kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

বাংলাদেশের শিবিরে বসে রোহিঙ্গা কবির কবিতা পাঠ, মিয়ানমারে মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতারা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ১৫:০৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাংলাদেশের শিবিরে বসে রোহিঙ্গা কবির কবিতা পাঠ, মিয়ানমারে মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতারা

অনুষ্ঠানটা হচ্ছে মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুনে। কবিতা পাঠের আসর। সেখানে দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ৪০ জন বার্মিজ কবি অংশ নিয়েছেন। অংশ নিয়েছেন ৬ জন রোহিঙ্গা কবি। একজন স্কাইপেতে স্বরচিত কবিতা পাঠ করছেন। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো ডিজিটাল পর্দায় তাকিয়ে আছেন, কবিতা শুনছেন তার। কবি মাইয়ু আলী তার কবিতা আবৃত্তি করছেন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে বসে। 

প্রসঙ্গত, ইয়াংগুনের এই আয়োজনের ব্যানারে লেখি ছিল 'পোয়েট্রি ফর হিউম্যানিটি'। তার নিচে লেখা ছিল 'পোয়েট্রি ফ্রম কক্সবাজার রিফ্যুজি ক্যাম্প'। 

জের ফেসবুক পোস্টে মাইয়ু আলী লিখেছেন, গতকাল ইয়াঙ্গুনে অনুষ্ঠিত 'পোয়েট্রি ফর হিউম্যানিটি' আয়োজনে স্কাইপেতে আমি আমার কবিতা পড়েছি...চতুর্থবারের মতো আমি মিয়ানমারের রাজধানীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করলাম। 

রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে মাইয়ু আলীর সঙ্গে আরো ৪ কবি ছিলেন। তারা হলেন- মাউং আবদুল খান, আজাদ মোহাম্মদ, রো আনামুল হাসান এবং শাহিদা উইন। ছয়জন অংশগ্রহণের কথা থাকলেও ৫ জন অংশ নিয়েছেন। আরেকজন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে অংশ নিতে পারেননি। তবে তার কবিতা আমাদের প্রকাশিত কাব্যেগ্রন্থের মধ্যে একটা মাইলস্টোন। আমাদের কবিতার কপি ইয়াঙ্গুনে উপস্থিতদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে গতকাল। 

মাইয়ু লিখেছেন, গতকাল ওই অনুষ্ঠানে বার্মিজ শ্রোতাদের উপস্থিতিতে সৃষ্ট পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে আমি শিহরিত। যেভাবে তারা আমাদের স্বাগত জানিয়েছেন, সদ্ব্যবহার দেখিয়েছেন এবং বিদায়ের সময় হাত নেড়ে গুডবাই জানিয়েছেন, তাতে আমরা উদ্বেলিত। আমি এটাই দেখতে চেয়েছিলাম। এখন কবিতা আমার জন্যে আশা জাগানিয়া। 

কবিতার মাধ্যমে আমি বার্মিজ ভাই-বোনদের দেখাতে চাই আমরা আসলে কে? আমরাও আমাদের মিয়ানমারকে ভালোবাসি। বার্মিজ সাহিত্যের আরাধনা করি আমরা। কবিতার মাধ্যমে বিপ্লবে বিশ্বাসী। আমরা সবাই মিয়ানমারে শান্তি দেখতে চাই এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আমাদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে একসাথে বাস করতে চাই। আমি বিশ্বাস করি সাহিত্যের মাধ্যমে শান্তি আসাটা খুবই শক্তিশালী বিষয়। 

আমরা কবিতার মাধ্যমে শান্তিপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় নিয়মিত থাকবো। ভবিষ্যতে আমরা আরো অনেক কিছু করতে চাই। আশা করি, একদিন আমরা এই আয়োজনে উপস্থিত থেকে অংশগ্রহণ করতে পারবো এবং কবিতার আলোয় মাখামাখি করতে পারবো। 

গতকালের অনুষ্ঠানের দুটো সেরা বিষয় খুঁজে পেয়েছি আমরা। এক, বার্মিজ আয়োজক এবং শ্রোতারা আমাদের গ্রহণ করে নিয়েছেন। তারা আমাদের জাতিগত পরিচয়কে গ্রহণ করেছেন। তারা আমাদের রোহিঙ্গা কবি হিসেবে স্বীকার করে নেওয়ার সাহস দেখিয়েছেন। দ্বিতীয়, আমাদের মধ্যে একজন নারী কবির অংশগ্রহণ। পুরুষতান্ত্রিক রোহিঙ্গ সমাজে নারীদের কথা অনেক সময়ই ভুলে যাওয়া হয়। শাহিদা উইন তার কবিতা পাঠ করে শুনিয়েছেন। তার আবৃত্তি ছিল অসাধারণ। 

পোস্টের শুরুতেই মাইয়ু লিখেছেন, আমাদের নানা ছিলেন অঞ্চলের পরিচিত কবি। আমার মা তাকে অনুপ্রাণিত করতেন। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন এই দুই কণ্ঠ থেকে আমি কবিতা এবং লোকগাথা শুনতাম। 

তিনি আরো লিখেছেন, বার্মিজদের মধ্যে কবিতার মাধ্যমে বিপ্লব এক ঐতিহ্য। কলোনিয়াল যুগে বার্মিজ কবি এবং লেখকরা মিয়ানমারে কলোনিয়াল আগ্রাসন আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন কবিতার মাধ্যমে। 

২০১৮ সালের মার্চে আমরা একসাথে আর্ট গার্ডেন রোহিঙ্গা প্রতিষ্ঠা করি। এটা অনলাইন রোহিঙ্গা কমিউনিটি আর্ট ওয়েবপেজ। এখন পর্যন্ত আমরা ৫ শতাধিক কবিতা বার্মিজ এবং ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করেছি। এখন আমাদের সাথে ২ শ'র মতো তরুণ কবি আর ৮ জন নারী কবি আছেন। আমি রোহিঙ্গাদের নতুন প্রজন্মের হাতে কেবল বই আর কলম দেখতে চাই। কবিতা তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। 

মিয়ানমারে যুগকাল ধরে চলমান নিপীড়ন আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বিভিন্ন সীমান্তে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আজ আমার কবিতা মিয়ানমারের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সেতুবন্ধন নির্মাণ করছে। 

পোস্টের শেষে আয়োজকদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন রোহিঙ্গা কবি মাইয়ু আলী। 

(মাইয়ু আলীর ফেসবুক থেকে) 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা