kalerkantho

সোমবার । ২০ মে ২০১৯। ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৪ রমজান ১৪৪০

ঘুরে এলাম সিকিম, শিহরণ জাগানিয়া গ্যাংটক!

কামরুজ্জামান খন্দকার উৎপল   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৪:৪২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঘুরে এলাম সিকিম, শিহরণ জাগানিয়া গ্যাংটক!

লাচুংয়ের কাটাও, চারদিকে শুভ্রতার ইন্দ্রজাল

সেই কিশোর বয়সে 'গ্যাংটকে গন্ডগোল' পড়ার সময়ই ওখানে যেতে মনটা আনচান করতো। কিন্তু তখন কি আর চাইলেই যাওয়া যায়! এখন সময় বদলেছে, সুযোগও এসেছে। তাই ছোটকালের স্বপ্নটা আবারো মাথাচাড়া দিলো। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছুটলাম স্বপ্নের গন্তব্য সিকিমে। গ্যাংটক যাবো ফাইনাল হলো। আমার মনে তখন উথালপাথাল রোমাঞ্চ! 

এখানে স্রেফ কীভাবে গেলাম আর কী করলাম ইত্যাদির বয়ান করে গেলাম। যারা যাওয়ার প্ল্যান করছেন, আশা করি তাদের কিছুটা হলেও উপকার মিলবে। 

চুংথাং এলাকা, হাইড্রোলিক পাওয়ার ড্যাম

গেলো ৬ ফেব্রুয়ারি বিকাল সাড়ে ৫টায় বাসা থেকে বেরোলাম। রওয়ানা দিলাম কমলাপুর বিআরটিসি শ্যামলী পরিবহনের উদ্দেশে। সোজা বগুড়া যাবো। বাস ছাড়লো সন্ধ্যা ৭টায়। রাস্তায় ঢাকা শহরের বরাবরের তীব্র যানজট। বগুড়া যখন পৌঁছলাম, ঘড়ির কাঁটা রাত ২টার জানান দিলো। ফুড ভিলেজে বিরতি নিলাম। রাতের খাবার গিলতে খরচ করলাম আধা ঘণ্টা। ভাত, গরুর মাংস, ডাল আর মুরগি অসাধারণ লাগলো।

বাস ছাড়ল আড়াইটায়। সকাল ৮টা নাগাদ বুড়িমারী বর্ডারে পৌঁছলাম। শ্যামলী পরিবহনের নিজেদের ওয়েটিং রুমে হাতমুখ ধুয়ে পেটপুজো হলো বুড়িমারীর বুড়ির হোটেলে। পরোটা, ভাত আর দেশি মুরগির স্বাদ জিভেয় লেগে রইলো। তারপর খুব দ্রুতই বর্ডার পার হলাম, বেশ সহায়তা করলেন পরিচিত পলাশ ভাই। আমরা পৌঁছে গেলাম ভারতের চেংরাবান্ধা বর্ডারে। 

বলে রাখি আমাদের এই ট্যুরটা ৬ জনের। আমি আর আমার পরিবারের ৩ জন। রিমা, নামিরা, জুনেদ, আমার শ্যালক অভি আর চাচাতো ভাই সজল। ভারতের কুচবিহারে অবস্থিত এই বর্ডার। ইমিগ্রেশনের ঝক্কি চটজলদি হয়ে গেল। শিলিগুড়ির জন্যে একটা জিপ ভাড়া করলাম। যদিও আমাদের টিকেট ছিল ঢাকা টু বুড়িমারী টু শিলিগুড়ি। বাসে আমার স্ত্রী বেশ অসুস্থ হয়ে গেছিল, তাই জিপ ছাড়া গতি নেই। সকাল ১১টায় রওনা দিয়ে দুপুর ১টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। শিলিগুড়ির সেন্ট্রাল প্লাজা হোটেলের খাবার খেলাম। এরপর সেই কিশোর হৃদয়ের স্বপ্নের গন্তব্য, গ্যাংটকের উদ্দেশে পাড়ি জমালাম। ঘড়িতে তখন দুপুর আড়াইটা। হিনোভা গাড়িতে ওঠামাত্র রোমাঞ্চকর অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম আমি।

পেছনে তাকালে বোবা বনে যেতে হয়!

এ পথে তিস্তা ব্রিজ, তিস্তা ড্যাম, কালিম্পং দেখতে দেখতে আমরা রাত ৮টার দিকে গ্যাংটক গেট-এ থামলাম। সেখানে আমাদের চেক, পাসপোর্টে সিল মারা হলো। বলে রাখা ভালো, আমরা ৫ জন ঢাকা থেকেই সিকিম প্রবেশের অনুমতি নিয়ে গিয়েছিলাম। আর সজলের সিকিম পারমিশন শিলিগুড়ি থেকে নেয়া হয়েছে। আমরা রাত ১০টায় হাজির হলাম গ্যাংটকের মূল শহরে। উঠলাম দোমা প্যালেস হোটেলে। 

খাবার রেডিই ছিল। আগে কোনমতে পেটে কিছু দিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে। সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ি। খুবই ক্লান্ত ছিলাম আমরা সবাই। প্রায় ২৯ ঘণ্টার জার্নি ঢাকা থেকে গ্যাংটক সিটি।  
  
গ্যাংটকের প্রথম ভোর! শব্দপ্রয়োগে এ অনুভূতি বোঝানো সম্ভব না। ভোর ৬টায় ঘুম ভাঙতেই জানালায় গেলাম। বাইরেটা দেখতে হবে। জানালা দিয়ে চোখ গলাতেই দেখলাম কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া! আগেই বলেছি, দেহের রন্ধ্রে ছড়িয়ে যাওয়া এ অনুভূতি শব্দের জাদুতে আমার পক্ষে স্পষ্ট করা অসম্ভব।

এ কাজটাও অনেক মজার! লাচুং থেকে ইয়ামথাম ভ্যালি যাওয়ার পথে ১১ কিলোমিটার পর রাস্তা বন্ধ

 

কিছুক্ষণ নির্বাক থেকে গোসল সেরে ফেললাম। নাস্তা খেলাম। সকাল ৯টায় বেরিয়ে গেলাম সবাই। লাচুংয়ে যাবো সবাই। লাচুং যাওয়ার পথ শুধু এদিক ওদিক তাকিয়ে থাকতে হবে। পাহাড়ের অপার সৌন্দর্যে আপনি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকবেন। মাঝপথে অবশ্য লাচুংয়ে প্রবেশের অনুমতি নিতে হয়। আমাদের গাড়ি সেখানে থামলো। ১০ মিনিট লাগলো পারমিশন নিতে। লাচুং যাওয়ার পথে বাজার করতে চাইলে সে সুযোগও আছে।

রাস্তা দিয়ে প্রায় ১০ হাজার ফিট ওপরের তিস্তা ড্যাম দেখলাম। সেখানে গেলাম এবং ছবি তুলে রওয়ানা দিলাম আবার। মাঝপথে বড় দুটি ঝর্ণাও আছে। একটার নাম বচ্চন ঝর্ণা, অন্যটার নাম শোনা হয়নি। লাচুং পৌঁছলাম আমরা রাত ৭টায়। বলে রাখি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২ হাজার ফুট ওপরের ছোট একটি গ্রাম লাচুং।

সেখানে ট্যুরিস্টদের একটু সমস্যা হবে অক্সিজেনের কারণে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় অসুবিধা টের পাওয়া যায়। এটা জেনে রাখা ভালো যে, গ্যাংটক আর লাচুংয়ের যে হোটেলেই থাকেন না কেন, হিটিং সিস্টেম ভাড়া করতে হবে। একটা হিটারের ভাড়া ৪০০ রুপি। বড় রুমে ২টা হিটার লাগে। এ সময়টাতে তুষারপাত দেখা যাবে। লাচুং পৌঁছতেই রাত হয়ে গেলো। কাজেই রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া ও পরদিন সকাল সকাল ওঠাই বুদ্ধিমানের কাজ। ভোর ৬টায় উঠে ৭টার মধ্যে নাস্তা সেরে ফেললাম। 

সাড়ে ৭টার দিকে রওনা দিলাম ইয়ামথান ভ্যালির দিকে। তবে ১১ কিলোমিটার যাওয়ার পর দেখলাম রাস্তা বন্ধ। আসলে রাস্তায় উপচানো বরফ, তাই আটকে দিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। কাজেই কিছু করার নেই। সেখানেই নেমে শুভ্র সৌন্দর্য উপভোগ করতে তাকলাম। বরফ নিয়ে গোল্লা বানাই আর একে ওকে ছুড়ে মারি। ঘণ্টা দুয়েক থাকার পর আমাদের গাড়িচালক উপেন আরেকটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাওয়ার লোভ দেখালো। এ লোভ সামলানো দায়! অতিরিক্ত ১০০০ রুপি লাগলো। চালক হতাশ করেননি। জায়গাটা অবর্ণনীয় সুন্দর! 

সাউথ সিকিমে নামচির শিবমন্দিরটা অসম্ভব সুন্দর!

তারপর কাটাও ঘুরে আমরা হেটেলে আসলাম দুপুরের খাবার খেতে। এরপর আমরা আবার রওয়ানা দেই গ্যাংটকের দিকে। গ্যাংটক এসে পৌঁছই রাত ৮ টায়। রাত ৯টায় খাবার খেয়ে টিভি দেখে ঘুমিয়ে পড়ি। এবার গ্যাংটককে সময় দেয়ার পালা। এখানকার গনেশ টপ, হনুমান টপ, ঝর্ণা, ক্যাবল কার, হ্যলকপ্টার চড়ে যারপরনাই খুশি সবাই। পুরো রাত নামা পর্যন্ত ঘুরলাম। তারপর হোটেলে ফিরে সাউথ সিকিমের দিকে ছুটলাম। ৮৬ কিলোমিটার পথ গ্যাংটক টু নামচি। শিব মন্দির, বৌদ্ধ মন্দির, বিশাল ক্যাবল কার, রগ গার্ডেন না দেখে ফেরা উচিত নয়। 

একটু খরচের বিষয়ে বলে রাখি। ৬ তারিখ রাত হতে ১৩ তারিখ পর্যন্ত খরচ পড়েছে একেকজনের জন্যে ২৫০০০ টাকা। চাইলে কিছুটা কম-বেশি খরচ করাই যায়। 

যে পথে যাওয়া, সেই পথেই ফিরতে হবে। বেশ লম্বা জার্নি। খুব সংক্ষেপে বলে বোঝানো কঠিন। শিহরণ জাগানিয়া সিকিম-গ্যাংটক ঘুরে দেখার এই অভিজ্ঞতার কথা কখনো ভুলবো না। ঢাকা শহরের কংক্রিট জীবন এখানে আসলে রূপকথার কোনো রাজ্যের মতো লাগবে। ফিরতে একদম মন চায় না। কিন্তু ফিরতে তো হবেই। কিন্তু আমার মনে যা এসেছে, তেমনটা আপনারও হবে। ফেরার সময় মনে হবে, সুযোগ পেলে আবারো আসবো এখানে। দ্বিতীয়বার না এলেই নয়। 

মন্তব্য