলে আমরা একটা বিরল ডিএনএ ঘটিত ত্রুটির কথা চিন্তা করছি। পরে নিশ্চয় কথা হবে।' 

তিন সপ্তাহ যেন আর শেষ হয় না। ২০ সপ্তাহে জিনিয়া পেটে বাচ্চার নড়াচড়া অনুভব করে, আমাদের হৃদস্পন্দনের গতি দ্রুত হয়। জিনিয়ার আগে অপারেশন করা আছে, রিপোর্ট খারাপ আসলে বাচ্চা না রাখার ব্যাপারটা আবারো ফলশুন্য অপারেশনে গড়াতে পারে।

পার হলো অপেক্ষা, রিপোর্ট আসলো। জিনিয়া ও তার স্বামী সুপ্তভাবে বিরল এক জেনেটিক /ডিএনএ রোগ এস্কোবার ডিজিজ (Escobar disease /Syndrome) এর বাহক। তাদের অনাগত সন্তান উত্তরাধিকার সূত্রে কোন একজনের (Heterozygous) সেই রোগের ডিএনএ /জীন পেয়েছে। রিপোর্ট হাতে নিয়ে ফোন করলাম এই রোগের কথা চিন্তা করা ফ্রান্সের সেই বিশেষজ্ঞকে। বললাম, রিপোর্ট পেয়েছি কিন্তু অন্য সব রিপোর্টের মতো বাচ্চা ভালো হবে না খারাপ হবে তা তো লেখা নেই। বাচ্চার বাবা মাকে কি বলবো? 

তিনি জানালেন, এস্কোবার রোগের ডিএনএ এ পর্যন্ত মাত্র ১২টি পরিবারে মোট ৫২ জন মানুষের দেহে পাওয়া গেছে। ৯টি পরিবার পাকিস্তানে, ১টি ইরানে, ১টি লেবাননে ও ১টি তুরস্কে। ওইসব পরিবারে যারা আত্মীয় স্বজনের মধ্যে দিয়ে সাদী করেছিল তাদের সন্তান কেউ কেউ বাবা মা উভয়ের, কেউ কেউ শুধু একজনের( Heterozygous), এবং কখনো কখনো শুধু ছেলে সন্তানরা মারা গেছে। এই সীমিত তথ্য সরাসরি বলা সম্ভব নয়, জিনিয়ার সন্তান ভালো কি না। 

আমি চুপ করে আছি। পরামর্শ দিলেন, 'একটা কাজ করতে পারো,খুব ভালো আলট্রাসাউন্ড করতে পারে এমন কেউ থাকলে তাকে দিয়ে গর্ভের বাচ্চার আল্ট্রাসাউন্ড করাও। এর আগে সারা পৃথিবীতে যে কয়টা এই রকম বাচ্চার গর্ভাবস্থায় ছবি আছে তা আমি পাঠাচ্ছি, তুমি সেই রকম ছবি পাঠাও।' 

আমরা বাচ্চার প্রত্যকটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ছবি, তার কার্যকারিতা অর্থাৎ বাচ্চা চোখ মেলে তাকায় কিনা, আঙুল চোষে কি না, ঢোক গিলে কিনা, প্রস্রাব করে কিনা, বাচ্চার ইকো (Fetal Echo) ইত্যাদির বিস্তারিত ভিডিও ক্লিপ (গর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসাউন্ড) নিয়মিত ব্যবধানে শেয়ার করি। আমি আল্ট্রাসাউন্ড মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকি আর জিনিয়া আমার কপালের ভাঁজ খেয়াল করে। ওর মুখের দিকে সরাসরি তাকাতে পারিনা, যদি আবার প্রশ্ন করে 'স্যার, বাচ্চা এবার বাঁচবে তো? আপনার উপর অনেক ভরসা করে এসেছি'।

যতই দিন যায়, আশায় বুক বাঁধি। আল্ট্রাসাউন্ড এর সবকিছুই ভাল আসতে থাকে। ৩৭ সপ্তাহ পার করে সন্তান প্রসবের দিন ঠিক করা হলো। নবজাতক, বিশেষজ্ঞ, শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ আগেই সবকিছু জেনে প্রস্তুত।

একে তো আগে বার বার অপারেশন করা দেহে ছুরির সতর্ক সঞ্চালনে মনোনিবেশ, অন্যদিকে জিনিয়া বাচ্চার কান্না শুনবে কিনা এই টেনশনে আমার হার্টের আয়ুর উপর চাপ। জিনিয়ার বাচ্চার কান্নার চিৎকারে টিমের সবার অট্টহাসি। বুকের উপর থেকে পাথর নামলো।

৩ দিন হাসপাতালে থাকার পর জিনিয়া কে ছুটি দিয়ে বললাম ৪ দিন পর আবার আসতে। জিনিয়ার বিছানার পাশে তার স্বামী, আত্নীয় স্বজন দাড়ানো। সবার মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি। অপারেশনের শরীর নিয়ে জিনিয়া বিছানা থেকে উঠে এলো। আমার বুকে মাথা রেখে কান্নাজড়িত একটা বাক্য 'স্যার, আপনার জন্যই বেঁচে থাকলাম।'

৪ দিন পর জিনিয়া তার সন্তানকে আমার কোলে দিয়ে প্রথম ছবি তুললো। আর ৪ দিনের জন্য আমিও চলে গিয়েছিলাম আমার সন্তানদের নিয়ে, আমার দুরন্ত শৈশবের অনুভবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অবস্ ও গাইনী বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা