kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

প্রতি রাতেই চলতো শারীরিক নির্যাতন : সৌদিফেরত সুমি

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ২০:১২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রতি রাতেই চলতো শারীরিক নির্যাতন : সৌদিফেরত সুমি

সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে ফেরত আসা গৃহকর্মী সুমি আক্তারকে তার বাবা মায়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে তাকে পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল, বোদা ইউএনও সৈয়দ মাহমুদ হাসান, পাঁচপীর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান হুমায়ূন কবীর প্রধানের উপস্থিতিতে সুমিকে তার বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা মল্লিকা বেগমের কাছে হস্তান্তর করেন।

এরপর ঢাকা থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্সে করে সুমি বাবা মায়ের সঙ্গে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপীর ইউনিয়নের বৈরাতি সেনপাড়া গ্রামে যান। এসময় সুমি সৌদিতে থাকা প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসে তার ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দেন।

বোদা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সুমি জানান, অষ্টম শ্রেণি পাশ করা সুমি দুইবছর আগে ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে যোগ দেন। সেখানেই নুরুল ইসলাম নামের আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকার এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ঢাকায় যাওয়ার ছয় মাস পর তাকেই বিয়ে করেন সুমি। গত ৩০ মে স্বামী নুরুল ইসলাম ‘রূপসী বাংলা ওভারসিজ’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে গৃহকর্মী ভিসায় সৌদি আরবের রিয়াদে পাঠান। সেখানে যাওয়ার পর প্রথম কর্মস্থলে মালিক তাকে মারধর, হাতের তালুতে গরম তেল ঢেলে দেওয়া এবং কক্ষে আটকে রাখাসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতন করতেন। একপর্যায়ে সুমি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন ওই মালিক তাকে না জানিয়ে ইয়েমেন সীমান্ত এলাকা নাজরানের এক ব্যক্তির কাছে প্রায় ২২ হাজার রিয়ালে বিক্রি করে দেন।

সুমি জানান, ওই মালিকও তাকে নির্যাতন করতেন। উদ্ধার হওয়ার আগে ১৫দিন তাকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছিল। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয়নি। তার নিজের মুঠোফোনটিও তারা নিয়ে নিয়েছিল। এক সময় খুব কান্নাকাটি করে স্বামীর সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য মোবাইলটি চেয়ে নেন তিনি। তারা মোবাইলটি দিলে, বাথরুমে গিয়ে একটি ভিডিও ধারণ করেন। সেই ভিডিওতে নিজের নির্যাতনের কথা বর্ণনা দেন তিনি। ভিডিওটি সঙ্গে সঙ্গে তার স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দেন।

পরে ওই ভিডিওটি সুমির স্বামী সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জানান। বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সুমিকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়। সৌদিতে নিযুক্ত বাংলাদেশি কনস্যুলেট আব্দুল হক সৌদি পুলিশের সহযোগিতায় সুমিকে উদ্ধার করে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

সুমি আরও বলেন, ‘বাবা-মায়ের নিষেধ অমান্য করেই স্বামী নুরুল ইসলামে প্ররোচনায় পড়ে সৌদিতে পা দেই। আমি যেভাবে নির্যাতন হয়েছি, তা সবাই ভিডিওর মাধ্যমেই জেনেছেন। আর নতুন করে কিছু বলতে চাচ্ছি না। ওখানো আমার ওপর কী ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে, এটা আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন।’

দালালচক্র তাকে বিক্রি করে দিয়েছে একথা জানতেন না বলে উল্লেখ করেন সুমি। তিনি বলেন, ‘প্রতি রাতেই শরীরের ওপর চলতো নির্যাতন। প্রতিবাদ করলেই শুরু হতো মারধর। একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়তাম। কিন্তু তাতে তারা থেমে যেত না। ওই অবস্থায়ই শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। জ্ঞান ফিরলে বুঝতে পারতাম সেটা। কাজ করতে গিয়ে কেন আমাকে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হলো?’

সুমি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা না পেলে আমি হয়তো বাংলাদেশে ফেরত আসতে পারতাম না। আমাকে উদ্ধারের জন্য যারা সহযোগিতা করেছেন এবং আমাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনায় প্রধানমন্ত্রীসহ সকলকে ধন্যবাদ।’

জানা গেছে, দুইবছর আগে আশুলিয়ার চারাবাগের নূরুল ইসলামের সঙ্গে বিয়ে হয় সুমির। বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন, আগেও একটি বিয়ে করেছেন তার স্বামী। শেষমেশ বাধ্য হয়ে নূরুলের প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে সংসার শুরু করেন তিনি। বিয়ের দেড় বছর পর সুমির একটি সন্তানও হয়। পরে  বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তে চলতি বছরের জানুয়ারিতে গৃহকর্মীর প্রশিক্ষণ শেষ করেন তিনি। তাকে বিনামূল্যে সৌদি আরবে পাঠানোর লোভ দেখায় দালালেরা। শেষমেশ মে মাসে সৌদিতে পাড়ি জমান সুমি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা