kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

'শুনেছি সমস্যায় আছেন... আসেন তো বসি'

আরিফ আর হোসাইন   

২৭ অক্টোবর, ২০১৯ ১৬:৫৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



'শুনেছি সমস্যায় আছেন... আসেন তো বসি'

প্রতিদিন ফোন আসে, “আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান, সে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে আছে... প্রতিদিন আমি বেড ভাড়া দেই ২০০ টাকা”

আমি ‘হ্যা আচ্ছা দেখি’ বলে ফোন রেখে দেই

প্রতি সন্ধ্যায় ফোন আসে নাসরিন শুধা নামের এক মেয়ের কাছ থেকে... টাকার অভাবে তার মায়ের ডায়ালায়সিস গত দেড় মাস থেকে বন্ধ

ইদানিং ফোন ধরি না মেয়েটার, কান্না শুনতে ভালো লাগে না

মেয়েটা প্রতিদিন নতুন নতুন নম্বর থেকে ফোন দেয় কারণ আমি ফোন ধরি না

মোবাইলের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারি সেই ফোন দিচ্ছে

কান্না শোনা থেকে রিং টোন শোনা ভালো তাই ফোন ধরি না

সে টানা আধা ঘণ্টায় ৬০/৭০ বার ফোন দিলো ধরছি না দেখেও... তারপর হয়ত ‘তেমন কিছুই হয়নি’ চেহারা নিয়ে তার মায়ের কাছে যেয়ে বসে

পরের দিন আবার তার ফোনের ঝড়

আমি শিওর তার বাসায় অপরিচিত কেউ বেড়াতে গেলেও সে খুশি হয় ভেবে যে এখন মেহোমানের ফোন থেকে ফোন করা যাবে ‘যদি আরিফ ভাই এই ফোনটা ভুলেও ধরে ফেলে’ এই আশায়

প্রতি সপ্তাহে গোলাম সারোয়ার নামে আরেক ভদ্রলোক আমাকে হাতে লিখে চিঠি পাঠান তার স্ত্রীর ব্যাপারে কিছু করার জন্য

তার স্ত্রীর ক্যান্সার হয়েছে... কিন্তু ক্যামো দেয়ার টাকা নেই তার কাছে

প্রচণ্ড ঝকঝকে হাতের লেখা তার

সুন্দর করে সালাম দিয়ে চিঠি শুরু করেন... প্রতিটা চিঠির শুরু হয় কিভাবে তাদের বিয়ে হলো সেই কাহিনী দিয়ে। শেষের দিকে এসে লেখেন কিভাবে গ্রামের জমি জমা এবং বিয়ের সময় কেনা ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে তিনি চিকিৎসা খরচ উঠানোর চেষ্টা করছে

প্রচণ্ড ঝকঝকে হাতের লেখা তার

চিঠির শেষে একটা লাইনে উনি ইনিয়ে বিনিয়ে বলেন, তিনি তার স্ত্রীকে টাকার অভাবে মরতে দেখতে চান না এই অবস্থায় উনার করণীয় কি?

আমি সব চিঠিগুলো পড়ে, একটা ফাইলে রেখে দেই

আর এই ফাইলটা টেবিলের অন্য ফাইলগুলোর নিচে এমন ভাবে রেখে দেই যেন সহজেই আমার চোখে না পরে

ইদানিং ফান্ড রেইজিং নিয়ে লেখা বন্ধ করে দিয়েছি

অনেককে নিয়ে বিশ্বাস করে লিখেছিলাম কিন্তু পরে দেখা যায় বিশ্বাসটা তারা রাখেনি

সেই থেকে মন খারাপ করে ঠিক করেছি আর ফান্ড রেইজিং নিয়ে কোন পোস্টই দিবো না

কিন্তু চিঠি, এসএমএস আর ফোন ধরছি না দেখে একটার পর একটা অন্য নাম্বর থেকে ফোন প্রতিদিন আসতেই থাকে

রাতে ঘুমাতেও পারি না ঠিক মত

কেউ তার মেয়ের জন্য, কেউ তার মায়ের জন্য আর কেউ তার স্ত্রীর জন্য প্রতি মুহূর্তে বসে আছে আমার আশায়

শুধু আমার একটা ‘লেখার’ আশায়

তাদের ধারনা আমি লিখলে ম্যাজিকের মতো সুস্থ হয়ে উঠবে তার মা’টা বা স্ত্রীটা

কিন্তু আমি লিখিনা কারণ আমি জানি ফেসবুকে দিন দিন মানুষের অনুভূতি ভোতা হয়ে গিয়েছে

এখন লাইক কমেন্ট আর শেয়ার দিয়েই মানুষ তাদের দায়িত্ব শেষ করে ফেলে

একটা স্ট্যাটাসে মুহূর্তে ১০ হাজার লাইক উঠে আসবে কিন্তু সেই স্ট্যাটাস দিয়ে ১০ হাজারটা টাকা উঠিয়ে আনা অতো সহজ নয়

তাই মাঝে মাঝে রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবি, ‘ওদের নিয়ে দিয়েই দেই লেখা... তারপর টাকা না উঠলে বুঝবে মজা... আমাকে তারপর থেকে আর জ্বালাবে অন্তত না’

আবার ভাবি, ‘না থাক লেখা না দেই, দেয়ার পর টাকা না উঠলে তখনের কষ্টের থেকে এখনের কষ্ট তো কিছুটা হলেও কম ... একটা আশায় তো এখন অন্তত আছে এটাই বা কম কি’

আমি জানি না এদের নিয়ে লিখে আজ কি লাভ হবে তবে আমি কিছুটা দায় মুক্ত হওয়ার জন্যই লিখছি

আমি আর নিতে পারছি না

আমিও ঘুমাতে চাই রাতে শান্তিতে

হানিফ নামের সেই পাগল বাবাটার নম্বর 01720457318, যে প্রতিদিন আমাকে রুটিন করে ফোন করে কিছুনা কিছু বলে ... ‘জানেন আজকে বাবুটারে ইঞ্জেকশান দেয়ার সময় হাসছে...আচানক না ব্যাপারটা ভাইসাব? ইঞ্জেকশান দিলে কাতুকুতু লাগে নাকি!! পোলাটা মনে হয় পেটবেক্কল হইসে’

নাসরিন শুধার নম্বর 01989456638... যে প্রতি সপ্তাহে তার মায়ের ডায়ালায়সিসের করার খরচ উঠাতে না পারার পরেও স্বপ্ন দেখছে তার মায়ের কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের সে করেই ছাড়বে

আর এটা, 01928427689 সারোয়ার নামের লোকটার নম্বর যিনি প্রতি সপ্তাহে চিঠি লিখে ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝায়, ‘তিনি তার স্ত্রীকে মরতে দেখতে চান না তাই এই অবস্থায় উনার করণীয় কি?’

ইচ্ছে এবং সামর্থ্য থাকলে ফোন করে চমকে দিতে পারেন তাদের

ট্রাস্ট মি তারা একটুও চমকাবে না... তারা ধরেই বসে আছে একদিন কেউ না কেউ উনাদের ফোন করে বলবে, “শুনেছি প্রবলেমে আছেন... আসেন তো বসি”

- ফেসবুক থেকে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা