kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাগানে পরিত্যক্ত বৃদ্ধা মা, উদ্ধার করলেন ওসি (ভিডিওসহ)

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ১৫:৪৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাগানে পরিত্যক্ত বৃদ্ধা মা, উদ্ধার করলেন ওসি (ভিডিওসহ)

বৃদ্ধাকে এ অবস্থাতেই দেখতে পান ওসি আমিনুল ইসলাম

চারদিকে অন্ধকার, মোবাইলের আলোতে আশপাশটা দেখা যাচ্ছে। এক যুবকের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। তার সঙ্গে কিছুটা ধমকের সুরেই কথা বলছেন খুলনার ডুমুরিয়া থানার ওসি আমিনুল ইসলাম। পুলিশ কর্মকর্তার কর্কশ কণ্ঠের কারণটা বোঝা গেলো। যুবকের কাছে পুলিশ অফিসার জানতে চাইলেন তার মা কোথায়? ছেলে হাতের ইশারায় একটু দূরে অন্ধকারের দিকে দেখিয়ে দিলেন। ওদিকে এগোলেন সবাই। সেদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঘাসের ওপর মাদুর পেতে একাকী শুয়ে আছেন বৃদ্ধা মা। 

পুলিশ কর্মকর্তা: মা কোথায়? জায়গাটা দেখাতো তোর মা কোথায়? 

ছেলে: মা এইখানে (হাতের ইশারায়)।

পুলিশ: কোথায়? আমাক দেখাতো, জায়গাটা দেখাতো...দেখা...তুই ঘরে তোর মা এ জায়গায় কেন?

ছেলে মিনমিনে কণ্ঠে কারণ দর্শানোর চেষ্টা করলেন। আবারো পুলিশের ধমক, 'তুই বউ নিয়ে ঘরের মধ্যে ঘুমাচ্ছিস, আর তোর মা এই জায়গায় ঘুমায়ে আছে? 

খুলনার ডুমুরিয়ায় এমনই এক ঘটনার ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সরকারের দেওয়া ঘরে থেকে বের করে দিয়েছেন তার ছেলে ও বউরা। বৃদ্ধার এক ছেলে জগন্নাথ পাল। তার সঙ্গেই কথা হচ্ছে পুলিশ কর্মকর্তার। বড় ছেলে গৌর পাল। বৃদ্ধা মা ময়না পালকে কেবল ঘর থেকেই বের করে দেয়া হয়নি, ঘরে তালাও মেরে দেয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার গভীর রাতে ডুমুরিয়া উপজেলার পালপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ময়না পাল ওই এলাকার মৃত কৃষ্ণপদ পালের স্ত্রী। 

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে আসছেন ছেলে ও আর তার স্ত্রী। সম্প্রতি জমি আছে ঘর নাই প্রকল্পে ঘর পান ময়না পাল। রাতে মাকে বের করে দিয়ে ঘরে তালা মেরে দেন ছেলে।

পুলিশ ও ছেলের কথার মধ্যে এক পর্যায়ে এগিয়ে আসেন জগন্নাথের স্ত্রী। স্বামীর হয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করেন। তবে তাকে ধমক দিয়ে সরিয়ে দেন ওসি। 

ওসি: তুই এখন আমার সাথে যাবি হাজতে। আর তোর মায়ের জায়গা হলো তুই যেই ঘরে ঘুমাইছিলি সেই জায়গা। 

ঘটনা কিছু একটা ঘটে চলেছে, কিন্তু ৭৫ বছর বয়সী মা কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না। ততক্ষণে উঠে বসেছেন তিনি। কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন, একে ওকে দেখছেন। এদিকে, বৃদ্ধা মাকে ঘরে তুলে দিতে পুলিশের তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। মাকে আশ্বস্তও করলেন ওসি। বললেন, কেউ কিছু বললে ওইটা আমি দেখবো। 

জগন্নাথ পাল জানালেন, মাকে তিনি নাকি ঘরে শুতে বলেছিলেন। কিন্তু মা শোনেননি। আরো জানালেন, তার বড় ভাই পাশের ঘরেই থাকেন। কিন্তু তিনিও মাকে ঘরে তোলেন না। জগন্নাথের স্ত্রীর অভিযোগ, ওই বড় ভাইয়ের ঘরেই মা থাকেন। আর তিনিই মাকে বের করে দিয়েছেন। 

পুলিশ বৃদ্ধাকে ধরে নিয়ে ঘরে তুলে দিলেন। সেখানে মশার অত্যাচার। তাই ওসিকে একটি কয়েল কিনে আনার নির্দেশ দিতেও দেখা যায়। ওসি বলছেন, আমি প্রতিদিন তোমার খোঁজ-খবর নেবো, ঠিক আছে বাবা? 

ইতোমধ্যে ছেলে জগন্নাথ পালের হাতে হাতকড়া পরিয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। এরপর তার বড় ভাই গৌর পালের ঘরের সন্ধানে গেলেন ওসি। সেই ছেলে থাকেন পাকা ঘরে। সেদিকে যেতে যেতে ওসি বলছেন, কি সুন্দর আরাম-আয়েশ, আর মা ওইদিকে...। 

পাকা ঘরে একজন নারী আর একটা বাচ্চা দাঁড়িয়ে। তারা দেখিয়ে দিলেন গৌর পাল কোন ঘরটাতে থাকেন। তবে ঘরে গৌর পাল ছিলেন না। তার স্ত্রী অঞ্জনা পাল আসতে তাকে একই প্রশ্ন করা হয়, তুমি এত সুন্দর বাড়িতে থাকো, ওই মহিলা (বৃদ্ধা) সরকারের দেওয়া ঘরে থাকে। সেখান থেকেও তাকে বের করে দিছো? 

অভিযোগ অস্বীকার করলেন অঞ্জনা। তবে ছাড়লেন না ওসি।   

ওই বৃদ্ধার এমন দুরাবস্থার কথা স্থানীয়দের কাছে শুনেছেন আমিনুল ইসলাম। পরে ওই বাড়িতে যান তিনি। 

এ ব্যাপারে ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, আমাকে ফোন করে এই বৃদ্ধা মায়ের দুরাবস্থার কথা জানানো হয়। আমি তখন সেখান থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে ছিলাম। পরে ফোর্সকে চলে যেতে বলি এবং নিজে যাই। তার ছেলেকে আমি লক-আপে রেখেছি। তাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা আমার নাই। কিন্তু মাকে এভাবে ফেলে রাখা কতটা গুরুতর অপরাধ তা বোঝাতেই তাকে লক-আপে নিয়েছি। আজ সকালে এলাকার গণ্যমাত্র ব্যক্তিরা সেখানে বৃদ্ধাকে দেখতে গেছেন। তার ভালো-মন্দ দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা