kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

'এই প্ল্যাকার্ড নিয়ে তুমি কেন ভিসির অফিসে যাচ্ছো না?'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৭ নভেম্বর, ২০১৯ ১০:৩৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



'এই প্ল্যাকার্ড নিয়ে তুমি কেন ভিসির অফিসে যাচ্ছো না?'

২১ নভেম্বরের পোস্টে লেখা হয়েছে- 

বাধ্যতামূলক ছুটি অবৈধ, হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানিয়ে অর্থনীতি বিভাগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে কাজে আবার যোগদান করলাম।

এই পোস্টটি লেখা হয়েছে ২৫ নভেম্বর-

শিক্ষকতায় ফেরার পথটা বেশ কঠিন হবেই বলে মনে হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবারে যোগদানের কাগজপত্র জমা দেয়ার পরে গতকাল বিভাগের মাধ্যমে রেজিস্ট্রার বরাবর চিঠি দেয়ার জন্য অর্থনীতি বিভাগের অফিসে জমা দিতে গেলাম। দিতে গিয়ে একটা ধাক্কা খেলাম।

অফিস থেকে আমাকে জানানো হলো যে চেয়ারম্যান স্যার জানিয়েছেন উনার অনুমতি ছাড়া কোনো চিঠি রিসিভ করা যাবে না।

যত জটিল বিষয়ই হোক চিঠি রিসিভ করা যাবে না সেটি জীবনের এই প্রথম শুনলাম। তখন চেয়ারম্যান স্যারের সাথে দেখা করতে গেলাম। দেখি উনি বেশ ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আমি উনাকে বললাম ডিপার্টমেন্ট থেকে চিঠি রিসিভ করছে না।

তখন উনি বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে কিছু না জানালে আমরা এ বিষয়ে কিছু করতে একদম অপারগ। বিষয়টি শুনে আমি খুবই অবাক হলাম। বিভাগের চেয়ারম্যান হচ্ছে প্রশাসনিক বিষয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তি। উনার দায়িত্ব বিভাগের শিক্ষকদের বিষয় নিয়ে প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা। আর একজন শিক্ষকের চাকরি নিয়ে এইরকম জটিলতা তো যথেষ্ট জরুরি একটা বিষয়। কিন্তু উনি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যেতে চাইলেন।

কিন্তু তারপরেও চিঠি রিসিভ না করার বিষয়টি একেবারেই বোধগম্য না। উনাকে জিজ্ঞেস করলে এর সদুত্তর না দিয়ে বার বার বলতে লাগলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কিছু না জানালে তিনি কিছু করতে পারবেন না। এই বলে চলে গেলেন। আজকে ফোনেও এই একই কথা বার বার বললেন।

আমি বিভাগে উপস্থিত কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের বললাম আপনারা চিঠি রিসিভ না করলে আমি কি এই চিঠি এখন মাথায় নিয়ে ঘুরবো? তাঁরা আমার দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকলো। শেষমেশ আর উপায়ন্তর না দেখে চেয়ারম্যান স্যারের কক্ষে ঢুকে উনার টেবিলের ওপর চিঠি রেখে আসলাম।

২৬ নভেম্বরের পোস্টে তিনি লিখেছেন- 

আজকের দিনের ঘটনা নিয়ে কতটুকু জল ঘোলা হবে জানি না, একটু বিস্তারিত বলি।

ছবির প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলাম অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান মহোদয়ের কক্ষের সামনে। এক ফাঁকে অন্যদিকে গিয়েছিলাম। তারপর এসে শুনলাম তিনি এসেছেন শুনে দেখা করতে গেলাম। জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন ছিল যে তিনি আমার গতকালকের রেখে দেয়া চিঠি পেয়েছেন কিনা।

দরজা ফাঁক করে উঁকি দিলাম। উনি বললেন কি বিষয়? আমি একটু ভেতরে ঢুকতে আমার প্ল্যাকার্ডে উনার চোখ পড়ল। উনি আমাকে ডাকলেন ভেতরে আসতে। আসতেই বললেন তুমি কেন বারবার আমার কাছে আসছো? এই প্ল্যাকার্ড নিয়ে তুমি কেন ভিসির অফিসে যাচ্ছো না? আমি কি করতে পারি?

আমি বললাম, স্যার, আপনাদের অভিযোগের ওপর ভিত্তি করেই তো উনারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই আপনারাই পারেন এর সুষ্ঠ সমাধান করতে। তাছাড়া বিভাগীয় প্রধান হিসেবে এই বিষয়টি নিয়ে সুষ্ঠ সমাধানের চেষ্টা করাটা আপনার দায়িত্বের ওপরেও পরে।

এই ধরনের কথোপকথনের এক পর্যায়ে উনি হঠাৎ প্রচণ্ড ক্ষেপে গেলেন। লাফ দিয়ে উঠে যেয়ে বললেন,  তুমি আমার সাথে আসো। আমি পেছনে পেছনে গেলাম। উনি বিভাগের দু'একজন কর্মচারীকে বললেন বাকী শিক্ষক যারা যারা আছেন সবাইকে খবর দিতে।

তো খবর পেয়ে একজন দুইজন করে আসলো। প্ল্যাকার্ড হাতে আমাকে চিড়িয়াখানা থাকা কারো দিকে তাকিয়ে থাকার মতন করে তাকিয়ে কেউ কেউ চলে গেলেন। তবে একজন শিক্ষক পুরোটা সময় থাকলেন। তিনি সেই ২০১১ সাল থেকে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সত্য মিথ্যার প্রলেপ মিশিয়ে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন শিক্ষক শিক্ষিকাকে উত্তেজিত করেছেন। আমাকে দুই দুইবার বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর পেছনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

আট নয় বছরেও দেখলাম এই বিষয়ে ওনার উৎসাহের বিন্দুমাত্র কমতি নেই। আমি ওনার এই বিষয়টিতে এই রকম অধ্যবসায় দেখে বিমোহিত হলাম। হয়তো তিনি এইবারেও সফলকাম হবেন।

যাই হোক, কিছুক্ষণ পরে একজন সহকারী প্রক্টর আসলেন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান স্যার বিভাগের কর্মচারীদের সামনে আমাকে প্রচুর বকাঝকা করলেন। এরপর সহকারী প্রক্টর , চেয়ারম্যান স্যার আর ওই প্রচণ্ড উৎসাহী শিক্ষক মিলে অনেকক্ষণ চেয়ারম্যানের কক্ষে আলাপ আলোচনা করলেন। তারপর ওনারা বেরিয়ে গেলেন। আমিও আরো কিছুক্ষণ প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে আসলাম।

তো এর মধ্যে কিছু কিছু ছাত্র-ছাত্রী এসে আমার পাশে দাঁড়ালো। আমি খুবই অবাক হলাম। কারণ আমি আমার বাধ্যতামূলক ছুটির বেশিরভাগ সময়েই দেখেছি ছাত্র-ছাত্রীরা আমার সাথে কথা বলতে খুবই অস্বস্তি বোধ করে। খোঁজ নিয়ে জেনেছি বিভাগে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে আমার সাথে সোশাল মিডিয়া বা অন্য কোনভাবে যোগাযোগ থাকলে ইট হ্যাজ কনসিকোয়েন্স। কি ধরনের সেটা নিশ্চয়ই খোলাসা করে বলে দিতে হবে না।

তো ওরা এসে আমার সাথে কিছু কথা বললো। আমি বললাম, তোমাদের দেখি অনেক সাহস! কারো কারো চোখে মুখে বিষাদ বেদনার ছাপ খুবই স্পষ্ট। একজন বলল স্যার, আমরা তো প্রতিবাদ করা ভুলেই গেছি। তাই আপনাকে দেখে খুবই অবাক লাগে। আরেকজন তো আমার পাশে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তার চোখ ছল ছল। বলল, ভাবছি আমি আপনার পাশেই থাকি সারাক্ষণ।

আমি বললাম, দেখো এই নিয়ে তোমরা ঝামেলায় পড় সেটা আমি কোনমতেই চাই না। এইটা আমার একান্তই ব্যক্তিগত যুদ্ধ। এটা আমি একাই লড়ে এসেছি। হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া কাউকেই পাশে পাই নাই। এটা একা লড়তে লড়তেই আমি অভ্যস্ত। এর জন্য আমি আমার ছাত্র ছাত্রীদের বিপদে ফেলতে চাই না।

বিদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতাম। তারপর এসে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম। সেখানে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কেন?

আমাকে এইরকম একটাই প্রশ্ন আজকে আমি যখন প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, একজন ছাত্রী প্রশ্ন করেছিল? স্যার আপনি কেন এইখানে আছেন? কেন আপনি এরকমভাবে সাফার করছেন?

আমি উত্তর দিলাম, আমি এইখানে আছি, সাফার করছি, যুদ্ধ করছি, সংগ্রাম করছি, তোমাদের জন্যই। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি ছাত্র ছাত্রীদের পড়াতে। তাঁদের শেখাতে, তাঁদের জীবনে সামান্য কিছু হলেও জ্ঞান, দক্ষতা এনে দিতে যেটা তাঁদের পরবর্তী জীবনের সহায়তা করতে। আমার কারণে যদি একটিও ছাত্র বা ছাত্রীর জীবনে পজিটিভ কোনো পরিবর্তন আসে, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে?

আমার কাছে মনে হয় বাংলাদেশে এইটাই আমার জন্য সবচেয়ে মহত্তম কাজ। এর চেয়ে বেশি সন্তুষ্টির কাজ আমার জন্য এই দেশে আর নেই। তাই আমি এখানে মাটি কামড়ে পড়ে আছি। থাকব।

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরীদির ফেসবুক থেকে)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা