kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

সারিবেঁধে যাচ্ছে পঞ্চান্নটা বাইক, পাড়ি দিলো এক হাজার কিলো!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৭:২৯ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সারিবেঁধে যাচ্ছে পঞ্চান্নটা বাইক, পাড়ি দিলো এক হাজার কিলো!

ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেনা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। চেনা পথে, অজানা গন্তব্যে ছুটে বেড়ানোর নেশা থেকেই ভ্রমণ কাহিনির শুরু। যে পথে যে উপায়েই ভ্রমণ হোক না কেন, তা দারুণ উপভোগ্য। যদি সবাই মিলে মোটরবাইকের ভ্রমণ হয় তো কথাই নেই। রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা মেলে। তেমনই এক পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামলাম আমরা। 

যাত্রাপথে দ্রুততা যেমন একটি বিষয়, আবার পথের আকর্ষণে আকর্ষনীয় স্থানে থেমে সেই এলাকা সম্পর্কে জানার আগ্রহে সেখানে সময় ব্যয় করতে না পারলে শেখার তৃপ্তিটাও কেমন যেন অপূর্ণ থেকে যায়। তাছাড়া ইদানিং দলবেঁধে মোটরসাইকেলে ভ্রমণের কালচারটা বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম রীতিমতো এতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। দলবেঁধে যদি কয়েকটি বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়া যায় তাহলেই বাজিমাত! এতে কেমন যেন একটা অভিযানের ভাব থাকে। কাজেই দুঃসাহসিক অভিযানের আমেজ চলে আসে। আজকাল প্রায়ইদেখা যায় ছোট ছোট দল মোটরসাইকেলে চেপে ছুটছে। এরা দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে যায়।

আমরাও সেই দুঃসাহসিক ভ্রমণের পরিকল্পনা সেরে ফেললাম। গত দশ বছর আগেও যারা বয়সে তরুণ ছিলেন, মোটরসাইকেলে ঘুরে বেরিয়েছেন বন্ধুদের নিয়ে, আজ তাদের আর এমন ভ্রমণের সুযোগই মেলে না। কিন্তু একটু দুরন্তপনার সুযোগ আসলে কে বা তা নষ্ট করতে চায়। আর যদি বাইকের পেছনে চাপেন বন্ধু বা সঙ্গিনী তবে তো কথাই নেই। 

এমন ভ্রমণের দলে যদি একশো জন জুটে যান তো ভ্রমণটা কেমন হবে! তাই ঘটে গেলো! তিন দিনের ছুটিতে পঞ্চান্নটি বাইকে করে পরিবার-বন্ধুরা মিলে ঢাকা-কক্সবাজার-টেকনাফ-ঢাকা ঘুরে এলো বিডি রাইডার্স নামের বন্ধু ও পরিবার কেন্দ্রীক ফেসবুকগ্রুপের সদস্যরা। ভাবা যায়? এদের মাঝে চাকুরীজীবী থেকে শুরু করে ছাত্র, স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবার কিংবা ব্যাচেলর, বিভিন্ন পেশাজীবীর মানুষ ছিলেন। 

এমনিতেই মোটরসাইকেল অনেক ক্ষেত্রেই ভীতিকর। তবে একটু সাবধান থাকলে নিশ্চিন্তে বেরিয়ে পড়া যায়। বাড়ি ফেরা যায় জমানো ক্লান্তিগুলো বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে। এমন দলে অবশ্যই কঠিন নিয়মতান্ত্রিকতা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা আর একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হয়।

২০১৭-তে শুরু এক হওয়া এই বিডি রাইডারস মোটরসাইকেল ট্যুরিং গ্রুপটি পরিবার-বন্ধুসহ সুস্থ ভ্রমণের উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছড়িয়ে দিতেই পথে ছুটে চলেছে। আর সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে যাত্রার আগেই  পর্যবেক্ষক দল ভ্রমণ করে আসে সম্ভাব্য গন্তব্য। কারণ এ দলে স্ত্রী-সন্তানরা থাকবে। আরো যোগ দেবেন নতুন বন্ধুরা। কোথায় বিরতি দিতে হবে, কতক্ষণ বিশ্রাম নেয়া যাবে, কোথায় খাবারের ব্যবস্থা ইত্যাদি পর্যবেক্ষক দলকে আগেভাগেই ঠিক করে আসতে হবে। সবগুলো মোটরবাইকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য-ব্যবস্থাপনাসহ চলার পথের নানাবিধ জোগাড়যন্ত্র সব ঠিক করে রাখতে হবে। স্বেচ্ছাসেবক বাছাই জরুরি। কঠোর হতেই হয়। নিয়মের বাইরে কিছু করলে অর্থদণ্ডের মতো ব্যবস্থাও ছিল। এমনকি প্রয়োজনে কারো বাইকের চাবি রেখে দিয়ে হাতে ধরিয়ে দিতে হবে বাসের টিকেট। এসবই নিরাপদ এবং সুষ্ঠুভাবে ফিরে আসার স্বার্থে।

যাত্রার শুরুর মিলনস্থল ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশুক-মনির চত্বর। যেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো দুই বিশেষ মানুষকে বহনকরা গাড়ির ধ্বংসাবশেষ এর ম্যুরাল যেন এক সাবধানবার্তা। সেখান থেকে হানিফ ফ্লাইওভার এর টোল প্লাজায় সিরিয়াল দিয়ে দাঁড়ানো। সারিবদ্ধতার সাথে সাথে চলছে বাইকগুলো। রাস্তায় চলাচলের কোনো নিয়ম ভাঙা যাবে না। 

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওঠার পর দায়িত্ব যেন আরো বেড়ে যায়। 'গতি নয় ধীরতাই গন্তব্যে পৌঁছানোর মূলমন্ত্র' গেঁথে দিতে হয় প্রতিটি সদস্যদের মনে।  যাওয়া আসা মিলে পথের দৈর্ঘ যে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। এ যেন এক ম্যারাথন। গতি নয় ধৈর্য্যই এর জ্বালানি।

কুমিল্লার কাছাকাছি এসে দেখা যায় রাস্তায় কুয়াশার দল মেঘের আকার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিরাপত্তার কথা ভেবে গতি আরো কমিয়ে আনা হয়। বিরতিগুলোও একতু দীর্ঘতর হয়। এরই ফাঁকে সেরে নেয়া হয় রাতের খাবার। যেহেতু কাউকেই পিছে ছেড়ে আসা যাবে না, তাই এমন জায়গা বেছে নিতে হয় যেখানে সব মোটরসাইকেলগুলো একসাথে রাখা যায়। আবার সবাই একসাথে খেতে বসতে পারে। 

 

আবার পথচলা শুরু। রাতের অন্ধকার আর কুয়াশার চাদরের ফাঁকে ফাঁকে জোনাকির দলের মতো পঞ্চান্নটি মোটরবাইক এগিয়ে চলে। সাপের মতো এঁকে-বেঁকে এগিয়ে যায়। কোথাও কারো সমস্যা হলেই নিরাপদে সকলেই দাঁড়িয়ে পড়ে। সময়ও এখানে মুখ্য নয়। 

দলটি যখন চট্টগ্রাম শহর পেরোচ্ছে, পুরো শহর তখন মাত্রই ঘুম থেকে জেগে উঠছে। নামাজের বিরতিতে কেউ কেউ ছুটে যাচ্ছে কাছের মসজিদে। ট্রাফিক সিগনালের পুলিশের চোখও ছানাবড়া! এতগুলো মোটরসাইকেল কী করছে এখানে! আবার কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, ভাই সাথে কি ভিআইপি আছে নাকি? 

শহর পেরিয়ে এসে হালকা নাশতার বিরতি। এখন আরেক আতঙ্ক। সারারাতের ক্লান্তি ঘুম হয়ে ভর করলে বিপদ ঘটতে কতক্ষণ! তাই নতুন নির্দেশনা। যখনই প্রয়োজন হবে অল্প বিরতি নিয়ে চোখে মুখে পানি দিয়ে নিতে হবে। কোনভাবে ঘুম চোখে বাইক চালানো যাবে না। প্রয়োজনে পিছনের আরোহী বাইক চালাতে পারলে তাকে চালকের আসনে বসিয়ে দিতে হবে।  

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের মহাসড়কের আঁকাবাঁকা আর উঁচু-নিচু পথে এগিয়ে চলে বাইকের সারি। স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক বিরতিতে দলটিকে দূর থেকে কখনোই জটলা মনে হয়নি। এক সারিতে চলার কারণে তৈরি হয়নি কোনো জটিলতা। ধীরে ধীরে দলটি প্রবেশ করে কক্সবাজার শহরে। সূর্য তখন মধ্যগগণে মাথার ওপর তাপ ছড়াচ্ছে। শহরটি ইতোমধ্যে লোকে লোকারণ্য। পরে জানা যায় সেদিন নাকি কক্সবাজারে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ পর্যটক ছিলেন। ভাবা যায় কতগুলো অবাক দৃষ্টি ছিলো দলটির প্রতি।

পরদিন সকাল ন’টায় যাত্রা শুরু হয় টেকনাফের উদ্দেশে। পথ বিখ্যাত মেরিন ড্রাইভ। আসার আগে শোনা যাচ্ছিলো সেখানে সংস্কার কাজ চলছে। তাই অতটুকু পথ এড়িয়ে যাবার জন্য সিদ্ধান্ত হয় সি-বিচের পথ ধরে এগুনোর। সৈকত হয়ে মেরিন ড্রাইভে উঠে আসে দলটি। এরপর আসে সাবধান সূচক নির্দেশনা। যেহেতু পথটির অধিকাংশই খালি পাওয়া যাবে তাতে কেউ যেন অত্যাধিক গতিতে না চালায়। কারণ আশপাশে রয়েছে অনেক স্কুল মাদ্রাসা এবং হোটেল। তাই সাবধানতা অবশ্যই পালনীয়। ইনানী বিচের পাশ ঘেঁষে যাবার সময় পর্যটকদের উৎফুল্লতা ছিল দেখার মতো। বিডিআর চেক পোস্টে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে দলটি আরো এগিয়ে গিয়ে বেছে নেয় একটি নীরব বালুকাবেলা। চলতে থাকে ফটোসেশন আর বাচ্চাদের দৌড়ঝাঁপ। এর সাথে তরমুজ খাবার এক মহোৎসব। প্রায় এক ঘণ্টা পর দলটি সাবারাং অর্থাৎ মেরিন ড্রাইভের শেষ মাথার উদ্দ্যেশে যাত্রা শুরু করে।

 

সাবরাং পৌঁছে উত্তাল সাগর যেন ডাক দিলো। অতিউৎসাহী কেউ কেউ মোটরবাইকসহ নেমে গেলো সাগরে, যতটুকু যাওয়া যায় আরকি! এখানে অবশ্য মা-বাবারা তাদের বাচ্চাদের নিয়ে পানিতে সময় কাটাতেই বেশি উৎসাহি। আশে পাশের দোকানে ডাব-কলা দিয়ে চললো দুপুরের খাবার। কেউ কেউ লবণ খামারে গিয়ে ছবি তোলার ব্যাপারে আগ্রহী। কেউ বা চড়ে বসলেন তীরে রাখা সাম্পানে। সে এক অদ্ভুত আনন্দময় সময়। দলটি বিকেলে ফিরে আসে কক্সবাজারে। সকাল হলেই ফিরে যেতে হবে ভেবে অনেকের তখন থেকেই মন খারাপ।

যাত্রার তৃতীয় দিন। যদিও কথা ছিলো ভোরে যাত্রা শুরু। কেউ কেউ ভোর বেলা উঠেই চলে গিয়েছিলেন সৈকতে। শেষবারের মত সমুদ্রে অবগাহনের সুযোগ কে-ই বা ছাড়তে চায়। সকালের নাস্তা খেয়েই দলটি যাত্রা শুরু করতে করতে বেলা ৯টা। সেই একই পদ্ধতিতে নিয়মিত বিরতিতে দলটি ঢাকা ফিরে আসে রাত একটায়। 

এত বড় আয়োজন কীভাবে এত সুন্দরভাবে সেরে আসা যায়? গ্রুপের অ্যাডমিন জাভেদ দেলোয়ার বলেন, মোটরবাইক ট্যুরিং বিশ্বে একটি জনপ্রিয় ভ্রমণমাধ্যম। শুধু বন্ধুরা কেন দলবেঁধে ঘুরবে? মাঝে মাঝে পুরো পরিবার নিয়ে ঘুরে আসতে ইচ্ছে করে। তাই এই উদ্যোগ। মোটরবাইকের কথা শুনলেই সবাই একটু ভয় পায়, কিন্তু দলীয় সহযোগিতা আর সমমনা হলে ভয়কে জয় করা সম্ভব। এতো বড় দল ব্যবস্থাপনায় প্রতিবন্ধকতা কেমন জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, সহযোগী মনোভাবের পাশাপাশি কঠোর নিয়ম মেনে চলার মানসিকতা রাখতে হয় দলের সকলকে। কারণ এ ধরনের ভ্রমণে হঠাৎ করেই কারো সমস্যা হতেই পারে। সেক্ষেত্রে সকলকে ধৈর্য ধরে তা সমাধানের এগিয়ে আসতে হবে। যেমন কক্সবাজার থেকে বের হবার কিছু পরেই আমাদের এক বন্ধুর বাইকের চেইন ছিঁড়ে যাওয়ায় আমরা সকলেই ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করি। এতে প্রায় দুই ঘণ্টা রাস্তায় অপেক্ষা করতে হলেও সদস্যারা তাতে বিরক্ত হননি, বরং আশপাশে ছবি তুলতে তুলতেই সময় কাটিয়ে দেন তারা। 

কক্সবাজার পৌঁছানোর পরদিন দলটি পৌঁছে মেরিন ড্রাইভের শেষ মাথা টেকনাফের সাবরাং। সারাদিন সাগরপাড়ে সময় কাটিয়ে বিকেলে দলটি ফিরে আসে কক্সবাজার। পরদিন বেলা ৯টায় ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে দলটি। সদস্যদের সকলকেই সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসে যার যার ঘরে। মোটরসাইকেল ট্যুরিজমের ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনসহ দেশের সকল স্তরে যদি আরো যত্নবান হওয়া যায় তবে শুধু পর্যটনশিল্পই বৃদ্ধি পাবে না বরং পুরো দেশটি পর্যটকদের জন্য স্থান হবে বলে এই গ্রুপের সকলে বিশ্বাস করেন।

লেখক: আশফাক হাসান, ভ্রমণকারী 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা